বনজুড়ে নানান ফাঁদ, বিপন্ন বন্যপ্রাণী: যেভাবে সুন্দরবনের চোরাশিকারীদের দমন করছেন এক বন কর্মকর্তা
বন ভালো থাকলে বন্যপ্রাণী ভালো থাকে। আর বন ভালো থাকে যদি আশপাশের লোকজন সচেতন ও দায়িত্ববান হয়। মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ শুরু হলো কথাগুলো দিয়ে। তিনি এখন পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা ডিএফও।
২০০১ সালে সুন্দরবনকে পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগে ভাগ করা হয়। চাঁদপাই ও শরণখোলা নামে দুটি ফিল্ড রেঞ্জ আছে পূর্ব বিভাগে। বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও রামপাল উপজেলা এবং খুলনার দাকোপ উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগটি গঠিত। এর সদর দপ্তর বাগেরহাট সদরে। ডিএফও হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরী-এর বিভাগের অফিস প্রধান। এবার নিয়ে তিনি দুই দফায় সুন্দরবনে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফাঁদের রকমফের
প্রথমবার এসেছিলেন ২০০৪ সালে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে। তখনকার তুলনায় এখন বনের প্রাণীগুলো বেশি হুমকির সম্মুখীন বলে তার মনে হচ্ছে। মোংলার শরকির খালসংলগ্ন বনের ধারে হরিণ ধরার ফাঁদে বাঘের আটকা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে গেল ৪ জানুয়ারি। চোরা শিকারিরা মালা, ছিটকা, হাঁটা ও গলা মোট চার ধরনের ফাঁদ পাতছে বনের গহিনে। বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে মালা ফাঁদ।
প্রথমে এক গাছ থেকে টেনে নিয়ে দূরবর্তী আরেকটি গাছে রশি বাঁধা হয়, এরপর সেটিতে পাশাপাশি মালার মতো অনেকগুলো ফাঁদ পাতা হয়। তবে বাঘটি আটকা পড়েছিল ছিটকা ফাঁদে। এটি বৃত্তাকার হয়, পাতা হয় একটি একটি করে। এছাড়া গলা ফাঁদ হয় মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে, যাতে হরিণের গলা আটকে যায় আর হাঁটা ফাঁদ মাটিতে পাতা হয় বলে পা আটকায়।
জনাব চৌধুরী বলছিলেন, 'ফাঁদগুলো তৈরি করা হয় সাধারণত: নাইলুন সুতা বা দড়ি দিয়ে। কখনও কখনও দড়ি বা সূতার পরিবর্তে চিকন জিআই তারের ব্যবহারও লক্ষ্য করা গেছে। বাঘের শক্তি বেশি বলে এটি ছাড়াতে যত বেশী চেষ্টা করে, ততই নাইলনের রশি মাংসপেশি কেটে ভিতরে ঢুকে যায়। ২০১২ সালে তিন পা-ওয়ালা একটি বাঘ পাওয়া গিয়েছিল সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে, যার একটি পা কাটা পড়েছিল সম্ভবত হরিণ ধরার ফাঁদেই। বাঘ একপর্যায়ে এসব ফাঁদ ছিঁড়ে বেরুতে পারলেও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। ২০১৪ সালে ফাঁদ ছিঁড়ে বের হয়ে আসা এমন একটি বাঘ পরে মারাও যায়।'
বাঘ বাড়লেও শিকারি কমেনি
হরিণ শিকারে বাঘের ক্ষতি হচ্ছে দুই দিক থেকে। একদিকে যেমন বাঘের খাবারের সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাঘের নিজেরও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বাঘের খাবার মূলত চিত্রাহরিণ। এছাড়া আছে মায়া হরিণ ও বন্য শূকর। বনে একটি বাঘের বিপরীতে ৫০০ হরিণ থাকলে তাকে আদর্শ ধরা হয়। সপ্তাহে একটি বাঘের ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাংস প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অন্তত একটি প্রাপ্তবয়স্ক হরিণ লাগে।
যদিও সাম্প্রতিককালে বাঘের সংখ্যা ১০ বছর আগের তুলনায় বেড়ে ১২৫টিতে দাঁড়িয়েছে, তবে চোরা শিকারিদের দাপট কিন্তু আগের মতোই আছে। পূর্ব সুন্দরবনে বেশি ফাঁদ পাতা হয় দাকোপ উপজেলার ঘাগড়ামারী, জোংরা, মরা পশুরের মতো বাউন্ডারী ক্যাম্পগুলোতে। আর শরণখোলা উপজেলার কোকিলমণি, শেলার চর, কটকা আর কচিখালিতে হরিণ শিকারিরা আসে বলেশ্বর নদী পার হয়ে বরগুনার পাথরঘাটা থেকে।
রেজাউল চৌধুরী বললেন, হরিণের মাংস বিক্রি করা এখানকার অনেক মানুষের পেশা। তারা যুগ যুগ ধরে এ কাজ করছে। পর্যটক, সরকারি-বেসরকারি চাকুরে, রাজনীতিবিদসহ অনেকে এর ভোক্তা। অতিথি আপ্যায়নেও সুন্দরবনসংলগ্ন লোকালয়গুলোতে হরিণের মাংসের চাহিদা আছে।
ড্রোন যোগ হয়েছে স্মার্ট টিমে
রেজাউল চৌধুরী ২০২৫ সালে দ্বিতীয় দফায় সুন্দরবন এসে বনের ভিতরে ফুট প্যাট্রলিং কার্যক্রমটি জোর দিয়ে চালু করেছেন। আগে মূলত খালে বা খালের পাড়ে জলযানযোগে টহল ব্যবস্থা বেশী চালু ছিল। ক্রমাগত ফুট প্যাট্রলিংয়ে প্যারালাল লাইন সারচিং পদ্ধতিতে ফাঁদ অপসারণ অভিযানের কারণে এখন বনের ভেতর থেকে অনেক ফাঁদ উদ্ধার করা যাচ্ছে।
টহল টিমগুলো পর পর দুইদিনে একদিন বনের ভেতরে প্রবেশ করে ফাঁদ অনুসন্ধান করেন। কাজে যোগ দেওয়ার পরদিন থেকেই সুন্দরবনে হরিণসহ সকল বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ করতে রেজাউল চৌধুরী স্টাফ মিটিং করে যাচ্ছিলেন একের পর এক।
পূর্ব সুন্দরবনে ৪৩টি ক্যাম্প রয়েছে যার মধ্যে কটকা, কচিখালি, শেলারচর, কোকিলমনি, জোংরা, করমজল, মরাপশুর, খাগড়ামারি অন্তর্ভুক্ত।
জনাব চৌধুরী বলছিলেন, সুন্দরবন তো কাজেরই জায়গা। যারা বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং গবেষণায় আন্তরিক তাদের জন্য এটি স্বর্গসম। কিন্তু এলাকার অনেকে বন ও বন্যপ্রাণীকে জীবিকার উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে। স্বল্প সময়ে অধিক মাছ পাওয়ার আশায় কিছু অসৎ মহাজন জেলেদের কাছে বিষও সরবরাহ করে। এতে মাছ, মাছের পোনা, রেণু, কাঁকড়া, কুচিয়া সব মারা পড়ে। এটি রোধ করতে স্মার্ট পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। স্মার্ট টিমের সঙ্গে ডাটা এন্ট্রি ডিভাইস, জিপিএস ট্রেকার থাকে। সম্প্রতি ড্রোন যোগ করা হয়েছে স্মার্ট পেট্রলিংয়ে। এর ফলে কোথায় কোথায় অবৈধ নৌকা বা ট্রলার অথবা ফাঁদ পাতা আছে তা জানার সুযোগ বাড়ছে। এছাড়া মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে খাল বা নদীর কোথাও মাছ ধরা নৌকা থাকলে তা নিখুঁতভাবে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে। গত বর্ষায় বনাভ্যন্তরে থাকা অবৈধ সবগুলো চিংড়ি শুটকির ঘর ভাঙা হয়েছিল এই ড্রোনের সহায়তা নিয়েই। ড্রোন ব্যবহারে সময় ও জ্বালানি তেল খরচ দুই-ই বাঁচানো যায়।
প্রাণী প্রেমের শুরু ছোটোবেলাতেই
ছোটবেলায় রেজাউল কুকুর, বিড়াল, হাঁস-মুরগী পুষতেন। কবুতরও ছিল অনেকগুলো। প্রাণীর প্রতি মমতার সেই শুরু। সিরাজগঞ্জে তাদের বাড়ি। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পিতা-মাতা দু'জনেই ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্ট্রি বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন। বন ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে পরিচয় ঘটতে থাকল বিশদভাবে। সেখানে বিদেশি শিক্ষকদের সাহচর্যও পেয়েছেন। শিখলেন বন ব্যবস্থাপনা ও প্রাণী সংরক্ষণ কৌশল। পড়ার বিষয় হিসেবে বনভ্রমণও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে সহপাঠীদের সঙ্গে সুন্দরবন, মধুপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, লাউয়াছড়া, রাজশাহী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৯৯৩ সালে স্নাতক হওয়ার পর পরই তিনি কিছুকাল এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের অ্যাগ্রো ফরেস্ট্রি বিভাগে কর্মসূচি সংগঠকের কাজ করেন।
১৯৯৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেলেন। সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে তার প্রথম পোস্টিং ছিল পটুয়াখালী উপকূলীয় এলাকায়। মূলত, দেশ স্বাধীন পর থেকে দেশের ৭২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তথা গ্রিন বেল্ট তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথমদিকে এ কৃত্রিম বন তৈরির কাজ ছিল খুব ধীরগতির। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার তিন লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটলে, গ্রিন বেল্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি করে অনুভূত হয় এবং কার্যক্রমের গতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলাফলে নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট অঞ্চলে ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলায় প্রাণহানি ঘটেনি বললেই চলে। সুন্দরবনও সিডর-আইলার কবল থেকে মানুষ ও ধন-সম্পদ বাঁচিয়েছে দারুণভাবে।
অনার্স শেষে চাকুরি করতে করতে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ২০০৯ সালে। পরে তিনি ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রিও অর্জন করেন।
হাজারিখিল বিশেষ বন
কৃত্রিম বনায়নে সারিবদ্ধ করে বৃক্ষরোপণ করা হয় যা ঝড় ঠেকাতে কার্যকর। এছাড়া বন্যপ্রাণীর আশ্রয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এসব গাছের গোড়ার দিকে কিছু প্রাণী বসতি নেয়, যেমন- বনমোরগ, গোসাপ, বেজি, টুনটুনি ইত্যাদি।
ওপরের দিকে থাকে বড়চিল, ঈগল, শকুন ইত্যাদি। রেজাউল চৌধুরী বলছিলেন, 'সব প্রাণীই আড়াল ও আশ্রয় খোঁজে তার নিজের নিরাপত্তার জন্য। এমনকি বাঘও। বেশি মানুষ যেখানে জড়ো হয় সেখান থেকে বাঘও সরে যায়। বন তাই প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। উপকূলীয় বনগুলো ঝড় ঠেকানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণীরও নিরাপত্তার উপায় হয়।'
বন বিভাগে যোগদানের পর থেকে উপকূলীয় বনাঞ্চলে ছয় বছর ছিলেন রেজাউল চৌধুরী। তারপর কক্সবাজারে ছিলেন ছয় মাস। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী গাছ প্রজাতির ভিন্নতা দেখা যায়, যেমন- পটুয়াখালিতে কেওড়া বন বেশি, মহেশখালী, টেকনাফ ও কক্সবাজারে আবার বাইন ভালো জন্মে।
কক্সবাজারের পরে চট্টগ্রামে ছিলেন ৩ বছর। ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য তার বিবেচনায় একটি বিশেষ বন, কারণ এখানে বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য বেশি। এ বনে বন্য ছাগলও আছে, যা আমাদের দেশে দুর্লভ। সেখানে আরও আছে উল্লুক, কাঠময়ুর, ভাল্লুক, বনমোরগ ইত্যাদি।
এরপর সুন্দরবনে ছিলেন প্রায় দুই বছর। তারপর পদায়ন হয়েছিল রাঙামাটিতে। তারপর চট্টগ্রাম ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বিভাগ ও কক্সবাজারে চাকুরি করেন।
ময়মনসিংহ বন বিভাগে থাকাকালে তিনি আইইউসিএনে যোগদান করেন। আইইউসিএন-এর পর তিনি জাতিসংঘের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইউএনডিপিতেও বন্যপ্রাণী এবং ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনায় ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রায় চার বছর কাজ করেন।
তারপর সরকার তাকে সিলেট বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে নিয়োগ করেন। সেসময় তিনি তার সদর দপ্তর মৌলভীবাজার থেকেই সিলেট, হবিগঞ্জ আর সুনামগঞ্জেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করেন। বন্যপ্রাণী নিয়ে সেখানে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে সরকার তাকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার (স্বর্ণপদক) 'বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড)' প্রদান করেন।
খড়ের নীচে গোখরো
ভূ-বৈচিত্র্য এবং প্রাণবৈচিত্র্যে সিলেট জোন অনন্য। এখানে উঁচু-নিচু টিলা যেমন আছে, জলাভূমিও আছে। তাই স্থানভেদে বিভিন্ন রকমের প্রাণীর প্রাচুর্য রয়েছে সেখানে। সেখানকার সংরক্ষিত বনগুলোর অন্যতম লাউয়াছড়া, আদমপুর, বর্ষিজোড়া, লাঠিটিলা, রেমা কালেঙ্গা, রাজকান্দি ইত্যাদি।
জনাব চৌধুরী বলছিলেন, 'সিলেটের বনে চলাচলও সহজ। তাই প্রাণীকুলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া সহজ হয়। স্থানীয় লোকজনও ভালো, প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী। সাংবাদিকরাও খুব সহযোগী। তারা নিজেরাই ছদ্মবেশ ধরে আমাদের সাথে হোটেল থেকে বন্যপ্রাণীর মাংস উদ্ধার করেছেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নিতে সাথে থেকেছেন।'
'মৌলভীবাজারে আমরা অনেকগুলো উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছি, যার মধ্যে কয়েকটি স্মৃতিতে রয়ে গেছে। একবার এক ঘরে বুনো শূকর ঢুকে পড়ে ছাগল এবং মুরগী মেরে ফেলে, ঘরের মালিক বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়ে আমাদের খবর দেন। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছাই এবং ট্রাংকুলাইজার দিয়ে শুকরটিকে অজ্ঞান করে বনে অবমুক্ত করি। ঘরের মালিক খুব অবাক হন এই দেখে যে প্রাণীটিও মরল না আবার তার পরিবারও রেহাই পেল। তিনি তখন খুব দোয়া করেছিলেন,' যোগ করেন তিনি।
আরেকবার একটি গরুর ঘরের খড়ের নীচে গোখরা সাপের ডিম খুঁজে পান বাড়ির মালিক। তিনি কিন্তু সাপটিকে মারেননি এবং ডিমগুলোও নষ্ট করেননি। বনবিভাগে খবর দিলে জনাব চৌধুরীর সহকর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছে যান এবং ডিমগুলো নিয়ে আসেন। ডিমগুলো আনার মাসখানেক পরে ডিম ফুটে বাচ্চা হলে বাচ্চাগুলোকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়।
রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'সেখানে একবার একটি মেছো বিড়াল নিয়ে আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটে। বিড়ালটি ছিল গর্ভবতী। মেছো বিড়ালটি একটি ফাঁদে আটকা পড়লে বাড়ির মালিক কী করবে বুঝতে না পেরে বনবিভাগে খবর পৌঁছান। আমরা প্রথমে ফাঁদ পেতে বিড়ালটিকে ধরে নিরাপত্তা দিই। সে একে একে তিনটি বাচ্চা প্রসব করে। ফাঁদের মুখ খুলে দিয়ে তাকে বেড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিই। এরপর আশপাশের সব লোককে সরিয়ে দিই। লোকজন উদ্বিগ্ন ছিল বিড়ালটি বাচ্চা নিতে আর ফিরে আসবে কি-না। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানি মা তার সন্তানকে ছেড়ে বেশিদূরে যায় না। লোকজন আড়াল নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সন্ধ্যাবেলায় পরিবেশ একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার সাথে সাথে মা বিড়ালটি একে একে তার তিনটি বাচ্চাকেই সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়।'
রেজাউল করিম চৌধুরী বন ব্যবস্থাপনা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক পড়াশোনায় বিরতি খুব কম নিয়েছেন। তিনি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট (ডিপ্লোমা) করেছেন ভারতের দেরাদুনস্থ ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা তার বেশ ভালো। সেখানকার ১৩টি প্রদেশে উন্নতমানের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা দেখে অনেক কিছু শিখেছেনও।
সেখানে বিস্তীর্ণ ভূমি খালি আছে। বড় বড় জাতীয় উদ্যান আছে। কানহা ন্যাশনাল পার্কটি যেমন প্রায় ৯০০ বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশী আবার কাজীরাঙা ন্যাশনাল পার্কটিরও আয়তন প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার। এরকম বড় বড় বেশ কয়েকটি ন্যাশনাল পার্ক আছে সে দেশে। ভারতে বাঘ আছে, গণ্ডার আছে, সিংহও আছে। মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেশি। খুব কম মানুষই বন্যপ্রাণী তথা হরিণের মাংস খায়। তাদের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ নিরামিষভোজী।
নেপালের চিতোয়ান ন্যাশনাল পার্ক ও বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কও বিশালাকার এবং জীববৈচিত্রে পরিপূর্ণ। সেখান থেকে জনাব চৌধুরী অনেক কিছু শিখেছেন এবং তা এদেশেও চর্চা করছেন।
দারিদ্র্য কি আমাদের সচেতন হওয়ার পক্ষে বাধাস্বরূপ? জানতে চাইলে জনাব চৌধুরী বললেন, 'আমি তা মনে করি না। আমাদের ও ভারতের দারিদ্রের হার প্রায় একই রকম। কিন্তু আমাদের এখানে মানুষ বন্যপ্রাণীর প্রতি যুগ যুগ ধরে ভুল ধারণার শিকার। বহুকাল ধরেই স্থানীয় লোকজন বন্যপ্রাণী শিকারকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছে। তাই দারিদ্র্য সমস্যা নয় বরং অভ্যাস ও কুসংস্কারই প্রধান সমস্যা। প্রয়োজন হলো, স্থানীয়দেরকে বন রক্ষার সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করা। বন সংরক্ষণে তাদের ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা তাদেরকে জানাতে হবে। বন না থাকলে তারা যে বিপন্ন হবে সেটাও বোঝাতে হবে।'
অদ্ভুত বন সুন্দরবন
সিডরে সুন্দরবনের সিংহভাগ গাছের পাতা পর্যন্ত উড়ে চলে গেছে। তখন বিশেষজ্ঞদেরও কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, বনটি আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। কিন্তু বছর না ঘুরতেই বনটি নিজের চেহারা ফিরিয়ে এনেছে। সুন্দরবন এক অদ্ভু্ত সামর্থ্যবান বন।
২০২৫ সালে সুন্দরবনে ফিরে এসে জনাব চৌধুরী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেটি হলো রাশমেলার তীর্থযাত্রাকে বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত করেছেন। বনের একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে সমুদ্রের কোলের চর দুবলায় রাশ পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে বিশাল জনসমাবেশ ঘটে।
নির্দিষ্ট ধর্মের লোকদের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও অন্য ধর্মাবলম্বীরাও এতে যোগ দেয় বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে। আগে এই সময়ে অগণিত ফাঁদ পাতা হতো বনের বিভিন্ন অংশে। কারণ কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, রাস যাত্রীরা ইচ্ছেমতো দিনে ও রাত্রে নৌকা ছাড়ত। পশুর নদী সংলগ্ন খালে ঢুকে পড়ত, ফাঁদ পেতে দুবলায় চলে যেত আর ফেরার সময় হরিণের মাংস নিয়ে ঘরে ফিরত।
জনাব চৌধুরী নিয়ম করলেন, মেলার ঠিক আগের দিন সবগুলো নৌকা চাঁদপাই রেঞ্জ ও ঢাংমারীর নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হবে, বনবিভাগের রক্ষীরা সামনে পিছনে পাহারা দিয়ে সকাল আটটায় সেগুলো রওয়ানা হয়ে সন্ধ্যার পূর্বেই আলোরকোল পৌঁছে দেবে। একই পদ্ধতিতে ফিরিয়েও আনবে। এ নিয়ম চালু হওয়ায় ২০২৫ সালে বনে কেউ হরিণ শিকার করতে পারেনি।
বনকর্মীরা কষ্টে আছে
জনাব চৌধুরির সুন্দরবনে গত আট মাসের কর্মকালে বনের মধ্যে ও বনের পাশে মোট অভিযান চালানো হয়েছে ৩২৮টি। আসামি করা হয়েছে ৩৩০ জনকে, যার মধ্যে ধরা পড়েছে ৩১১ জন। হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছে ২৪২ কেজি। জব্দ করা হয়েছে ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ ৩৮০টি, হাঁটা ফাঁদ ২০০০টি, বিষ ৯০ বোতল, বিষযুক্ত মাছ ৬৯৯ কেজি, কাঁকড়া ৮১৬ কেজি, ট্রলার ও নৌকা ৩৫১টি ।
আনন্দের ব্যাপার হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে গাছ চুরি একেবারেই কমে গেছে। বিক্রির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে বলে জানালেন তিনি। আরও জানালেন, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারিতে জারি হয়েছে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬। ঠিকমতো এর প্রয়োগ ঘটানো গেলে বন্যপ্রাণী শিকার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
তবে তিনি বনকর্মীদের ঝুঁকি ভাতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন। তাদের জন্য রেশনেরও ব্যবস্থা করা দরকার বলে জানান। বনের স্টাফ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম আছে। মঞ্জুরীকৃত পদের এক-তৃতীয়াংশ শূন্য রয়েছে।
সাম্প্রতিককালে বোটম্যান নেওয়া হচ্ছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে, এতে তারা উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটায়। কারণ তাদের চাকরি সরকারি হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদেরকে আগ্নেয়াস্ত্রও হাতে দেয়া যাচ্ছে না।
রেজাউল করিম চৌধুরী চাকুরিতে থেকেই বর্তমানে তার পিএইচডি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিষয় নিয়েছেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড়া এলাকায় মানুষ ও মেছোবাঘের দ্বন্দ্ব নিরসন। বনের জীবনে তিনি সুখী। বনের সুদিনের ব্যাপারে আশাবাদী।
ছবি : রেজাউল করীম চৌধুরীর ফেসবুক পাতা
