ম্যানচেস্টারের করপোরেট জীবন ছেড়ে খাগড়াছড়ির বনে, এবার জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন মাহফুজ রাসেল
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পের উচ্চবেতনের করপোরেট জীবন, বিলাসবহুল কর্মপরিবেশ এবং নিশ্চিত ক্যারিয়ার—সবকিছু পেছনে ফেলে এক দশক আগে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে স্থায়ী হন মাহফুজ আহমেদ রাসেল। সময়ের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্তই তাকে পরিচিত করে তোলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক অনন্য নাম হিসেবে। আজ তিনি 'মাহফুজ রাসেল' নামেই সবার কাছে পরিচিত—যার জীবন যেন বন আর প্রকৃতির সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘ এক দশকের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের 'বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫'-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় (শ্রেণি-ছ) প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে এ মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার পূর্ব খেদাছড়ায় গড়ে তোলা তার ৭৫ একরের প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বন 'পিটাছড়া' এখন বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে রাসেল তার দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।
করপোরেট জীবন থেকে পাহাড়ে প্রত্যাবর্তন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা শেষে পোশাক খাতে কর্মজীবন শুরু করেন রাসেল। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন।
প্যারিস, মিলান, লন্ডন ও টোকিওর মতো শহরে কাজ করলেও সেই জীবন তাকে তৃপ্ত করতে পারেনি।
তিনি বলেন, 'আমরা মানুষকে ক্রমেই বেশি ভোগবাদী করে তুলছি—এই উপলব্ধি আমাকে নাড়া দেয়।'
পরবর্তীতে তিনি ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব কমিউনিটিতে কাজ করেন। আমাজনের অভিজ্ঞতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, 'আমাজনে গিয়ে বুঝেছি মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতিরই একটি ক্ষুদ্র অংশ'।
সেই উপলব্ধি থেকেই ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টার থেকে বাংলাদেশে ফিরে প্রথমে মাত্র পাঁচ একর পাহাড়ি জমি কেনেন মাহফুজ রাসেল। উদ্দেশ্য ছিল শান্ত ও নিরিবিলি জীবনযাপন। কিন্তু খাগড়াছড়ির পাহাড়ে এসে তিনি দেখতে পান—বন উজাড়, তামাক চাষের বিস্তার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের চিত্র।
এই বাস্তবতা তাকে বদলে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য একটি নিরাপদ বনাঞ্চল গড়ে তুলবেন।
শুরুটা ছিল একাকীত্বপূর্ণ ও কঠিন। আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত পাহাড়ে বাঁশ ও ছনের ঘরে বসবাস শুরু করেন তিনি। স্থানীয়দের অনেকেই তখন তাকে অস্বাভাবিক উদ্যোগ নেওয়া মানুষ হিসেবে দেখতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্যোগে যুক্ত হন প্রকৃতিপ্রেমী বন্ধু ও সহযাত্রীরা। ধীরে ধীরে পাঁচ একরের সেই উদ্যোগ রূপ নেয় ৭৫ একরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে।
পিটাছড়া: 'নো ইন্টারভেনশন' দর্শনের বন
পিটাছড়ার মূল দর্শন হলো—প্রকৃতিকে তার নিজের মতো করে বিকশিত হতে দেওয়া।
রাসেল বলেন, 'বন তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'নো ইন্টারভেনশন'। প্রকৃতি মানুষের চেয়ে ভালো জানে কীভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করতে হয়।'
এই দর্শনের ফলে গত এক দশকে এখানে গড়ে উঠেছে গর্জন, চাপালিশ, গামার, ডুমুর, বুনো আমড়া ও বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষের সমৃদ্ধ বনাঞ্চল।
এখানে এখন নিরাপদ আবাস গড়ে তুলেছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। মহাবিপন্ন এশীয় হলদে কচ্ছপ, পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ, গোলবাহার অজগর, চশমাপড়া হনুমান, কেউটে, শঙ্খিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের উপস্থিতি নিয়মিত পাওয়া যায়।
বনের ঝিরি-ছড়াগুলোতে দেখা মেলে ৩০টিরও বেশি প্রজাতির পাহাড়ি ব্যাঙের। পাশাপাশি লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, বনরুই, বুনো সজারু ও চিতা বিড়ালের মতো প্রাণীরও আবাস গড়ে উঠেছে এখানে।
পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্যও পিটাছড়া এখন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ধনেশ, হিল ময়না, কাঠঠোকরা, সাহেব বুলবুল ও বিভিন্ন প্রজাতির বুনো পেঁচার উপস্থিতি বনের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ঝিরি ও পাহাড়ি পরিবেশ রক্ষার লড়াই
পিটাছড়া নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতি সংরক্ষণের ধারণা। 'পিটা' একটি বিরল পাখি এবং 'ছড়া' মানে পাহাড়ি জলধারা।
মাহফুজ রাসেলের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে ঝিরি ও প্রাকৃতিক জলধারা রক্ষা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, 'ঝিরি শুকিয়ে গেলে বন্যপ্রাণীও টিকতে পারবে না। তাই আমরা স্থানীয় প্রজাতির গাছপালা সংরক্ষণ করে পানির উৎস সচল রাখার চেষ্টা করছি।'
তার মতে, শুধু শিকার বন্ধ করলেই বন বাঁচবে না—বনভূমি নিজেই রক্ষা করা জরুরি।
স্থানীয় অংশগ্রহণেই সংরক্ষণ
পিটাছড়া সংরক্ষণ উদ্যোগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন রাসেল।
এখানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শিক্ষা সহায়তা, মাশরুম চাষ ও জৈব কৃষির প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে পরিচালিত একটি বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থানীয়দের চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, এসব উদ্যোগের ফলে এলাকায় শিকারের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। রাসেলের ভাষায়, 'মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারলেই বনের ওপর চাপ কমে।'
বর্তমানে পিটাছড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান, বনবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জীবন্ত গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে।
এখানে সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও চলছে। দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জাতীয় স্বীকৃতি
মাহফুজ রাসেল জানান, ভবিষ্যতে পার্বত্য অঞ্চলে সবুজ আচ্ছাদন বাড়াতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, 'বন সংরক্ষণকে টেকসই করতে হলে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন জরুরি। তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকাকে আমরা সংরক্ষণের অংশ হিসেবে দেখি।'
জাতীয় পুরস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এই অর্জন একক কারো নয়। অনেক মানুষের সহযোগিতা ও আস্থার ফলেই আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে।'
