পুরুষ গলদার চাষ যেভাবে বদলে দিচ্ছে সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষের চিত্র
সোনার দাম বাড়ছে। কিন্তু সাদা সোনা কী বিলুপ্তির পথে হাঁটছে?
একসময় সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি দেশের রপ্তানির বাজারে এনে দিয়েছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। সেই সাদা সোনা চাষে এখন উপকূলবর্তী অঞ্চলের চাষীদের অনীহা। বাংলাদেশের উৎপাদিত মোট চিংড়ির এক তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় সাতক্ষীরা জেলায়। কিন্তু সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ ঘেরগুলোতে চিংড়ি চাষের ব্যাপারে আর আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই।
বিগত কয়েক বছরে রেনুর সংকট, চাষীদের ঋণ সহায়তার অভাব, বৈরী আবহাওয়া, সঠিক দাম না পাওয়ায় চিংড়ি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক চাষী।
চিংড়ি চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার চাষী আব্দুর রহিম। তিন বছর ধরে পর পর লোকসান, ঘাড়ে ব্যাংকের ঋণ। কিন্তু পাশের ঘেরে তার অর্ধপরিচিত এক উদ্যোক্তা এ বছর যা আয় করলেন, তা দেখে চমকে ওঠবার জো। একই আবহাওয়া, পাশাপাশি ঘের, একই পরিশ্রম। তফাত শুধু চাষ পদ্ধতি আর রেণুর ধরনে।
চিংড়ি চাষের সংকটময় মুহূর্তেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন চিংড়ি চাষকে বাঁচিয়ে রাখবার। হাফিজুর রহমান মাসুম এমনই একজন উদ্যোক্তা যিনি সাতক্ষীরা অঞ্চলে চিংড়ি চাষকে করে তুলেছেন রাসানয়িকমুক্ত, পরিবেশবান্ধব এবং অবশ্যই লাভজনক। চাষী বাঁচলেই বাঁচবে চিংড়ি। আর চিংড়ি বাঁচলেই বাঁচবে উপকূলের অর্থনীতি। এই সার কথা বুঝতে পেরেছিলেন এই শিক্ষিত যুবক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন মাসুম। তখন থেকেই প্রথাগত চাকরিবাকরির চিন্তাকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি ভাবছিলেন এমন কিছু করবার যা তাকে এনে দেবে দুবেলা দুমুঠো খোরাক। পাশাপাশি উপকৃত হবেন অনেকে।
মাসুম দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন আরেকটি ব্যাপারে, সেটি পরিবেশ রক্ষা। কীভাবে পরিবেশকে বাঁচিয়ে চিংড়ি চাষে ভালো উৎপাদন করা সম্ভব এ নিয়ে শুরু করলেন ঘাটাঘাটি। ইন্টারনেটে বিস্তর পড়াশুনা, কৃষিবিদদের সাথে পরামর্শ এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের যথাযথ ফল মিলল বটে।
উপলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে হাতে কলমে মাঠে নামলেন মাসুম। জেলার দেবহাটা উপজেলার হিরারচক এবং বেড়িবাঁধের গেট এলাকায় কয়েকটি ঘেরে (এসপিএফ অল মেল) গলদা চাষে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করলেন তিনি। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দশটা–পাঁচটার ধরাবাধা চাকরিজীবন বেছে না নেয়ার জন্য আফসোসও করতে হয়নি কখনো।
বিগত কয়েকবছর ধরেই চিংড়ি চাষে লাভবান হচ্ছেন এই উদ্যোক্তা। যে কারণে চাষের পরিসর বড় করবার চিন্তাভাবনাও করতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, সাতক্ষীরা জেলায় এ বছর ২০ হাজার হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১১ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদা রয়েছে চার কোটি রেণুর।
আশার আলো দেখাচ্ছে এফপিএফ পুরুষ গলদা
"অনেকের মধ্যেই এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা আছে চিংড়ি চাষ মানেই লবণাক্ত পানির প্রয়োজন। গলদা চিংড়ির রেণু ছাড়ে লবণাক্ত পানিতে ঠিকই। কিন্তু এরা বেড়ে ওঠে মিঠা পানিতে। তাই গলদা চিংড়ির চাষ বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের জেলায় করা সম্ভব।
তবে বাগদা চিংড়ির চাষ লোনা পানিতেই হয়। এই বাগদা চাষের উদাহরণকে সামনে এনে বলা হয় চিংড়ি লোনাপানির ফসল। কিন্তু তা সর্বাংশে সত্যি নয়।
নারী গলদা পুরুষ গলদার থেকে অনেক কম বাড়ে। এক পর্যায়ে নারী গলদার যখন ডিম চলে আসে তখন তার বৃদ্ধি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবে পুরুষ গলদার বৃদ্ধি অনেকটাই বেশি ঘটে। কিন্তু স্ত্রী–পুরুষ গলদা একই জলাশয়ে চাষে পুরুষ গলদার কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি ঘটে না।
যেহেতু পুরুষ গলদার বৃদ্ধি বেশি, হ্যাচারি পর্যায়ে বিগত তিন বছর যাবত এসপিএফ (স্পেসিফিক প্যাথোজেন ফ্রি) পুরুষ গলদার উৎপাদন শুরু হয়েছে। একই সাথে এটি উন্নত গ্রুপ থেকে উৎপাদন করার ফলে এদের বৃদ্ধি বেশ ভালোভাবে ঘটে।
গ্যাপ (গুড একুয়াকালচার প্রাকটিস) অর্থাৎ সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কোনো ধরনের রাসানয়িক সার ব্যবহার না করে যদি গলদা চিংড়ি চাষ করা হয়, তবে এটি যেমন পরিবেশবান্ধব হয়, তেমনি লাভবান হয় চাষী। পাশাপাশি এই চিংড়ির ভোক্তারাও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিরাপদে থাকেন।
এসব কারণকে সামনে রেখে রপ্তানি বাজারেও এসপিএফ গলদা চিংড়ির চাষ আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে। সাতক্ষীরা সদর, দেবহাটা এবং আশাশুনি উপজেলায় বাড়ছে পুরুষ গলদা চাষের ঝোঁক।
তবে রেণুর দাম এখনো তুলনামূলক বেশি, যা এসপিএফ চিংড়ি চাষে এখনো অব্দি বড় বাধা। সরবরাহ কম এবং চাহিদা বেশি থাকার কারণে কোম্পানিগুলো বেশি মূল্যে রেনু বিক্রির ফায়দা লুটছেন।
"৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকায় একেকটি রেণু কিনতে হয়। অথচ তা যদি ২ টাকার মধ্যে বা এর থেকে কমে কেনা যেত তবে কৃষকের জন্যে হতো সাধ্যের মধ্যে," — এমনটাই জানাচ্ছিলেন পরিবেশপ্রেমী উদ্যোক্তা মাসুম।
তিনি আরও জানালেন, গলদা চিংড়ির রেণু পাওয়ার কয়েকটি প্রধান উপায় হচ্ছে প্রাকৃতিক উৎস এবং হ্যাচারি। গলদা চিংড়ি ডিম ফোটানোর জন্য কিছুটা লোনা পানিতে যায়, তাই লোনা নদীর মোহনাতে রেণু পাওয়া যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য হ্যাচারি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
হ্যাচারিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডিমওয়ালা মা চিংড়ি রেখে কৃত্রিমভাবে রেণু উৎপাদন করা হয়। হ্যাচারিতে পানির তাপমাত্রা ২৮–৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং লবণাক্ততা ১২–১৬ পিপিটি রাখা হয়। ডিম ফোটার পর লার্ভা ১১–১২টি ধাপ পার করে রেণুতে পরিণত হয়, যা মিঠা পানিতে ছাড়া হয়।
হ্যাচারিতে পরিপক্ক স্ত্রী ও পুরুষ চিংড়ি ৩:১ অনুপাতে একসাথে রেখে প্রজনন করানো হয়। ডিম নিষিক্ত হলে স্ত্রী চিংড়িকে আলাদা ট্যাংকে রেখে ডিম ফোটানো হয়। এভাবেই নিয়মিত উৎপাদন করা যায় মানসম্পন্ন রেণু।
যেভাবে স্ত্রী ও পুরুষ গলদা চিংড়ি আলাদা করা সম্ভব
প্রাপ্তবয়স্ক গলদা চিংড়ির ক্ষেত্রে স্ত্রী-পুরুষ শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হয়। পুরুষ চিংড়ি স্ত্রীর তুলনায় বড় ও ভারী হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ১৫০–২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে, স্ত্রী সাধারণত আকারে এবং ওজনে কম হয়। পাশাপাশি পুরুষ চিংড়ির দ্বিতীয় জোড়া পা অনেক বড়, লম্বা ও নীলাভ রঙের হয়। স্ত্রীর ক্ষেত্রে তা ছোট ও সরু।
স্ত্রী চিংড়ির পেট তুলনামূলক চওড়া ও গোলাকার, কারণ সেখানে ডিম বহন করতে হয়। অন্যদিকে পুরুষ চিংড়ির পেট সরু ও চাপা হয়।
গলদা রেণুর ক্ষেত্রে যেহেতু স্ত্রী পুরুষ শনাক্তকরণ অনেকটাই কঠিন তাই হ্যাচারির ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে অভিজ্ঞ মৎস চাষীরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলে পুরুষ এবং স্ত্রী গলদার রেণু আলাদাভাবে চিনতে পারেন।
৬ মাসে লাভ ৪ লাখ টাকা
মাসুমের ভাষ্যে, "১০০ ডেসিমালের পুকুরে পর্যাপ্ত জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সঠিক উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে যদি চাষ করা যায়, বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ করা কঠিন কোনো ব্যাপার না। দুইভাবে এসপিএফ চিংড়ি চাষ করা সম্ভব। একটি হচ্ছে কৃত্রিমভাবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ব্যবস্থা নিশ্চিতের মাধ্যমে চাষ, অন্যটি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়াই স্বল্প ঘনত্বে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে চাষ।"
মাসুম জানালেন, ১ একর অর্থাৎ ১০০ ডেসিমেলের পুকুরে কোনো কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবস্থা ছাড়াই যদি শতকে ১০০ গলদা চাষ করতে চাই, তবে ১২০ পিস গলদা ছাড়া হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, ১২ হাজার গলদা চিংড়ির রেনু নার্সিং পুকুর থেকে বড় করে এনে পরবর্তীতে চাষের পুকুরে ছাড়তে হয়। তবে এক্ষেত্রে চাষ এবং নার্সিং পুকুরে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়ামের অনুপাত ঠিক রাখতে হয়। এছাড়া প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো উপাদান প্রয়োগ না করাই শ্রেয়। এই সমস্ত কিছুর পাশাপাশি চিংড়ির আমিষ সমৃদ্ধ খাবারের দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হয়।
নার্সিং পুকুরে ৪০-৪৫ দিন, চাষের পুকুরে ১২০ দিনের হিসাবে মোট ১৬৫ থেকে ১৭০ দিনের মধ্যে এসপিএফ চিংড়ি বেশ বড় হয়ে যায়। প্রতিদিন মাত্র দুইবার খাবার আর সাধারণ পরিচর্যাতেই এই উচ্চ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যেই একেকটি এসপিএফ চিংড়ি ১০০ গ্রাম ওজনের হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, কেজিতে ১০টি চিংড়ি বিক্রি করার যোগ্য হয়ে ওঠে।
মাসুম জানালেন, জুন থেকে আগস্ট মাস চিংড়ির মৌসুম। এ সময় চাহিদা থাকে তুঙ্গে। তাই প্রতি কেজিতে ১,৪০০-১,৬০০ টাকায় এসপিএফ গলদা বিক্রি করা সম্ভব হয়। সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কেজিতে চাষীর কাছে ১ হাজার টাকা লাভ উঠে আসে। একইভাবে ১ হাজার কেজি গলদা উৎপাদন করা সম্ভব হলে তার দাম আসে ১০ লাখ টাকা।
"১০০ ডেসিম্যালের পুকুরে এভাবেই ৬ মাসের মধ্যে ১০ লাখ টাকার চিংড়ি বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। সমস্ত অবচয় ব্যয় বাদ দিলেও চাষীর লাভ থাকছে কমপক্ষে ৪ লাখ টাকা," যোগ করেন মাসুম।
"চাষীর নিজস্ব নার্সিং পুকুর থাকলে চিংড়ির জীবনচক্র আরো ছোট করে ৫ মাসেই উৎপাদন করা সম্ভব এসপিএফ গলদা। আবার একই ঘনত্বের পুকুরে দুটি এরেশন মেশিন (কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবস্থা) বসানো গেলে চিংড়ির উৎপাদন সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়ানো যেতে পারে।"
এভাবে চিংড়ি চাষে ভাগ্য ফেরানোর গোপন কথা জানাচ্ছিলেন এই উদ্যোক্তা। তবে এই গোপন কথা গোপন রাখতে চান না তিনি। যে কেউ চিংড়ি চাষের পরামর্শ চাইলে তাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানান মাসুম। আন্তরিকভাবে বুঝিয়ে দেন যেটুকু তিনি বোঝেন।
নেই কোনো রাসানয়িক সারের ব্যবহার
এখানেই এই চাষীর চমৎকারিত্ব। যদিও রাসানয়িক সারের ব্যবহার ব্যতীত চিংড়ি চাষ সাতক্ষীরার মৎস্য চাষীদের কাছে এখনো অতখানি পরিচিত নয়। তবু শুরু তো একজনকে করতেই হয়। আর এ শুরুর হাল ধরেছেন উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান মাসুম।
পুকুর প্রস্তুতি থেকে পরিণত চিংড়ি তোলা সমস্ত প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের রাসানয়িক সার ব্যবহার করেন না তিনি। বরং ব্যবহার করেন প্রোবায়োটিক।
পুকুর প্রস্তুতির প্রথম ধাপেই চলে পুকুর থেকে কাদামাটি অপসারণের কঠিন কাজখানা। এরপর পুকুর শুকাতে দিতে হয়। পুকুর শুকোনোর পরবর্তী পর্যায়ে পুকুরে অল্প পানি ঢুকিয়ে ৬/৭ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় অন্য কোনো মাছের ডিম থেকে পোনা ফুটলে সেগুলোকে চা বীজের খোলের সাহায্যে অপসারণ করা হয়।
পুকুর প্রস্তুতির প্রতিটি পর্যায়ে খেয়াল রাখতে হয় যেন কোনো কালো বা পচা মাটি না থাকে। এই কালো মাটি চিংড়ির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় জেনে নিচ্ছিলাম পুকুর প্রস্তুতির খুঁটিনাটি। মাসুম বলে চলেছিলেন আপন গতিতে।
অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ
মাটির গুনাগুণ বজায় রাখবার জন্য প্রথমে প্রিবায়োটিক এবং পরবর্তীতে প্রোবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। এরপর ফার্মেন্টেড রাইস ব্রান দিয়ে তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক খাবার। নার্সারি পুকুরে প্রথম এক মাস কোনো ধরনের বাইরের খাবার ব্যবহার করেন না মাসুম। সাধারণত প্রাকৃতিক জো পাংল্কটনের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয় রেণুদেরকে।
রেনু ছাড়ার আগেই টানা ৪/৫ দিন যথাযথ অনুপাতে ফার্মেন্টেড রাইস ব্রানের পাশাপাশি প্রয়োগ করা হয় সোডিয়াম বাই কার্বোনেট এবং ভালো মানের প্রোবায়োটিক। এভাবেই চাষ করে নেয়া হয় প্রাকৃতিক খাবার।
চিংড়ি কিছুটা বড় হলে নার্সারির ফিড খাওয়ানো হয়। প্রায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষের পুকুর তৈরি করে নেন এই উদ্যোক্তা। পানির পিএইচ ঠিক রাখার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, সোডিয়াম কার্বোনেট যথাযথ পরিমাণে রয়েছে কিনা তা চাষের পুরো সময় ধরে তত্ত্বাবধানে রাখেন তিনি। পাশাপাশি হার্ডনেস ঠিকঠাক আছে কিনা এটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হয়।
গলদা চিংড়ির খোলস পরিবর্তনজনিত সমস্যা, এন্টেনা পচা রোগ প্রভৃতির রোগ ব্যবস্থাপনা করতে পারলে আর তেমন কোনো বড় সমস্যায় পড়তে হয় না। গুড একুয়াকালচার প্রাকটিস এবং ভালো মানের রেণু বাছাই এবং অর্গানিক চাষ ব্যবস্থাপনা রোগ প্রতিরোধে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা—এমনটাই মনে করেন এই সফল উদ্যোক্তা ।
চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে কৌশলী হওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানালেন মাসুম। তার অভিজ্ঞতা বলছে, যথাযথ খাবারের অভাব যেমন চিংড়ির বৃদ্ধিকে কমিয়ে দিতে পারে তেমনি অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োগের ধকল অনেক সময় চিংড়ি সামলাতে পারে না। এই খাবার গ্রহণ না করার ফলে খাবার পচে পানি দূষিত হতে পারে। যা পরিবেশ এবং চিংড়ি উভয়ের জন্য ক্ষতিকারক।
সবশেষে জৈব নিরাপত্তার দিকে কড়াভাবে নজর দেয়ার কথা বললেন তিনি। হয়তো চাষী যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বনেই চাষ করলেন। কিন্তু কোনো জীবানুবাহী প্রাণী চাষের পুকুরে ঢুকে পড়ল। তাহলেও চাষ শতভাগ সফল হবে না। তাই কড়া নজরদারি খুব জরুরি।
সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষীরা এখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন দশকের পর দশক ধরে নারী-পুরুষ গলদা মিশ্র চাষের যে অভ্যাসে তারা বুঁদ হয়ে ছিলেন, সেটাই হয়তো ছিল তাদের অন্যতম ভুল। সাদা সোনা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। শুধু চাষ করতে হবে কৌশলে। ঘেরের পানি সামান্য দুলছিল। আর সেই দোলার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আগামী মৌসুমের গল্প, যেটা এখনও লেখা বাকি।
ছবি: অনুস্কা ব্যানার্জী