ম্যাজিক বুট, টোটাল ফুটবল, স্বৈরশাসকের উৎসব এবং ‘ইশ্বরের হাত’
সুইজারল্যান্ড ১৯৫৪: বের্নের অলৌকিক রাত আর অ্যাডিডাসের স্ক্রু-বুট
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ যখন সুইজারল্যান্ডের মাটিতে পা রাখল, তখন দুনিয়ার সব বাজি ছিল হাঙ্গেরির পক্ষে। পুসকাস, কোকসিসদের সেই হাঙ্গেরি দলকে বলা হতো 'মাইটি ম্যাজিয়ার্স'। টানা চার বছর তারা কোনো ম্যাচ হারেনি, যার মধ্যে ইংল্যান্ডকে তাদেরই মাটিতে ৬-৩ গোলে ধোলাই দেওয়ার ইতিহাসও ছিল। গ্রুপপর্বে এই হাঙ্গেরিই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল ফাইনালটা স্রেফ একটা আনুষ্ঠানিকতা।
বৃষ্টির খেলা আর জুতা চুরির ফন্দি: ৪ জুলাই ১৯৫৪, বের্নের ফাইনালের দিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। মাঠ মুহূর্তের মধ্যে কাদার সাগরে রূপ নিল। হাঙ্গেরি প্রথমার্ধের আট মিনিটের মধ্যেই পুসকাস আর জিবোরের গোলে ২-০ গোলে এগিয়ে গেল। জার্মানদের অবস্থা তখন কেরোসিন। কিন্তু জার্মান ড্রেসিংরুমে ছিলেন এক জাদুকর—আদি ড্যাসলার, যিনি আজকের বিখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড 'অ্যাডিডাস'-এর প্রতিষ্ঠাতা। ড্যাসলার জার্মান দলের জন্য এক বিশেষ বুট বানিয়ে এনেছিলেন। এই বুটের নিচের স্পাইক বা স্টাডগুলো স্ক্রু দিয়ে খোলাও যেত, লাগানোও যেত।
মাঠ কাদা হয়ে যাওয়ায় ড্যাসলার চটজলদি খেলোয়াড়দের বুটে লম্বা স্টাড লাগিয়ে দিলেন। এতে কাদার মধ্যেও জার্মানরা পিছলে না গিয়ে গ্রিপ পেয়ে গেল, অন্যদিকে হাঙ্গেরির খেলোয়াড়েরা ভারী চামড়ার বুট নিয়ে মাঠে আছাড় খেতে লাগল। স্রেফ বুটের এই প্রযুক্তির জোরে জার্মানি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নিল। ফুটবল ইতিহাসে একে বলা হয় 'মিরাকল অব বের্ন'।
ওই একটা ফাইনালের হার হাঙ্গেরির সেই সোনালি প্রজন্মের পিঠে এমন এক অদৃশ্য ক্ষত এঁকে দিয়েছিল, যা তারা আর কোনো দিন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যে দলটির পায়ে বিশ্বজয়ের সব রসদ ছিল, এক অলৌকিক পরাজয়ে তাদের সেই স্বপ্নের প্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। এই ধাক্কা সামলানোর আগেই দেশের ভেতর রাজনৈতিক ঝড় ও সোভিয়েত আগ্রাসন; সব শেষে ফুটবলারদের নির্বাসন হাঙ্গেরির ফুটবলের সেই রূপকথাকে চিরকালের জন্য এক রুপালি দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করল।
সতেরো বছরের রাজা আর নীল জার্সির রহস্য
১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের ফুটবল এক নতুন ঈশ্বরের জন্ম দেখল। মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক রোগা-পটকা ছেলে, যার নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো—দুনিয়া যাকে চেনে 'পেলে' নামে। প্রথম দুই ম্যাচে পেলে বেঞ্চে বসা ছিলেন। ব্রাজিলের মনোবিদ বলেছিলেন, পেলের নাকি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মতো মানসিক পরিপক্বতা আসেনি। কিন্তু কোচ ভিসেন্তে ফিওলা সেই পরামর্শ কানে তুললেন না। বলা যায়, প্রায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পেলে আর কাফন চোরখ্যাত জাদুকর গারিঞ্চাকে মাঠে নামিয়ে দিলেন তিনি।
কাফন চোর কী করে কাফন চোর হলো, সে গল্প হয়তো অনেকেই জানেন, আর কেউ কেউ না-ও জানতে পারেন। দুই পা দুই দিকে বাঁকানো, এক পা অন্যটির চেয়ে দুই ইঞ্চি ছোট—এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই ব্রাজিলের গারিঞ্চা হয়ে উঠেছিলেন মাঠের জাদুকর। ফুটবল দুনিয়ায় তাঁর অদ্ভুত এক নাম ছিল—'কাফন চোর। তবে এটি কোনো গালি ছিল না, এটি ছিল তাঁর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিংয়ের এক সর্বোচ্চ প্রশংসা।
উইং দিয়ে গারিঞ্চা যখন বল নিয়ে ছুটতেন, তাঁর মায়াবী পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা মাঠের মধ্যেই বোকা বনে স্থবির হয়ে যেতেন, ফুটবলীয় রূপকে যা ছিল ডিফেন্ডারদের 'লাশ' বানিয়ে দেওয়া। ফুটবল বোদ্ধারা বলতেন, গারিঞ্চা এত নিখুঁত ও চতুর, তিনি চাইলে কবরের ভেতর থেকে লাশের কাফন চুরি করে আনতে পারবেন, অথচ মৃতদেহ টেরও পাবে না!
১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে যখন পেলে ইনজুরিতে পড়ে ছিটকে যান, তখন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নও এক লহমায় 'লাশ' হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই কাফন চোরখ্যাত জাদুকরই সেবার একক নৈপুণ্যে সেই মৃতপ্রায় টুর্নামেন্ট থেকে বিশ্বকাপ ট্রফিটি ছিনিয়ে এনেছিলেন।
কাপড়ের দোকান থেকে কেনা নীল জাসির্: ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক সুইডেন। দুই দলেরই প্রধান জার্সি ছিল হলুদ। নিয়ম অনুযায়ী টসে যারা হারবে, তাদের জার্সি বদলাতে হবে। ব্রাজিল টসে হেরে গেল। কিন্তু ব্রাজিলের কাছে কোনো বিকল্প জার্সি ছিল না। তারা তো আর সাদা জার্সি পরবে না; কারণ, ১৯৫০ সালের মারাকানার সেই অভিশপ্ত সাদা জার্সির ভূত তখনো তাদের ঘাড়ে চেপে বসা।
ব্রাজিলের কর্মকর্তারা তখন স্টকহোমের স্থানীয় এক কাপড়ের দোকানে গিয়ে তড়িঘড়ি করে এক ডজন নীল রঙের সাধারণ গেঞ্জি কিনে আনলেন। সারা রাত ধরে সেই গেঞ্জিগুলোতে ব্রাজিলের লোগো আর নম্বর সেলাই করা হলো। ১৯ বছর বয়সী সেই ছেলেটা ওই নীল জার্সি পরেই সুইডেনকে ৫-২ গোলে উড়িয়ে দিল। পেলে ফাইনালে দুই গোল করে মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ এল এক সস্তা নীল জার্সির হাত ধরে।
চিলি ১৯৬২: সান্তিয়াগোর কুস্তি আর এক পায়ের জাদুকর
১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ ফুটবলের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছিল কুস্তির মাঠ হিসেবে। বিশেষ করে চিলি আর ইতালির মধ্যকার গ্রুপপর্বের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে হিংস্র ম্যাচ, যা 'ব্যাটল অব সান্তিয়াগো' নামে কুখ্যাত।
ইতালির দুই সাংবাদিক চিলির নারী এবং সমাজ নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর নিবন্ধ লিখেছিলেন। চিলির মানুষ রেগে আগুন। ম্যাচ শুরু হওয়ার ১২ সেকেন্ডের মাথায় প্রথম ফাউল হলো। পুরো ম্যাচে রেফারি কেন অ্যাস্টন কার্যত অসহায় ছিলেন। ইতালির জর্জিও ফেরিনিকে মাঠ থেকে বের করতে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। চিলির লিওনেল সানচেজ ইতালির ডিফেন্ডার মারিও ডেভিকে বক্সিংয়ের মতো পাঞ্চ মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন, অথচ রেফারি তা দেখতেই পাননি। পুলিশকে চার চারবার মাঠে ঢুকে খেলোয়াড়দের গ্রেপ্তার করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এই টুর্নামেন্টে পেলে দ্বিতীয় ম্যাচেই মারাত্মক চোট পেয়ে ছিটকে যান। তখন পুরো ব্রাজিলের ভার কাঁধে তুলে নেন 'মানোলো' বা গারিঞ্চা। গারিঞ্চার জন্মগতভাবেই একটা পা অন্যটার চেয়ে বাঁকা আর ছোট ছিল। কিন্তু সেই বাঁকা পায়েই তিনি এমন ড্রিবলিং করতেন যে বিপক্ষ ডিফেন্ডাররা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেত। সেমিফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে গারিঞ্চা লাল কার্ড পেয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ফাইনাল খেলার কথা নয়। কিন্তু ব্রাজিলের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ফিফাকে চিঠি লিখে চাপ সৃষ্টি করেন, যার ফলে ফিফা গারিঞ্চার লাল কার্ড মওকুফ করতে বাধ্য হয়। ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বার কাপ জেতে।
ইংল্যান্ড ১৯৬৬: কুকুর পিকলসের নাক
ফুটবল অবশেষে তার নিজের বাড়ি অর্থাৎ ইংল্যান্ডে ফিরল ১৯৬৬ সালে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ঘটল এক কেলেঙ্কারি। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে প্রদর্শনীতে রাখা জুলে রিমে ট্রফি চুরি হয়ে গেল। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা মাঠে নেমেও ট্রফির কোনো হদিস পাচ্ছিলেন না। পুরো ইংল্যান্ডের নাক কাটার দশা।
ট্রফি চুরির সাত দিন পর ডেভিড করবেট নামের এক ভদ্রলোক তাঁর 'পিকলস' নামের একটি কুকুরকে নিয়ে দক্ষিণ লন্ডনের এক বাগানে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। পিকলস হঠাৎ একটা ঝোপের নিচে গিয়ে জোরে জোরে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। করবেট কাছে গিয়ে দেখলেন, খবরের কাগজে মোড়ানো ভারী একটা জিনিস। কাগজ খুলতেই চকচক করে উঠল সোনার জুলে রিমে ট্রফি! পিকলস রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত হলো, তাকে আজীবনের জন্য ফ্রি ডগ ফুড পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
উত্তর কোরিয়ার ধামাকা আর ফাইনালের বিতর্ক
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চমক ছিল উত্তর কোরিয়া। তারা শক্তিশালী ইতালিকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে পুরো দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ইতালির দল যখন দেশে ফেরে, সমর্থকেরা বিমানবন্দরে তাদের পচা টমেটো আর ডিম ছুড়ে মারে।
ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হলো ইংল্যান্ড আর পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচ যখন ২-২ সমতায়, তখন অতিরিক্ত সময়ে ইংল্যান্ডের জিওফ হরস্টের একটা শট জার্মানির গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে নিচের লাইনে ড্রপ খেয়ে মাঠের ভেতর চলে আসে। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা গোলের দাবি তুললেন, জার্মানরা বললেন, বল লাইনের বাইরে পড়েনি। রেফারি সুইস হলেও তিনি লাইন্সম্যান সোভিয়েত ইউনিয়নের তোফিক বাখরামভের কাছে ছোটেন। বাখরামভ মাথা নেড়ে গোলের ইশারা করলেন। এই বিতর্কিত গোলের ওপর ভর করে ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপটি ঘরে তোলে। আজও কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে বলটি সেদিন আদৌও লাইন পার হয়েছিল কি না!
রঙিন পেলে আর শতাব্দীর সেরা ম্যাচ
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবলকে এক নতুন রূপ দিল। এই প্রথমবার টেলিভিশনে রঙিন সম্প্রচার শুরু হলো। আর মেক্সিকোর চড়া রোদ আর রঙিন পর্দায় ব্রাজিলের হলুদ জার্সি যেন স্বর্গীয় রূপ নিল। পেলে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিলেন এক অপরাজেয় দল নিয়ে, যেখানে রিভেলিনো, তোস্তাও, জারজিনহোরা ছিলেন।
এই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানি আর ইতালির ম্যাচটিকে বলা হয় 'গেম অব দ্য সেঞ্চুরি'। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গোল হলো আরও ৫টি! ম্যাচের বয়স যখন ৭০ মিনিট, তখন জার্মানির অধিনায়ক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের ডান কাঁধের হাড় বা কলারবোন ভেঙে যায়। জার্মানির সব সাবস্টিটিউট ততক্ষণে শেষ।
বেকেনবাওয়ার মাঠ ছাড়তে রাজি হলেন না। তিনি ডাক্তারকে বললেন, তাঁর ডান হাতটা বুকের সাথে ব্যান্ডেজ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে। ভাঙা কাঁধ আর ঝুলন্ত হাত নিয়ে বেকেনবাওয়ার পুরো অতিরিক্ত সময় খেললেন। ম্যাচটি ইতালি ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু বেকেনবাওয়ারের এই ত্যাগ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বীরত্বগাথা। ফাইনালে ব্রাজিল ইতালিকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে চিরদিনের জন্য জুলে রিমে ট্রফিটি নিজেদের দেশে নিয়ে যায়; কারণ, নিয়ম ছিল তিনবার যারা জিতবে, ট্রফি তাদের স্থায়ী সম্পত্তি হবে।
ক্রুইফ বনাম বেকেনবাওয়ার এবং টোটাল ফুটবল
১৯৭৪ সালে জুলে রিমে ট্রফি বিদায় নেওয়ার পর বাজারে এল বর্তমানের নতুন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি। এই বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ ছিল হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস দলের এক নতুন রণকৌশল, যার নাম 'টোটাল ফুটবল'। এর মূল হোতা ছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ। টোটাল ফুটবলের নিয়ম ছিল সরল কিন্তু ভয়ংকর—মাঠে গোলকিপার ছাড়া বাকি দশজন খেলোয়াড়ের কোনো নির্দিষ্ট পজিশন থাকবে না।
গ্রুপপর্বের এক ম্যাচে সুইডেনের বিরুদ্ধে ক্রুইফ এক অভিনব ড্রিবলিং দেখালেন, যেখানে তিনি বল এক পায়ের পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে শরীরটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বেরিয়ে গেলেন। দুনিয়া এই ড্রিবলিংয়ের নাম দিল 'ক্রুইফ টার্ন'। হল্যান্ড একের পর এক দলকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে উঠল স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে।
ম্যাচের প্রথম মিনিটেই কোনো জার্মান খেলোয়াড় বল ছোঁয়ার আগেই হল্যান্ড পেনাল্টি পেয়ে যায় এবং ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু জার্মানির 'কাইজার' ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার আর গোলমেশিন গার্ড মুলার দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। বেকেনবাওয়ারের নিখুঁত ডিফেন্স আর গার্ড মুলারের জয়সূচক গোলের ওপর ভর করে জার্মানি ২-১ ব্যবধানে জিতে ক্রুইফের সুন্দর ফুটবলকে কাঁদিয়ে ট্রফি নিজেদের করে নেয়। সুন্দর ফুটবল সব সময় জেতে না, বাস্তবমুখী ফুটবলই শেষ হাসি হাসে—জার্মানি সেটাই প্রমাণ করেছিল।
কনফেত্তির বৃষ্টি আর স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ যখন আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন দেশটিতে চলছে জেনারেল হোর্হে বিডেলার সামরিক জান্তার স্বৈরাচারী শাসন। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে গুম করা হচ্ছিল, রক্তধারার স্রোত যেন বইছিল দেশটির অন্দরে। বিডেলা চাইলেন ফুটবলের আড়ালে নিজের পাপ লুকাতে। ঠিক ১৯৩৪ সালের মুসোলিনির মতো তিনিও নির্দেশ দিলেন—আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন হতেই হবে।
ফাইনাল রাউন্ডে ওঠার জন্য আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচে পেরুর বিরুদ্ধে অন্তত ৪-০ ব্যবধানে জিততে হতো, না হলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ফাইনালে চলে যেত। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জিতল ৬-০ ব্যবধানে। পেরুর গোলকিপার রামন কুইরোগার জন্ম ছিল আর্জেন্টিনায়। অভিযোগ, আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার পেরুকে হাজার হাজার টন গম এবং পেরুর বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ম্যাচটি কিনে নিয়েছিল। পেরুর ডিফেন্ডারদের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা ইচ্ছে করে আর্জেন্টিনাকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে।
ফাইনালে বুয়েনস এইরেসের রিলিশ স্টেডিয়ামে হল্যান্ডের মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা। ডাচরা মাঠে নামার পর গ্যালারি থেকে লাখ লাখ সাদা কাগজের টুকরো বা 'কনফেত্তি' বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হলো। মাঠের ঘাস সাদা কাগজে ঢেকে গেল। ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা ইচ্ছাকৃতভাবে হল্যান্ডের উইঙ্গার রেনে ভ্যান ডি কারখফের হাতের প্লাস্টার নিয়ে রেফারির কাছে অভিযোগ করলেন। খেলা শুরু হতে ১৫ মিনিট দেরি হলো, ডাচরা মানসিকভাবে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়লেন।
নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ১-১ সমতায় থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার লম্বা চুলের স্ট্রাইকার মারিও কেম্পেস একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলেন। আর্জেন্টিনা ৩-১ ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো। স্বৈরশাসক বিডেলা ট্রফি তুলে দিলেন অধিনায়ক পাসারেল্লার হাতে। কিন্তু আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ এই জয়কে সামরিক শাসনের হাত থেকে সাময়িক মুক্তি হিসেবেই দেখেছিলেন।
জেলের কয়েদি থেকে গোল্ডেন বুট
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ ছিল আধুনিক ফুটবলের এক নতুন মোড়। এই আসরেই প্রথমবার পেনাল্টি শুট-আউটের নিয়ম চালু করা হয়েছিল। তবে এই টুর্নামেন্টের আসল হিরো ছিলেন ইতালির পাওলো রসি। ১৯৮০ সালে ইতালির ঘরোয়া ফুটবলে এক বিশাল বেটিং বা জুয়া কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছিল। সেই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে রসি দুই বছরের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হন এবং তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে রসির শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়। ইতালির কোচ এনজো বিয়ারজোট সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই জেলের কয়েদিকে দলে নিলেন। প্রথম চার ম্যাচে রসি একটাও গোল করতে পারেননি। ইতালির মিডিয়া কোচের চামড়া তুলে নিচ্ছিল। কিন্তু আসল ম্যাজিক অপেক্ষা করছিল কোয়ার্টার ফাইনাল গ্রুপে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে। তখনকার ব্রাজিল দলটিকে (জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও) বলা হতো ১৯৭০ সালের পর পৃথিবীর সবচেয়ে শৈল্পিক দল।
সেই ম্যাচে পাওলো রসি একাই হ্যাটট্রিক করে ব্রাজিলের সুন্দর ফুটবলকে খুন করলেন। ইতালি ম্যাচটি জিতল ৩-২ ব্যবধানে। এরপর সেমিফাইনালে দুই গোল আর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে প্রথম গোলটি করে ইতালিকে ৩-১ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন করলেন রসি। যে লোকটা দুই মাস আগেও জেলের অন্ধকার ঘরে দিন কাটাচ্ছিলেন, তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে গোল্ডেন বুট আর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়ে মাঠ ছাড়লেন।
ঈশ্বরের হাত আর শতাব্দীর সেরা একক শোরুম
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ মূলত একজন মানুষের একক শোরুম বা প্রদর্শনী ছিল—তিনি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। কলম্বিয়া আর্থিক সংকটের কারণে টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে না পারায় মেক্সিকো দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পায়।
২২ জুন ১৯৮৬, কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড। চার বছর আগে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে আর্জেন্টিনার শত শত তরুণ সেনা ব্রিটিশদের হাতে মারা যান। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কাছে এই ম্যাচটা ফুটবলের চেয়ে বড় ছিল যুদ্ধের ময়দান।
ম্যাচের ৫১ মিনিটের মাথায় ম্যারাডোনা বল নিয়ে ইংল্যান্ডের বক্সের ভেতর ঢুকলেন। ইংল্যান্ডের গোলকিপার পিটার শিলটন ম্যারাডোনার চেয়ে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা ছিলেন। শিলটন যখন বল পাঞ্চ করতে লাফ দিলেন, ম্যারাডোনাও লাফ দিলেন এবং চালাকি করে নিজের বাঁ হাত দিয়ে বলটি শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে ঠেলে দিলেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা রেফারিকে ঘিরে ধরলেন হ্যান্ডবলের দাবিতে, কিন্তু তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের গোলটি বহাল রাখলেন। ম্যাচের পর ম্যারাডোনা সেই কুখ্যাত মন্তব্যটি করেছিলেন—'গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছে।' ফুটবল দুনিয়ায় এই কাণ্ড 'হ্যান্ড অব গড' হিসেবে পরিচিত।
এই গোলের ঠিক চার মিনিট পর ম্যারাডোনা যা করলেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃশ্য। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে ম্যারাডোনা দৌড় শুরু করলেন। একে একে ইংল্যান্ডের পিটার বিয়ার্ডসলে, পিটার রিড, টেরি বুচার, টেরি ফেনউইক আর শেষমেশ গোলকিপার পিটার শিলটনকে ড্রিবলিংয়ের এক মায়াজাল বিছিয়ে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ালেন। মাত্র ১০ সেকেন্ডে ৬০ গজ দৌড়ে ৫ জন ব্রিটিশ ডিফেন্ডারকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া এই গোলটিকে ফিফা পরবর্তী সময়ে 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' ঘোষণা করে। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ম্যারাডোনা একাই আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেন।