এক শ পূর্ণ করলেন ডেভিড
'অজানা প্রাণী আবিষ্কার কঠিন কাজ নয়। দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনবাদাড়ে একটা পুরো দিন কাটিয়ে আসুন। বনে বসে বসে মরা গাছের গুঁড়ি উল্টান। গাছের বাকলের ফাঁকে দৃষ্টি ফেলুন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাতার স্তূপ সরিয়ে দিন, অথবা রাতে সাদা কাপড়ের ওপর মার্কারি আলো ছড়িয়ে দিন। দেখবেন সর্বত্র রয়েছে নানা ধরনের বিচিত্র ছোট ছোট প্রাণী। আপনার সংগ্রহ ভাঙার মথ, শুঁককীট, মাকড়সা, দীর্ঘনাসা ছারপোকা, জ্বলজ্বলে কাচপোকা, গুবরে পোকা, বোলতার আকৃতির নিরীহ প্রজাপতি, বোলতারই মতো পিঁপড়া, লাঠি বা পাতার মতো পোকায় ভরে উঠবে। লাঠির মতো পোকা দেখে আপনি হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে এটি একটি জীব। মনে হচ্ছিল যেন গাছের কাঁটা। কাছে যেতেই কাঁটাটি চলতে শুরু করল। সুন্দর পাতা মনে করে যেই না হাত বাড়ালেন অমনি ফুড়ুৎ! পাখা দুলিয়ে উড়ে গেল প্রজাপতি। জীবজগতের এই বৈচিত্র্য দেখে দেখে সারা দিন আপনার বিস্ময়ের ঘোর কাটবে না। আপনার সংগ্রহ করা এসব প্রাণীর মধ্যে নিশ্চিতভাবেই এমন কোনো একটি থাকতে পারে, যার বর্ণনা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে নেই। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচুর জানাশোনা আছে এমন বিশেষজ্ঞ পাওয়া এবং তার মাধ্যমে অজানা প্রাণীটিকে শনাক্ত করার কাজটি বেশ কঠিন হতে পারে।'
সম্ভবত ২০০২ সালের দিকে বাংলা একাডেমি থেকে অনূদিত একটি বইয়ের হদিস পেয়ে আমি সংগ্রহ করি। বিজ্ঞানের আরও কয়েকটি বইয়ের সাথে এই বইও জোগাড় করেছিলাম। ঢাকা থেকে বেশ দূরে এক ছায়া ছায়া নিচুদেশের উপজেলা সদরে সেটা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। বইটি অনুবাদ করেছিলেন মান্যজন তপন চক্রবর্তী। যদ্দুর মনে পড়ে, বইটি অনুবাদ করতে তাঁর কয়েক বছর লেগেছিল, এমন কিছু জানিয়েছিলেন ভূমিকায়। লেখকের নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। বইয়ের নাম 'পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভব'। নামের অনুবাদটা বোধ হয় পুরোপুরি মূলের প্রতিচ্ছবি হয়নি। মূল বইটি দেখেছি আরও বছর দুই-তিন পরে। তখন ঢাকা নিউমার্কেটে জিনাত বুক সাপ্লাই, মল্লিক ব্রাদার্স, বুক ভিউ, আলীগড় লাইব্রেরি এ জাতীয় বই রাখত। ঝকঝকে রঙিন গ্লসি কাগজে ছাপা বিশাল আকৃতির একেকটা বই। 'লাইফ অন আর্থ', 'লাইফ অন এয়ার', 'লাইফ অব বার্ডস'...
বইয়ের আকৃতি, অন্তর্ভুক্ত বিদ্যা, মূল্য—কোনো কিছুই সে বয়সে নাগালের মধ্যে ছিল না। বোধ করি এখনো নেই। ডেভিড অ্যাটেনবরোকে অধিকাংশ লোকই বই দিয়ে প্রথম চেনার কথা নয়। আমাকে যে বই দিয়ে চিনতে হয়েছে; কারণ, সান্ধ্যমোমের সেই পৃথিবীতে আমাদের টেলিভিশন থাকলেও তাতে কেবল কানেকশন বা ডিশ অ্যান্টেনা যোগাযোগ ছিল না। একটিই চ্যানেল—বিটিভি। ডেভিডকে দেখেছি আরও কিছু বছর পরে। টিভি পর্দায় কোনো না কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ, পাখি, পতঙ্গদের সাথে কথা বলে চলেছেন। গভীর সদাশয় আলাপে ডেভিড খুব হাসি হাসি মুখে থাকলেও তাঁর সামনে বসা শ্রোতা হতেন খুবই গম্ভীর। যেন 'হাসাহাসির কী আছে বাপু, তোমার কথা খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনছি'। সে শ্বদন্ত সিংহই হোক, কি আলাভোলা চেহারার মিরক্যাট।
ডেভিড অ্যাটেনবরো স্বয়ং পুরোপুরি টেলিভিশনের সমান বয়সী। খুব যদি খুঁতখুঁতে হই তো বলতে হয়, টেলিভিশন অ্যাটেনবরোর চেয়ে এক বছরের বড়। বেতার ও দৃশ্যমাধ্যমে তাঁর চেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার আর কারও আছে কি না, জানা নেই। তিনি এমন এক ম্যাটিনি শোয়ের নায়ক, যাতে তিনি একাই হিরো। তাঁর সহ-অভিনেতা পুরো পৃথিবী। এবং এ সিনেমায় কোনো খলনায়ক নেই। একমাত্র খলনায়ক পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা মানুষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ধীরে ধীরে ধ্বংস করছি নিজেকে এবং আমাদের চারপাশের সবকিছু, তখন বন্ধুরা মিলে নিবু নিবু মেগাবাইটের টানাটানি দিয়ে ডাউনলোড করে দেখেছি 'প্ল্যানেট আর্থ' সিরিজ। দেখেছি আর মনে হয়েছে, মানুষ হওয়ার একটা সৌভাগ্য যে আমারই প্রজাতির একটি নমুনার নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। আবার মানুষ হবার দুর্ভাগ্য এই যে আমি বা আমরা কোনো দিন অ্যাটেনবরো হতে পারব না।
আমার একটি আকাশকুসুম ভাবনার তালিকা আছে। সে তালিকায় একটা ভুক্তি এ রকম—দক্ষিণ আমেরিকার কোনো বনাঞ্চল, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো বেলাভূমি, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সাভানা, যেখানেই হোক না কেন, সূর্যের পড়ন্ত আলোয় আমি ডেভিডের সাথে হাঁটছি বা সারা দিন অভিযান শেষে আশ্রিত হয়েছি আদি কোনো বৃক্ষের সবুজ দেয়ালে। দীর্ঘদেহী ডেভিড তাঁর স্বভাবসুলভ কুঁজো ভঙ্গিতে খোনা খোনা গলায় কথা বলে চলেছেন। আমি প্রশ্ন করছি সামান্য দু-এক। হাতে বহন করে চলেছি ডেভিডের ফিল্ড নোটস, পেন্সিল, দু-একটা বইসহ ঝোলা। কিংবা তাঁর ক্যামেরা। হয়তো হবে, কোনো একদিন।
প্রাণের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে প্রাণীটি পৃথিবীকে সবচেয়ে বেশি দেখেছে, সে প্রাণীটির নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। ডেভিড আসার আগে পৃথিবী নামক গ্রহের ভাষা আমাদের জানা ছিল না। পৃথিবী নিজে যে বইটি লিখে চলেছে প্রতিদিন, ডেভিড তাঁর শ্রেষ্ঠ অনুবাদক। পৃথিবী এখন যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষার নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। তিনি পৃথিবীর সেক্রেটারিয়েট টেবিলে বসে থাকা একান্ত সচিব, পৃথিবী নামক ব্র্যান্ডের একমাত্র অ্যাম্বাসেডর। ওল্ড টেস্টামেন্টের রাজা ডেভিড, নবী দাউদের মতোই তাঁর কণ্ঠ শুনে নমিত হয়ে আসে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণ। 'একবার পাখির ভাষাটা যদি/শেখাতেন সোলেমান পয়গম্বর' আল মাহমুদের কবিতার সেই করুণ আর্তিই যেন মূর্ত হয়ে ওঠে ডেভিডের চরাচরসঞ্চারী বর্ণনায়। কিং সলোমন, সোলায়মান নবী নাকি জগতের দৃশ্য অদৃশ্য সকল প্রাণীর ভাষা জানতেন। অদৃশ্য না হোক, দৃশ্যমান সকল প্রাণীর ভাষাই সম্ভবত ডেভিড জানেন। অথবা ডেভিডের ভাষাই প্রাণিজগতের লিংগুয়া ফ্রাংকা। একটি তিমি একটি পেংগুইনের সাথে যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষার নাম ডেভিড। প্রাণীজগতের যে পৃথিবীব্যাপী অদৃশ্য ডাক বিভাগ, ডেভিড তার পোস্টমাস্টার জেনারেল। উত্তর মেরুর একটি সিন্ধুঘোটক, কিংবা একটা বল্গাহরিণ দক্ষিণ মেরুর একটি সিল বা নীল তিমিকে চিঠি লিখে চলেছে প্রতিদিন। এ রকম লক্ষ লক্ষ চিঠি অ্যাটেনবরো ঠিকানা খুঁজে খুঁজে পৌঁছে দিচ্ছেন গত পঁচাত্তর বছর।
ডেভিডের এক শ পূর্ণ হয়ে গেল। এক শ পেরোনো অনেক বিখ্যাত লোককেই আমরা জানি। আবার এক শ হতে হতে থমকে দাঁড়িয়েছেন, এমন উদাহরণও কম নয়। বার্ট্রান্ড রাসেল, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায় কি দিলীপ কুমার..
শুনেছি নীরদ সি চৌধুরী ১০২ বছর বয়সেও পরিষ্কার মাথায় লেখাপড়া করেছেন। বিষ্ণুপুর ঘরানার মহান উত্তরাধিকারী সঙ্গীতাচার্য অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুকাল আগে এক শর দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন। যেদিন এক শতে পৌঁছলেন, সেদিনও স্টেজে উঠে দীর্ঘ আলাপসহ ঘণ্টার ওপরে গান করেছেন। অর্থাৎ এক শতে সচল থাকেন এমন উদাহরণ বিরল নয় পৃথিবীতে। কিন্তু এক শতেও ক্যামেরা কাঁধে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে ছুটে চলা মানুষের কথা কি দেখে বিশ্বাস হয়? সেকাল হলে বলতাম গুলতাপ্পি। ডেভিড ৯৫ পেরোবার বছর থেকেই কিছুটা ভয়ে ভয়ে থাকতাম। হবে তো? ভুলে গিয়েছিলাম ডেভিড জাতে ব্রিটিশ। টেস্ট খেলা ওদের মজ্জায়, নার্ভাস নাইনটিজের বালাই সেখানে কম। পৃথিবী তার সব থেকে প্রিয় সন্তানকে সবুজ ও শ্যাওলার হেলমেট ও প্যাড দিয়ে আগলে রেখেছে বছরের পর বছর। সেঞ্চুরি।
এই তো পুরোনো ব্রিটিশ কেতায় ঢোলা স্যুট ও বেঢপ টাই পরে রয়াল অ্যালবার্ট হলে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইংল্যান্ডের রাজার সম্মানিত 'স্যার'। রাজা চিঠি পাঠিয়েছেন নিজ হাতে... 'আমার সৌভাগ্য তোমার সাথে আমার পরিচয় আছে। সেই ১৯৫৮ সালে বোধ করি আমাদের প্রথম দেখা। কত দশক পেরিয়ে গেছে ডেভিড, রঙিন টেলিভিশন তখনো আসেনি...।' রাজার অনুরোধ ও আয়োজনেই রাজকীয় দরবারে বিশাল অর্কেস্ট্রায় স্বাগত হলেন আমাদের পৃথিবীর ভাষান্তর স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। শতবর্ষী বৃক্ষ, অথচ চোখে যেন সদ্য ঋজু হওয়া গুল্মের কৌতূহল। এই তো আমাদের টিনের চাল পেরিয়ে যে উঁকি দিতে চাইছে, পাড়া, মহল্লা, নদী, সমুদ্র পেরিয়ে সমস্ত পৃথিবী…
রাজা নিজে বোধ হয় হাজির ছিলেন না। হাজির থাকলেও লাভ হতো না। যে সভায় অ্যাটেনবরো হাজির থাকেন, সে সভায় রাজা একজনই। রাজাদের নিয়ে ডেভিডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, টেলিফোন তুলে পৃথিবীর কর্তাদের সাথে যদি কথা বলেন, আপনি কী বলবেন? ডেভিড বললেন, আমরা আত্মমগ্ন হয়ে আছি। এবার আমাদের কাজ সবাইকে মিলিয়ে আমাদের প্রসারিত করা। নইলে এই স্বার্থপরতাই আমাদের ডোবাবে। ডোবাবেই...
আমার এক সমুদ্রসতেজ বন্ধু প্রায়ই বলেন, শোন, এই যে ডেভিড এতটা কর্মময়, এতটা পৃথিবী তাঁর ভেতর, কেবল জীবিত থাকার বদলে তিনি যে বাঁচেন, সেটাই তাঁকে আরও বাঁচিয়ে রাখে। যাদের এমন উদাত্ত জীবন ও কর্মপ্রেরণা থাকে, তাদের মনোদৈহিক গড়নই অন্য রকম।
কথাটা অসত্য নয়। বিজ্ঞানও এটা স্বীকার করবে।
শুভ জন্মদিন, স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। সবচেয়ে বয়সী হয়েও আপনার পাশে যে কাউকে বুড়ো দেখায়। ডেভিডকে কেউ একজন শুভেচ্ছায় লিখেছে, ডেভিডকে প্রথম শতকের শুভেচ্ছা। তা হোক। আরও কয়েক শতক কী সহস্র হোক। আপনার সমাধিলিপি যেন আমাদের লিখতে না হয়, এই সৌভাগ্য আমাদের থাকুক।
