লন্ডনের কুয়াশা থেকে বিশ্ববাসীর পায়ের জাদু: ফুটবল যেভাবে ছড়াল বিশ্বজুড়ে
১৮৬৩ সালে লন্ডনে জন্মের পর থেকেই ফুটবল ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে এই খেলা বনে গেছে সংস্কৃতির এক পরম অহংকার।
ফুটবল কী করে আজকের রূপ পেল—খেলার সে বিবর্তন কাহিনি বলার আগে একটা কথা বলে নেই। আমাদের ছোটবেলায়, শৈশব বা কিশোরকালে, ১৯৬০ বা ১৯৭০-এর দশকে ফুটবলের একটা বাংলা প্রতিশব্দ শুনেছি বা পড়েছি। শব্দটি হলো 'পদ গোলক'। ইংরেজি শব্দ ফুটবলকে বাংলা করার গুরুগম্ভীর প্রচেষ্টা ছিল? নাকি মশকরা? জোর দিয়ে বলতে পারব না! এদিকে গম্ভীর ভাব নিয়ে ঠাট্টা করে, পাড়াতুতো মুরব্বিদের বলতে শুনেছি, বল খেলতে গিয়ে পাস না পেয়ে হতাশ কবি নাকি গেয়ে উঠেছিলেন—বল দাও ওহে বল দাও!
সেই 'পদ গোলক' বা ফুটবলই এসব গালগল্প জমে ওঠারও অনেক আগেই মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের কাছে হয়েছে উঠেছে সংস্কৃতির এক পরম অহংকার। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে জন্মের পর থেকে এই খেলা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে; চলুন, তবে সেই গল্পেই ফেরা যাক।
লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেন এলাকায় একজন জাদুকর পর্যটকদের নানা রকম কসরত দেখিয়ে বিনোদন দিচ্ছেন। পাশ দিয়েই ঘরে ফেরা মানুষ আর থিয়েটারমুখী দর্শকদের ব্যস্ত স্রোত ওয়েস্ট এন্ডের দিকে বয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই হয়তো দাঁড়িয়ে ভাবেন, তারা আসলে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বড় একটা উত্তেজনাকর খেলার জন্মস্থানের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। রিচার্ড পারের লেখা এই গল্পে উঠে এসেছে সেই সোনালি ইতিহাস।
বড়সড়, জমকালো কোনো সম্মেলন না চললে গ্রেট কুইন স্ট্রিটে অবস্থিত গ্র্যান্ড কনট রুমস নামের ভবনটির দিকে সাধারণত কেউ তেমন একটা নজরই দেন না।
কিন্তু ১৮৬৩ সালের কথা আলাদা। তখন এই জায়গার নাম ছিল ফ্রিম্যাসনস ট্যাভার্ন। এখানেই বসেছিল সেই ঐতিহাসিক বৈঠক। এই বৈঠক থেকেই ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য প্রথম একক নিয়মকানুনের জন্ম হয়।
সেসব সিদ্ধান্ত বা নিয়মকানুন অবশ্য ফুটবল খেলাকে মোটেও আবিষ্কার করেনি, বরং একে একটা সুনির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলেছিল। নিয়মগুলো একক এবং মানসম্মত হওয়ায় ফুটবল খেলাটা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। এভাবেই লন্ডনের সীমানা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তে পাড়ি জমায়। রূপকথার ভাষায় বলতে পারি, সাত সমুদ্দর আর তেরো নদী পার হয়ে যায়।
আজকের দিনে পৃথিবীর এমন কোনো মহাদেশ নেই, যেখানে ফুটবল খেলা হয় না। ফুটবল দেখার জন্য লোকের চোখ টিভিতে আঠার মতো লেগে থাকে। আরববিশ্বে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের আসর ২০২২ সালে বসেছিল কাতারে। দুনিয়াজুড়ে প্রায় পাঁচ শ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছিল এই আসর, আর শুধু ফাইনাল ম্যাচটিই দেখেছিল এক শ পঞ্চাশ কোটি মানুষ। এই সংখ্যাগুলোই সাক্ষ্য দেয়, ভিক্টোরীয় আমলের ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে এই খেলা কত পাহাড়-জঙ্গল-সাগর-মরু পার হয়ে কত দূরদূরান্তে চলে এসেছে!
ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক এবং লেখক কেইর র্যাডনেজ ১৯৬৬ সাল থেকেই বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বকাপের সঙ্গে তার স্মৃতি সেই সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগ থেকে শুরু। তখন এটা ছিল স্রেফ একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট। আর এখন এটা হয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক সুবিশাল উন্মাদনা।
পুরোনো শিকড় আর হরেক রকম খেলা
ফিফা মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৩ সালের অনেক আগে থেকেই এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নিজেদের মতো করে বল খেলার প্রচলন ছিল। জুরিখের ফিফা মিউজিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কো ফাজোনে বলেন, ফুটবল কিন্তু ১৮৬৩ সালে হুট করে আকাশ থেকে পড়েনি। ইংল্যান্ডে যা ঘটেছিল, তা খেলার আবিষ্কার নয়, বরং খেলার একটা নির্দিষ্ট সংস্করণের নিয়মকানুন লিখিত রূপ, বিধিবিধানের অবকাঠামো পাওয়া। তিনি বুঝিয়ে বলেন, জাপানের কেমারি কিংবা চীনের কুজু খেলাগুলো আজকের আধুনিক ফুটবলের সরাসরি পূর্বপুরুষ নয়, তবে এগুলো আসলে মানুষের খেলার সহজাত প্রবৃত্তিরই সমান্তরাল বহিঃপ্রকাশ।
জাপানে কেমারি খেলা চলত এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। আর প্রাচীন চীনে কুজু খেলার ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো, যেখানে পায়ে লাথি মেরে বল খেলার চল ছিল। আজকের দিনের মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকায় গড়ে ওঠা মেসো-আমেরিকান সভ্যতায় বল খেলার পেছনে একধরনের ধর্মীয় এবং প্রতীকী অর্থ থাকত। সেখানে খেলোয়াড়েরা তাদের নিতম্ব বা কোমর ব্যবহার করে বলকে এগিয়ে নিয়ে যেত। প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের লিখিত ইতিহাসেও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে বল খেলার বর্ণনা পাওয়া যায়। ভিক্টোরীয় আমলের সমাজ সংস্কারকেরা পরবর্তী সময়ে গ্রিসের এপিস্কাইরোসের মতো খেলাগুলোকে ফুটবলের দূরবর্তী আত্মীয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ড আসলে মানুষকে খেলার নতুন কোনো তাগিদ দেয়নি, দিয়েছিল একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামো। শিল্পায়ন এবং শহরের দ্রুত প্রসারের ফলে বদলে যাওয়া এক সমাজে এই কাঠামোর জন্ম হয়েছিল। তখন পাবলিক স্কুলগুলো খেলাধুলার নিয়ম তৈরি করছিল আর রেললাইনের জাল ছড়িয়ে পড়ার কারণে এক শহরের সঙ্গে অন্য শহরের যোগাযোগ সহজ থেকে সহজতর হয়ে উঠছিল।
আধুনিক ফুটবলের আনুষ্ঠানিক রূপ
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্লাবগুলো নিজেদের মতো আলাদা আলাদা নিয়মে খেলত। ১৮৬৩ সালে ইবেনিজার মর্লে নামের একজন আইনজীবী প্রস্তাব করেন, সব নিয়মকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য একটা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা দরকার।
ওই বছরের ২৬ অক্টোবর লন্ডনের আশপাশের ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিরা ফ্রিম্যাসনস ট্যাভার্নে এসে মিলিত হন এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএ গঠন করেন। পরবর্তী সভাগুলোতে খেলার নিয়মকানুন বা লস অব দ্য গেম চূড়ান্ত করা হয় এবং রাগবি খেলা থেকে ফুটবল আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হয়ে যায়।
১৮৭১ সালের মধ্যে প্রথম জাতীয় প্রতিযোগিতা হিসেবে চালু হয় এফএ কাপ। আর ১৮৮৮ সালে ১২টি ক্লাব মিলে গঠন করে ফুটবল লিগ। এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম পেশাদার লিগ। নিয়মকানুন এক হওয়ার কারণে সুবিধা হলো। বিভিন্ন শহরের এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের ক্লাবগুলো কোনো রকম বিভ্রান্তি ছাড়াই একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নামার সুযোগ পেল। রেলপথের বিস্তার আর ক্রমবর্ধমান শহরের ভিড়ে ফুটবল খেলাটা শিল্পাঞ্চলের মানুষের সাপ্তাহিক জীবনের ছন্দের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশে গেল। উনিশ শতকের শেষের দিকে শনিবার অর্ধেক দিন কাজের নিয়ম চালু হওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ একটু অবসরের সুযোগ পেল। আর এই অবসরই ব্রিটেনের শিল্পনগরীগুলোতে ফুটবলকে আমজনতার জনপ্রিয় খেলায় রূপ দিল।
উপনিবেশ আর বাণিজ্যের হাত ধরে বিশ্বজয়
নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে ফুটবলকে কিন্তু শুধু ইংল্যান্ডের ভেতরে আটকে রাখা যায়নি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসারে যে যোগাযোগব্যবস্থা ভূমিকা রেখেছিল, সেই একই পথ ধরে ফুটবলের নিয়মগুলোও পাড়ি জমাল সাগরের ওপাড়ে। ব্রিটিশ বন্দর, কারখানা আর স্কুলগুলো থেকে ফুটবল ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে। প্রকৌশলী আর ব্যবসায়ীদের হাত ধরে খেলাটি পৌঁছে গেল আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস এবং উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে। বাণিজ্য, অভিবাসন আর শিক্ষার হাত ধরে এটি ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। দিয়েগো ফাজোনে জানান, উনিশ শতকের শেষের দিকেই আর্জেন্টিনার মতো জায়গায় ক্লাব গড়ে উঠতে শুরু করেছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার দ্রুত বাড়তে থাকা শহরগুলোতে ফুটবল খুব দ্রুত নিজের জায়গা করে নেয়। নিউইয়র্কের হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও লাতিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ব্রেন্ডা এলসি বলেন, পানামা খাল হওয়ার আগে দক্ষিণ আমেরিকার বন্দরনগরীগুলোতে তুমুল নগরায়ণ চলছিল। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের কথা বলা যায়, যেখানে খেলাটি খুব দ্রুতই অভিজাত ক্লাবগুলোর গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। ঘাটের কুলি আর অভিবাসী শ্রমিকেরা ফুটবলকে নিয়ে যান সাধারণ মানুষের পাড়ায় পাড়ায়। অন্যদিকে কারখানার মালিক, শিক্ষক আর শুরুর আমলের সংবাদপত্রগুলো একে একটি আধুনিক ও শৃঙ্খলাপরায়ণ খেলা হিসেবে তুলে ধরে। এলসি আরও বলেন, শ্রমিক ইউনিয়ন আর সাধারণ মানুষের পাড়া-মহল্লাই শেষ পর্যন্ত এমন কিছু রীতিনীতি তৈরি করেছিল, যা ফুটবলকে আসল অর্থ দেয়। ফলে অভিজাতদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে খেলাটি আমজনতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
নতুন পরিচয় আর জাতীয়তাবাদের প্রতীক
আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশে খেলাটি স্কুল এবং শহরের সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। ব্রিটিশদের হাত ধরে শুরু হওয়া একটা খেলাকে অন্য দেশের মানুষ নিজের মতো করে আপন করে নিল, বদলে নিল নিজেদের ছাঁচে। র্যাডনেজ লক্ষ করেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো ফুটবলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে এই খেলাটি হয়ে উঠেছিল নতুন পরিচয় এবং জাতীয় গৌরবের এক বলিষ্ঠ ঘোষণা।
একই রকম চিত্র দেখা গেছে আরব বিশ্বেও। সেখানকার ফুটবল ক্লাব আর জাতীয় দলগুলো প্রায়ই সামাজিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের প্রতীক হয়ে ওঠে। কাতার ইউনিভার্সিটির আরব বিশ্বের খেলাধুলা, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহফুদ আমারা বলেন, তিনটি প্রধান কাঠামোগত কারণে ফুটবল অনেক অঞ্চলে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সাথে গভীরভাবে মিশে গেছে। সেগুলো হলো সহজে খেলতে পারা, প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রতীকীবাদ। বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলো যখন ফিফায় যোগ দিতে শুরু করল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে লাগল, তখন এই খেলাটি রাষ্ট্র গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়ার একটা শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হলো।
তাই তো দেখা যায়, উনিশ শতকের লন্ডনের সেই ধূসর কুয়াশাঘেরা সরাইখানা থেকে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ মরুভূমির তপ্ত বালু কিংবা বাংলার সবুজ ঘাস—সবখানেই সমান জনপ্রিয়। হোক তা 'পদ গোলক' কিংবা আধুনিক ফুটবল, চামড়ার ওই গোল বলটার পেছনে মানুষের যে আবেগ আর ছুড়ে দেওয়া পায়ের জাদু, তার কোনো কাঁটাতার নেই, নেই কোনো সীমানা। দিন শেষে এই খেলাই মানুষকে মেলাবে, জোগাবে বুক ভরা আনন্দ আর সংস্কৃতির পরম অহংকার।
