তাঁর অনন্য জীবনের রোমাঞ্চকর মহাকাব্য
পৃথিবীর বয়স কোটি কোটি বছর হলেও ডেভিড অ্যাটেনবরো নামের এক বিস্ময়কর মানুষ এই ধুলোবালির গ্রহে কাটিয়ে দিলেন আস্ত একটা শতাব্দী। ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রকৃতিবিদের ১০০ বছরের জীবন যেন নিজেই এক জীবন্ত মহাকাব্য। সিএনএনের অমরচি ওরি অ্যাটেনবরোর জীবনের এই বিশাল ক্যানভাস মেলে ধরেছেন। আর আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে দুর্গম জঙ্গল, অতল সমুদ্র আর বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীদের সাথে একজন মানুষের এক নিবিড় সখ্যের গল্প।
এক শতাব্দী ধরে তিনি চষে বেড়িয়েছেন বন-পাহাড় আর মহাসমুদ্র। সময় কাটিয়েছেন গরিলা পরিবারের সাথে। কুড়িয়েছেন প্রাচীন জীবাশ্ম। আর খুঁজে বের করেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা আদিম সব উপজাতি। ইউরোপে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচারের সূচনা থেকে শুরু করে কোটি কোটি দর্শককে প্রকৃতির রহস্য শোনানো–সবই করেছেন এই এক জীবনে। ডজন ডজন প্রাণীর নামকরণ হয়েছে তার নামে, আর জীবনের শেষ লগ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পৃথিবীর সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর। মানুষের সাথে, পশুপাখির সাথে আর গাছপালার সাথে কাটানো এই বর্ণিল জীবনের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রোমাঞ্চকর গল্প।
রাজপুত্র, রাজকুমারী এবং এক ডানপিটে কাকাতুয়া
অ্যাটেনবরোর শুরুটা হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে 'জু কোয়েস্ট' সিরিজের মাধ্যমে। ১৯৫৪ সালের সেই সিরিজ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে একটি পরিচিত মুখ হিসেবে গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনের লাইম গ্রোভ স্টুডিওতে এক মজার এবং কিছুটা উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও ইতিহাসের অংশ। তিন বছরের এক 'কাকাতুয়া' পাখি নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের সামনে। তৎকালীন খুদে রাজপুত্র চার্লস আর রাজকুমারী অ্যানের সাথে সেই পাখির মোলাকাত করিয়েছিলেন তিনি। পাখিটির নাম ছিল 'ককি'। অ্যাটেনবরোর শেষ 'জু কোয়েস্ট' অভিযানের সময় একে গভীর জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করে অ্যাটেনবরো ২০২৩ সালে চার্লসের রাজ্যাভিষেকের ঠিক আগে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পাখিটি তখন রাজপুত্রের কচি হাতের ওপর বসে ছিল। পাখিটির ঠোঁট ছিল ভীষণ শক্ত এবং তার কামড়ও ছিল মারাত্মক। যদিও ককির শান্ত স্বভাবের ওপর তার পূর্ণ ভরসা ছিল, তবুও মনে মনে কিছুটা ভয় কাজ করছিল।
অ্যাটেনবরো হাসতে হাসতে পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বলেছিলেন, 'পাখিটি চাইলে খুব সহজেই চার্লসের ছোট্ট কড়ে আঙুলটা ছিঁড়ে নিতে পারত। সেই ঝুঁকিটা ছিল চোখে পড়ার মতো।'
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয় যে সেই সময়েও বন্য প্রাণীদের নিয়ে মানুষের সামনে আসা এবং তাদের আচার-আচরণ সামলানো কতটা নিপুণ দক্ষতার কাজ ছিল। তাঁর সেই সহজাত এবং মমতাময়ী ভঙ্গিই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আপন করে তুলেছিল।
টেলিভিশনের বাঁকবদল এবং উদ্ভাবনী মেধা
সেই শুরু, এর পর থেকে তার ক্যারিয়ারে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তার জনপ্রিয়তা গগনচুম্বী হতে থাকে। ১৯৬৫ সালে তিনি বিবিসির নবগঠিত দ্বিতীয় চ্যানেল 'বিবিসি টু'-এর নিয়ন্ত্রক বা কন্ট্রোলার হিসেবে দায়িত্ব পান। এই দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি সৃজনশীলতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। সেখান থেকেই তিনি দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন 'মন্টি পাইথনস ফ্লাইয়িং সার্কাস'-এর মতো প্রথাভঙ্গকারী এবং অদ্ভুত সব কমেডি সিরিজের সাথে। এই সিরিজ ব্রিটিশ কমেডির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল।
এর কারণ হলো, ১৯৬৯ সালের আগে টেলিভিশন কমেডি মানেই ছিল একটা নির্দিষ্ট ছক, প্রথমে একটা ভূমিকা থাকবে, মাঝখানে কিছু কৌতুক, আর শেষে একটা পাঞ্চলাইন বা হাসির সমাপ্তি। কিন্তু 'মন্টি পাইথন' এসে সেই ছকটাকেই ভেঙে চুরমার করে দেয়। কোনো প্রথাগত সমাপ্তি নেই: সাধারণত কোনো নাটকের শেষে বা কমেডির শেষে একটা যৌক্তিক সমাপ্তি থাকে।
কিন্তু মন্টি পাইথনের ক্ষেত্রে দেখা যেত, একটি দৃশ্য মাঝপথে হঠাৎ থেমে গেল। হয়তো একজন বর্ম পরা মানুষ এসে বড় একটা রাবার মুরগি দিয়ে অভিনেতাকে মাথায় বাড়ি দিল আর দৃশ্যটি শেষ হয়ে গেল! তারা দর্শকদের এটা বোঝাতে চাইতেন, হাসানোর জন্য সব সময় নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা যুক্তির দরকার নেই।
স্ট্রিম অব কনশাসনেস
এই সিরিজে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার জন্য কোনো যোগসূত্র রাখত না। হয়তো একটা দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে কেউ অফিসে বসে গম্ভীর আলোচনা করছে, হঠাৎ করেই সে পরের সেকেন্ডে মরুভূমির মাঝখানে গান গাইতে শুরু করল। এই যে খামখেয়ালি বা অদ্ভুতুড়ে বা সাররিয়েল ভঙ্গি, এ ধরনের উপস্থাপনা ছিল টেলিভিশনের ইতিহাসে প্রথম। অ্যানিমেশনের ব্যবহার: সিরিজটির অন্যতম সদস্য টেরি গিলিয়াম অদ্ভুত সব কোলাজ অ্যানিমেশন ব্যবহার করতেন (যেমন আকাশ থেকে বড় একটা পা নেমে এসে কাউকে পিষে দিচ্ছে)।
এই অ্যানিমেশনগুলো বাস্তব দৃশ্য আর কল্পনার মধ্যে একটা অদ্ভুত মিশেল তৈরি করত, যা আগে কেউ দেখেনি। বুদ্ধিবৃত্তিক কিন্তু অদ্ভুত: এই সিরিজে বড় বড় দার্শনিক বা ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে হাসাহাসি কর হতো, তেমনি আবার একদম অর্থহীন কথাবার্তা দিয়েও হাসাত। তারা প্রমাণ করেছিল, কমেডি মানে শুধু ভাঁড়ামি নয়, বরং তা হতে পারে বুদ্ধিদীপ্ত এবং সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।
এরপর ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাটেনবরো বিবিসির টেলিভিশন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রশাসনিক চেয়ারে বসে ফাইলের পর ফাইল সই করার চেয়ে নিজের ক্যামেরা আর রেকর্ডার নিয়ে প্রকৃতির নির্জনতায় ছুটে যাওয়ার নেশা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরত। তাই ১৯৭২ সালে সেই প্রভাবশালী পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে তিনি আবারও বেরিয়ে পড়েন নিজের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের নেশায়।
তার এই সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই বিশ্ববাসী পরবর্তী সময়ে পেয়েছে 'লাইফ অন আর্থ'-এর মতো বিশ্বমানের প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ। প্রশাসনিক কাজের গণ্ডি আর ক্ষমতার মোহ তাকে আটকে রাখতে পারেনি; কারণ, তাঁর আসল ঘর ছিল আদিম প্রকৃতি আর অবারিত অরণ্যের গভীরে।
বিয়ামি উপজাতির সাথে সেই অবিশ্বাস্য প্রথম যোগাযোগ
অমরচি ওরি তার বর্ণনায় তুলে এনেছেন ১৯৭১ সালের সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের কথা, যখন নিউ গিনির এক জনমানবহীন দুর্গম এলাকায় 'বিয়ামি' উপজাতির সাথে প্রথম দেখা করেন অ্যাটেনবরো। বিবিসির 'এ ব্ল্যাঙ্ক অন দ্য ম্যাপ' প্রামাণ্যচিত্রের জন্য তিনি এক বিশাল রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন। বিয়ামি উপজাতির সেই মানুষেরা এর আগে কখনো বাইরের পৃথিবীর বা আধুনিক সভ্যতার কোনো মানুষ দেখেনি। এমনকি তারা জানতই না যে তাদের পাহাড়ের ওপাশে অন্য কোনো জগৎ আছে।
কোনো সাধারণ ভাষা না জানলেও কেবল হাতের ইশারায় আর চোখের ভাষায় অ্যাটেনবরো তাদের সাথে ভাব জমিয়েছিলেন। তাদের শরীরের অদ্ভুত সব গয়নাগাটি খুঁটিয়ে দেখা, তাদের জীবনযাত্রার ধরন বোঝা এবং নাকে পরা বিচিত্র কাঠি নিয়ে তাঁর সেই শিশুর মতো কৌতূহল আজও ক্যামেরার ফ্রেমে অমলিন হয়ে আছে।
২০১৬ সালে সিএনএনের ক্রিস্টিয়ান আমানপুরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই মুহূর্তটি স্মরণ করে বলেছিলেন, 'এটা সত্যিই এক অবিস্মরণীয় ব্যাপার। আপনি যখন কারও ভাষার একটা শব্দও জানেন না, এমনকি তারা আগে কখনো আপনার মতো চামড়ার বা আপনার মতো পোশাকের কাউকে দেখেনি, তখনো আপনি তাদের সাথে কতটা স্বচ্ছন্দ আর সাবলীল হয়ে উঠতে পারেন, তা অভাবনীয়।'
এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে মানুষের সাথে আন্তরিক যোগাযোগ স্থাপনে অ্যাটেনবরোর কোনো কৃত্রিমতার প্রয়োজন ছিল না। তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছেন যে হৃদয়ের টান থাকলে শব্দের দেয়াল কোনো বাধা হতে পারে না।
পাহাড়ের গরিলা এবং 'পাবলো'র সাথে সেই অমর মুহূর্ত
তবে শুধু মানুষের সাথে নয়, বন্য প্রাণীদের সাথেও তাঁর ছিল এক আদিম এবং নিগূঢ় টান। ১৯৭৮ সালে রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালার মেঘে ঢাকা গভীর বনে এক মাউন্টেন গরিলা পরিবারের সাথে তাঁর সখ্য তৈরি হয়। 'লাইফ অন আর্থ' চিত্রায়ণের সময় এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। 'পাবলো' নামের তিন বছর বয়সী এক শিশু গরিলা হুট করে অ্যাটেনবরোর গায়ের ওপর এসে পড়ে এবং পরম নির্ভরতায় গড়াগড়ি খেতে শুরু করে। সেই দৃশ্যটি সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল এবং বন্য প্রাণীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিয়েছিল।
২০২৬ সালের এপ্রিলে মুক্তি পাওয়া 'এ গরিলা স্টোরি' সিনেমায় তিনি পুরোনো দিনের সেই সাদা-কালো স্মৃতি মনে করে বলেন, এই একরত্তি গরিলার সাথেই তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য আত্মার সংযোগের শুরু হয়েছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন, গরিলা সংরক্ষণের লড়াইয়ে এটি ছিল তাঁর দেখা সবচেয়ে বড় এবং সফল মানবিক গল্পের অন্যতম।
সেই সত্তরের দশক থেকে শুরু করে আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়েও গরিলার সাথে তাঁর এই আত্মিক টান একবিন্দুও ম্লান হয়নি। তিনি মনে করেন, প্রাণীদের সাথে মানুষের এই আদি সংযোগই আমাদের শেখায় যে আমরা সবাই একই প্রকৃতির অংশ।
অন্ধ গন্ডারশাবকের সাথে সেই মায়াবী কথোপকথন
প্রকৃতির প্রতি তাঁর নিবিড় মমতা কেবল বিশাল আকৃতির গরিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রতিটি ছোট-বড় প্রাণের প্রতি ছিল তাঁর সমান শ্রদ্ধা। ২০১৩ সালে কেনিয়ার লেওয়া বন্য প্রাণী কেন্দ্রে এক অন্ধ গন্ডারশাবকের সাথে তাঁর সখ্য ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। বিবিসির 'আফ্রিকা' সিরিজের ষষ্ঠ পর্বে একটি অত্যন্ত আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়।
চিত্রায়ণের সময় সেই অন্ধ গন্ডারটি যখন খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে বা মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে, অ্যাটেনবরো বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে মাটিতে নিচু হয়ে বসেন। এরপর সেই ছোট্ট শাবকটির মুখের খুব কাছে নিজের মুখ নিয়ে যান এবং অদ্ভুত একধরনের 'সুইক' বা মিহি শব্দ করে তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করেন। ঠিক যেন এক দয়ালু পিতামহ তার নাতির সাথে কথা বলছেন।
প্রাণীর প্রতি এমন নিঃস্বার্থ মমতা আর তাদের ভাষা পড়ার এই বিরল ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকৃতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি সেই শাবকটিকে 'এক জাদুকরী ও মায়াবী প্রাণী' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন যে ভালোবাসা আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বন্য প্রাণীর সাথেও এক গভীর ও নিবিড় বন্ধুত্বের সেতু গড়া সম্ভব।
লিসেস্টার ক্যাম্পাসের সেই ডানপিটে শৈশব
ডেভিড অ্যাটেনবরোর শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলোও ছিল দারুণ রোমাঞ্চ আর খুনসুটিতে ভরা। নিজের বড় ভাই, প্রয়াত বিখ্যাত অভিনেতা ও অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরোর সাথে তিনি যুক্তরাজ্যের লিসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় হয়েছেন। কারণ, তাঁদের বাবা ছিলেন সেই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল। (যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় 'প্রিন্সিপাল' পদটি মূলত কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্যের অনেক প্রাচীন এবং বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন স্কটল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বা লন্ডনের কিংস কলেজ) ভাইস চ্যান্সেলরের পদটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'প্রিন্সিপাল' বলা হয়। অর্থাৎ তিনি পদাধিকারবলে ভাইস চ্যান্সেলরের সমান ক্ষমতাই ভোগ করেন।
ডেভিড অ্যাটেনবরো যখন লিসেস্টার ক্যাম্পাসে বড় হচ্ছিলেন (১৯৩০-এর দশকে), তখন এটি ছিল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লিসেস্টার। সেই সময়ে অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরাসরি পূর্ণাঙ্গ 'ইউনিভার্সিটি' হওয়ার আগে 'ইউনিভার্সিটি কলেজ' হিসেবে যাত্রা শুরু করত। এই ধরনের কলেজগুলোর প্রধানকে বলা হতো প্রিন্সপাল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৫৭ সালে এটি যখন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়, তখন এই পদের নাম পরিবর্তন হয়ে ভাইস চ্যান্সেলর হয়।) ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ ছিল তাঁদের খেলার মাঠ। একবারের এক মজার ঘটনা স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, ভাই রিচার্ড তাঁকে একবার দুষ্টুমি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পুরোনো এবং পরিত্যক্ত ভবনের প্যাডেড সেলে (মূলত বিশেষ একধরনের কক্ষ, যার দেয়াল এবং মেঝে পুরু ও নরম কুশন বা প্যাড দিয়ে ঢাকা থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কক্ষের ভেতরে থাকা ব্যক্তি যেন কোনোভাবেই নিজের শরীরকে দেয়ালের সাথে আঘাত করে নিজের ক্ষতি করতে না পারেন।) আটকে রেখেছিলেন। সেই ভবনটি একসময় ভিক্টোরিয়ান আমলের একটি উন্মাদ আশ্রম বা পাগলা গারদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এই ছোটবেলার দুষ্টুমি আর কৌতূহলই তাঁদের দুই ভাইকে পরবর্তী জীবনে বিশাল সফলতার পথে নিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০০৬ সালে এই দুই কৃতি সন্তানকে লিসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সর্বোচ্চ সম্মান 'ডিস্টিংগুইশড অনারারি ফেলোশিপ' প্রদান করে। সেই অনুষ্ঠানে দুই ভাইয়ের একসাথে তোলা সেই হাসিমুখের ছবি আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে এক পরম মমতায় শোভা পায়। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণা আর সেই ক্যাম্পাসের বৈজ্ঞানিক পরিবেশই ডেভিডের মনে প্রকৃতির প্রতি কৌতূহলের বীজ বুনে দিয়েছিল।
অগণিত পুরস্কার এবং রাজকীয় সম্মাননার ইতিহাস
২০০০ সালের পর থেকে 'দ্য ব্লু প্ল্যানেট' এবং 'প্ল্যানেট আর্থ'-এর মতো প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তার এক অনন্য শিখরে আরোহণ করেন। সমুদ্রের গভীর তলের রহস্যময় জগৎ থেকে শুরু করে পৃথিবীর দুর্গম বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চলের জীবন–সবই তিনি তাঁর জাদুকরী কণ্ঠের মাধ্যমে মানুষের শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর অসামান্য বর্ণনাশৈলীর জন্য তিনি ২০১৮ সালে 'ব্লু প্ল্যানেট টু'-এর জন্য 'আউটস্ট্যান্ডিং ন্যারেটর' বিভাগে মর্যাদাপূর্ণ এমি পুরস্কার লাভ করেন। একই সিরিজের জন্য তিনি ব্রিটিশ একাডেমি বা বাফটা পুরস্কারও নিজের ঝুলিতে পোরেন।
টেলিভিশন সাংবাদিকতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তাঁর এই সাত দশকের বেশি সময়ের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৫ সালে রানি এলিজাবেথ তাঁকে প্রথমবার 'নাইটহুড' খেতাবে ভূষিত করেন। এরপর ২০২২ সালে এসে কিং চার্লস তাঁকে দ্বিতীয়বার আরও উচ্চতর সম্মানে ভূষিত করেন, যা ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ 'নাইট গ্র্যান্ড ক্রস'। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকডর্স অনুযায়ী তিনি বিশ্বের দীর্ঘতম ক্যারিয়ারধারী টেলিভিশন উপস্থাপক। ২০১৯ সালে তিনি প্রিন্স উইলিয়ামের সাথে মিলে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনী পুরস্কার 'আর্থশট প্রাইজ' চালু করেন।
রানির অকৃত্রিম বন্ধু এবং নেটফ্লিক্সের নতুন দিগন্ত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে ডেভিড অ্যাটেনবরোর সম্পর্ক ছিল এক অকৃত্রিম বন্ধুত্বের। বিশেষ করে রানি এলিজাবেথের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল কিংবদন্তিতুল্য। রানির বেশ কিছু বড়দিনের ভাষণ বা ক্রিসমাস ব্রডকাস্ট তিনি নিজেই পরিচালনা এবং প্রযোজনা করেছিলেন।
২০১৮ সালে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, রানির সাথে বাকিংহাম প্যালেসের রাজকীয় বাগানে তিনি খুব সহজভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছেন। রানির মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছিলেন, 'আমার জীবনের সবচেয়ে দামি স্মৃতিগুলোর একটি হলো রানির সেই মনখোলা হাসি শুনতে পাওয়া।'
১০০ বছর বয়সে এসেও এই ক্লান্তিহীন মানুষটি থেমে নেই। ২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সের 'আওয়ার প্ল্যানেট' সিরিজের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল দর্শকদের কাছে প্রকৃতির বিপন্নতার বার্তা পৌঁছে দেন। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে এই সিরিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, 'অ্যাটেনবরো হলেন সেই মানুষ, যিনি আমাদের চোখের সামনে প্রকৃতির বিস্ময় আর একইসাথে তার ধ্বংসের করুন চিত্রটি তুলে ধরেছেন।'
ডেভিড অ্যাটেনবরো কেবল একজন খ্যাতিমান উপস্থাপক নন, তিনি হলেন আমাদের এই ধরণির এক অতন্দ্র প্রহরী। তার শতবর্ষী এই দীর্ঘ জীবন আমাদের এক মহতী শিক্ষা দেয়। তিনি শিখিয়েছেন যে মানুষ যদি চায়, তবে সে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধের পথে না গিয়ে এক পরম সখ্যে কাটাতে পারে।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর সেই গুরুগম্ভীর অথচ মমতাময় কণ্ঠ আজও সারা বিশ্বের মানুষের কানে প্রতিধ্বনিত হয়–এই পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত আর সুন্দর, একে আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদের প্রতিটি মানুষের। তিনি কেবল তথ্য দেননি, বরং প্রকৃতির প্রতি একধরনের আধ্যাত্মিক ভালোবাসা তৈরি করেছেন বিশ্ববাসীর হৃদয়ে।
এক শতাব্দী আগে লিসেস্টারের যে ক্যাম্পাসে এক কিশোরের মনে কৌতূহলের জন্ম হয়েছিল, সেই কৌতূহল আজও শতবর্ষী এই বীরের চোখে একইভাবে জ্বলজ্বল করছে। প্রকৃতির প্রতি তার এই নিবেদিতপ্রাণ যাত্রা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অফুরন্ত এবং অবিনশ্বর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
