এআই: লেখালেখি যন্ত্রই করে দেবে তাহলে?
জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসে একনায়ক 'বিগ ব্রাদার' ঘোষণা দেন, আজ আমরা চিন্তা শুদ্ধকরণ নির্দেশিকার প্রথম বর্ষপূর্তি পালন করছি। মানুষের চিন্তা এখন শুদ্ধ করা হয়েছে। ইতিহাসে এই প্রথম গড়ে উঠেছে বিশুদ্ধ মতাদর্শের এক বাগান। সেখানে ভিন্নমত নামের কোনো আগাছা নেই। প্রত্যেকে নিরাপদে একইভাবে ভাবনা করবে, একইভাবে বলবে। আর এই ঐক্যবদ্ধ চিন্তাশক্তিই পৃথিবীর যেকোনো নৌবহর বা সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র।
ত্রিশ বছর পরে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী লেখক অড্রে লর্ড এক বাক্যে সেই ক্ষমতার রাজনীতিকে উল্টে দেন—প্রভুত্বের হাতিয়ার দিয়ে কখনো প্রভুর বাড়ি ভাঙা যায় না। (The master's tools will never dismantle the master's house.—এটাকে এর চেয়ে লাগসই বাংলা আর করতে পারলাম না।)
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এই দুই সতর্কবাণীই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই বানানো হাতিয়ার। তাই প্রশ্ন হলো, মানুষের তৈরি এই হাতিয়ার কি সত্যিই মানুষের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিতে পারে, নাকি শেষ পর্যন্ত সেই কাঠামোকেই আরও শক্তিশালী করে?
নোটস অন এআই: দ্য মাস্টার'স টুল নিবন্ধে ডি পি স্রাইডার বলেন, লেখালেখির জন্য তৈরি এআই সহকারীরা প্রায় সব সময়ই আমার লেখায় ভুল খুঁজে পায়। এরপর তিনি স্বীকার করেন, এআইয়ের পরামর্শের চার ভাগের এক ভাগ যদিও মেনে নিই, কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যেই আমার নিজের ভাষা, আমার নিজস্ব ভঙ্গি হারিয়ে যাবে। লেখাটি তখন ঠিকঠাক থাকবে, কিন্তু সেটি আর আমার লেখা থাকবে না।
এ ফাঁকে লেখকের পরিচয় একঝলকে দেখে নেই। ডি পি স্নাইডার একজন দ্বিভাষিক লেখক, কবি এবং ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদক। তাঁর সম্পূর্ণ বইয়ের অনুবাদের মধ্যে রয়েছে অ্যাঞ্জেলেইনা মুনিজ-হুবারম্যানের 'অ্যারিথমিয়াস' (২০২২) এবং আলবের্তো চিমালের 'স্কেয়ারি স্টোরি' (২০২৩)।
তার অনূদিত কাজগুলো কয়েকটি খ্যাতনামা সংকলনে জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: 'টকিং বুকস উইথ মারিও ভার্গাস ইয়োসা' (২০২০), 'ডটার্স অব ল্যাটিন আমেরিকা' (২০২৩), কনস্টেলেশন (২০২৪)।
তিনি 'রিডিং ইন ট্রান্সলেশন'-এর সম্পাদকীয় বোর্ডের একজন সদস্য এবং সম্প্রতি পেন আমেরিকা ট্রান্সলেশন কমিটির সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এআই নিজে ভালোও নয়, মন্দও নয়। শ্রেফ একটি প্রযুক্তি। নিছক যন্ত্র। কিন্তু যন্ত্র কখনো শূন্যে কাজ করে না। ক্ষমতা যার হাতে, যন্ত্রও শেষ পর্যন্ত তারই স্বার্থ রক্ষা করে। তারই অনুগমন করে। আর আজকের পৃথিবীতে এআইয়ের লাগাম যাদের হাতে, তারা মূলত কয়েকটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি করপোরেশন এবং তাদের অতি-ধনী মালিকেরা। তাদের কাছে এআই শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়; সম্পদ আহরণের নতুন কৌশল।
মানুষের লেখা, ছবি, গান, গবেষণা, শিল্পকর্ম—যা পাওয়া যায়, সবকিছু সংগ্রহ করে বিশাল ভাষা-আদল বা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অসংখ্য লেখক, শিল্পী ও গবেষকের মেধাস্বত্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জন্য কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি বা হচ্ছেও না। জনসম্পদ ও জনজ্ঞান ব্যক্তিগত মুনাফার কাঁচামালে পরিণত হচ্ছে। প্রযুক্তির ভাষায় একে উদ্ভাবন বলা হয়; কিন্তু অনেকের কাছেই এটি নিছক সংগঠিত দখলদারি। বাংলাদেশিরা হয়তো একে চর দখলের কসরত বলেই বেশি আরাম পাবেন।
এই নিবন্ধ লিখতে গিয়ে লেখক ভাষা-মডেল, যন্ত্র-অনুবাদ, বিগ টেক কোম্পানির বিপুল সম্পদ, তথাকথিত ট্রান্সহিউম্যানবাদ এবং পরিবেশের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বিস্তর তথ্য ঘেঁটেছেন। কিন্তু তথ্য যতই পেয়েছেন, তার অস্বস্তিও ততই গভীর হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝেছেন, তাঁর উদ্বেগ প্রযুক্তিগত নয়; অস্তিত্বগত।
কারণ, প্রশ্নটি শুধু অনুবাদকের চাকরি হারানোর নয়; প্রশ্নটি ভাষার। আর ভাষা মানে মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আমরা যদি ভাষা তৈরির দায়িত্ব ধীরে ধীরে যন্ত্রের হাতে তুলে দিই, তাহলে, মানুষকে মানুষ করে তোলে সেই ক্ষমতাই একসময় হারিয়ে ফেলব।
এই আশঙ্কা বোঝাতে লেখক একটি দুঃস্বপ্নের কথা বলেন। তিনি দেখেন, বহু বছর আগের নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটে ফিরে গেছেন। সেটিই ছিল তাঁর প্রথম সত্যিকারের নিজের ঘর। কিন্তু সেখানে এখন অচেনা লোকজনের ভিড়। তারা ঘর দখল করে বসে আছে। একে একে জিনিসপত্র হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে তারা শুধু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। তিনি চিৎকার করে বলতে চান, 'বেরিয়ে যাও।' কিন্তু মুখ খুললেও কোনো শব্দ বেরোয় না। অচেনা লোকগুলো তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করে।
ঘুম ভাঙার পর তিনি বুঝতে পারেন, সেই ঘর আসলে তাঁর নিজের মস্তিষ্ক। অনুপ্রবেশকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলো তাঁর বহু যত্নে গড়ে তোলা শব্দভান্ডার। স্নাইডারের সবচেয়ে বড় ভয়, একদিন এভাবেই হয়তো তিনি হয়ে পড়বেন ভাষাহীন।
অনেক সাহিত্য-অনুবাদকের মতো তাঁরও কখনো কখনো মনে হয়, তাদের কাজকে পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল কাজ হিসেবে দেখা হয় না। অনুবাদকে অনেকেই কেবল ভাষা বদলানো মনে করেন। তাই যথাযথ স্বীকৃতি কিংবা পারিশ্রমিকও জোটে না।
কিন্তু তার কাছে অনুবাদ মানে লেখা। আর লেখা মানে নিজের মানবিক সত্তাকে আবিষ্কার করা। লেখার মাধ্যমে তিনি নিজেকে খুঁজে পান। অনুবাদের মাধ্যমে খুঁজে পান অন্য মানুষের সঙ্গে নিজের মিল।
তার কাছে অনুবাদের মূল্য শেষ পর্যন্ত বই নয়; সেই দীর্ঘ মানসিক যাত্রা, যার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের অভিজ্ঞতার জগতে পৌঁছে যান।
এই বিশ্বাস বাজারের যুক্তির সঙ্গে খাপ খায় না। কারণ, বাজার পণ্য দেখে, প্রক্রিয়া নয়। এই জায়গাতেই লেখক ফিরে যান তাঁর দুই প্রিয় লেখক—মিশেল ক্লিফ ও অড্রে লর্ডের কাছে।
সমাজের প্রান্তিক মানুষ—নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী, অভিবাসী, প্রতিবন্ধী কিংবা যৌন বৈচিত্র্যের মানুষ—ভাষাহীন হওয়ার ক্ষত খুব ভালো করেই চেনেন। এখানে ভাষাহীনতা মানে মুখ ফুটে কথা বলতে না পারা নয়, বরং নিজের সত্য কথা বলতে না পারা।
আমরা প্রায়ই নিজের বাক্য নিজেরাই সম্পাদনা করি। রাগ কমিয়ে ফেলি। কথাকে নরম করি। এমনভাবে লিখি, যাতে কাউকে অস্বস্তিতে না ফেলি। অন্যরা আমাদের সহজে মেনে নেয়, সে জন্য অনেক সময় নিজেকে নিয়েই ঠাট্টা করি, আস্তে আস্তে সত্য আড়াল করার এই অভ্যাসই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এআইও যেন সেই ভদ্র, নির্বিরোধী ভাষাকেই উৎসাহিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত কিছু লিখতে গেলেই সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে—আপনি কি নিশ্চিত, এই কথাই বলতে চান? যেন প্রযুক্তি শুধু ভাষা নয়, ভাষার গ্রহণযোগ্যতাও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
মিশেল ক্লিফ লিখেছিলেন, ভাষাহীনতা শুরু হয় কথা বলতে না পারা দিয়ে; শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে পৌঁছায় কাজ করার অক্ষমতায়।
এই কথাটিই নিবন্ধ লেখকের মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
আমরা যখন এআইকে দিয়ে লিখিয়ে নিই, অথবা অনুবাদ করিয়ে নিই, তখন ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খোঁজার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। যন্ত্রের ভাষাই আমাদের ভাষা হয়ে ওঠে। শব্দের প্রাচুর্যের মাঝেও আমরা নিজের কণ্ঠস্বর হারাতে শুরু করি। প্রতিবাদ ভেতরে জমতে থাকে। রাগ প্রকাশের বদলে আমাদের ভেতরেই ক্ষয় তৈরি করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, সমস্যা এআই নয়। সমস্যা সেই ক্ষমতার কাঠামো, যার ভেতরে এআই তৈরি হয়েছে।
এখন পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে, এআই তো সেই ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি।
এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হল —হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
এআইয়ের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর দিকে তাকালেই একটি বিষয় চোখে পড়ে। তাদের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। পিটার থিয়েল, ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস, স্যাম অল্টম্যান, মার্ক জাকারবার্গ, অ্যালেক্স কার্প—নাম আলাদা, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিস্ময়কর মিল। তাদের কাছে বিপুল সম্পদ মানেই অসাধারণ মেধার প্রমাণ। তাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক অধিকারও যেন তারাই অর্জন করেছেন।
পিটার থিয়েল জার্মানিতে জন্ম নেওয়া মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও ধনকুবের। তিনি অনলাইন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান পেপ্যালের সহপ্রতিষ্ঠাতা, তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির টেকনোলজিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডার্স ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রথম দিকের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী হিসেবেও পরিচিত। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে তাঁর বিনিয়োগ এবং রিপাবলিকান রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন।
পিটার থিয়েলের কথাই ধরা যাক। তিনি প্রকৌশলী নন; মূলত বিনিয়োগকারী। তবু তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্যালান্টির এখন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নজরদারি প্রযুক্তি কোম্পানি। সরকারগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য-হাতানো, বিশ্লেষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠান। থিয়েলের বিশ্বাস, পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অপশ্চিমা সংস্কৃতি। তাঁর কাছে উন্নতির মানদণ্ড মানুষের শিক্ষা, প্রজ্ঞা বা সুস্থতা নয়; আরও শক্তিশালী যন্ত্র। সংস্কৃতিও যেন তার কাছে এক প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় পশ্চিমকে কেবল জিততেই হবে। উপনিবেশবাদের পুরোনো যুক্তি নতুন প্রযুক্তির ঝলমলে পোশাক চাপিয়ে আবার ফিরে এসেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এই প্রযুক্তি শুধু বাজারে নয়, যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। গণনজরদারি থেকে শুরু করে সামরিক অভিযানে—এআইকে ক্রমেই ক্ষমতার অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে। অথচ এর নির্মাতাদের স্বরে অনুশোচনার চিহ্ন খুব কমই দেখা যায়। এক সাক্ষাৎকারে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন করা হয়েছিল থিয়েলকে। উত্তর দিতে তিনি দীর্ঘক্ষণ ইতস্তত করেছিলেন। যেন মানুষের ভবিষ্যৎও এখন প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার একটি উপধারা মাত্র।
এই গোষ্ঠীর আরেকটি স্বপ্নও লক্ষণীয়। তারা নিজেদের ট্রান্সহিউম্যানিস্ট বলে পরিচয় দেয়। অর্থাৎ মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে যন্ত্রের সঙ্গে একীভূত করার স্বপ্ন দেখে। দীর্ঘ জীবন চায়, তবে সবার জন্য নয়; নিজেদের জন্য। সমুদ্রে নতুন উপনিবেশ গড়ার পরিকল্পনা করে, মহাকাশে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখে। প্রযুক্তি যেন তাদের কাছে মানবমুক্তির নয়, নতুন আধিপত্যের ভাষা।
এই ক্ষমতার কাঠামোটি কেমন কৃষ্ণাঙ্গ প্রযুক্তিবিদ থ্যাডিয়াস হাউস লিখেছেন, প্রযুক্তি খাতে ত্রিশ বছর কাজ করার পরও তিনি এমন কোনো কর্মক্ষেত্র দেখেননি, যেখানে একই সময়ে তিনজনের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ কর্মী ছিলেন। পরে তিনি নিজে ব্যবস্থাপক হওয়ার পর সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন।
সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নারীদের উপস্থিতিও সামান্য। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও প্রায় একই। কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব সেখানে নগণ্য। অথচ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে যে প্রযুক্তি, তার নকশা তৈরি হচ্ছে প্রায় সম্পূর্ণ একরঙা, একলিঙ্গ ও এক ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতার মানুষের হাতে।
প্রযুক্তি গবেষক কেট ক্রফোর্ড তাই এআইকে বলেছেন ক্ষমতার নিবন্ধনপত্র। তাঁর প্রশ্ন সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর—এই প্রযুক্তি কাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে? কার স্বার্থ রক্ষা করছে? আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারই বা কার হাতে? প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একদিন নিবন্ধকার, লেখক ডি পি স্নাইডার তার নিজের লেখালেখির ক্লাসে এক মেধাবী কিশোরীকে একটি খুব সাধারণ শব্দের কয়েকটি সমার্থক শব্দ বলতে বলেন। মেয়েটি চুপ করে থাকে। তারপর তার চোখে পানি চলে আসে। অনেক ভেবেও একটি শব্দও মনে করতে পারে না। ঘটনাটি সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু লেখকের কাছে এটি ছিল একটি সতর্কসংকেত।
আজকের অনেক তরুণ প্রায় সব লেখাই লিখছে এআই-নির্ভর অ্যাপের সাহায্যে। বার্তা পাঠানো, ই-মেইল, প্রবন্ধ—সব ক্ষেত্রেই যন্ত্র আগে বাক্য সাজিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে শব্দ খোঁজার শ্রমটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা চ্যাটজিপিটির সাহায্যে প্রবন্ধ লিখেছিল, তাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ তুলনামূলক কম সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে সৃজনশীলতা ও কার্যকর স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অংশে সক্রিয়তা কমে যায়।
এআই মানুষের মস্তিষ্ককে অনুকরণ করার দাবি করে। কিন্তু সেই অনুকরণই যদি মানুষের মস্তিষ্ককে অলস করে তোলে, তাহলে? লেখকেরও প্রশ্ন এখানেই।
একসময় যদি মানুষ নিজেই শব্দ খুঁজে না পায়, ভাষার ভেতর দিয়ে ভাবতে না শেখে, তাহলে যন্ত্র শেষ পর্যন্ত কার কাছ থেকে শিখবে? পরজীবীরও তো একটি জীবন্ত শরীর দরকার।
ভাষারও জীবন আছে। পৃথিবীর মতো ভাষাও ক্ষয় হয়, আবার নতুন হয়ে জন্ম নেয়। মানুষ মারা গেলে তার সঙ্গে অনেক শব্দও হারিয়ে যায়। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা উচ্ছেদ ভাষার ভান্ডারও ধ্বংস করে। আবার প্রতিদিন নতুন শব্দও জন্ম নেয়। কোনো লেখকের কলমে, কোনো বিজ্ঞানীর গবেষণায়, কোনো গানের কথায় কিংবা রাস্তাঘাটে বলা আটপৌরে ভাষায়।
শেক্্সপিয়ার অসংখ্য নতুন শব্দ ইংরেজিকে উপহার দিয়েছেন। মার্ক টোয়েন দিয়েছেন আরও অনেক। সাহিত্যের কাছ থেকে বিজ্ঞানও শব্দ ধার করেছে। ভাবা যায়? পরমাণুর ভেতরের নতুন এক কণার নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না বিজ্ঞানীরা। তখন পদার্থবিদ মারে গেল-ম্যানের মনে পড়ে জেমস জয়েসের ইউলিসিস। সেখানে একটি খেয়ালি ছড়ায় আছে—'থ্রি কোয়ার্কস ফর মাস্টার মার্ক'। 'কোয়ার্ক' শব্দটির আলাদা কোনো অর্থ ছিল না; জয়েস যেন খেলাচ্ছলে শব্দটি বানিয়েছিলেন। সেই কল্পনার শব্দই পরে পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষা হয়ে যায়। সাহিত্য যে শুধু গল্পই দেয় না, বিজ্ঞানের ভাষাও গড়ে দেয়—এ তারই এক অপূর্ব উদাহরণ। এই শব্দ পরে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক পরিভাষা হয়েছে। যে জিনিসের ভাষা নেই, তাকে পুরোপুরি কল্পনাও করা যায় না।
শব্দ আমাদের শুধু কথা বলতে শেখায় না; পৃথিবীকে দেখার নতুন চোখও দেয়। এই কারণেই ভাষার বৈচিত্র্য কমে যাওয়া কেবল ভাষাবিদদের সমস্যা নয়; মানবসভ্যতারও ক্ষতি।
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, গড়ে প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। একটি ভাষা হারানো মানে শুধু কিছু শব্দ হারানো নয়; হারিয়ে যায় শত শত বছরের স্মৃতি, জ্ঞান, বিশ্বাস, প্রকৃতিকে দেখার ভিন্ন পদ্ধতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পৃথিবী।
এদিকে ভাষার আরেকটি বিস্ময়কর ক্ষমতা হলো, সে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দের জন্ম দেয়। গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ মনিটরের হিসাবে, প্রতি ৯৮ মিনিটে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটি নতুন শব্দ জন্ম নিচ্ছে। দিনে প্রায় পনেরোটি, বছরে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি। অথচ আমাদের খুব পরিচিত, খুব প্রিয় অনেক শব্দের বয়সও খুব বেশি নয়।
কিন্তু কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি কখনো ভাষার বৈচিত্র্য পছন্দ করে না। কারণ, ভাষা নিয়ন্ত্রণ মানেই চিন্তা নিয়ন্ত্রণ। হিটলার জানতেন। মুসোলিনি জানতেন। আজও বিশ্বের নানা সরকার একই পথেই হাঁটছে। সরকারি নথি ও ওয়েবসাইট থেকে নির্দিষ্ট শব্দ বাদ দেওয়া হচ্ছে। কিছু শব্দকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। যেন একটি শব্দ মুছে ফেললেই বাস্তবতাও মুছে যাবে।
অরওয়েলের সতর্কবার্তা তাই আজও ভয়াবহভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রযুক্তির নামে যদি আমরা ভাষাকে একরকম, নির্বিরোধী এবং নিয়ন্ত্রিত করে ফেলি, তাহলে হারাব শুধু শব্দ নয়; হারাব ভিন্নভাবে ভাবার ক্ষমতাও। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এদিকে আরেকটি কাজও নীরবে করে চলেছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ। অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসে যে 'চিন্তার ঐক্য' ছিল একনায়কতন্ত্রের প্রতীক, সেই দৃশ্যকেই অ্যাপল ১৯৮৪ সালের বিখ্যাত সুপার বোল বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছিল ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারকে তুলে ধরতে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের সেই মুক্তির ভাষা বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি।
এশিয়ার কারখানাগুলোতে দীর্ঘদিন সস্তা ও বাধ্যতামূলক শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল অ্যাপলের উৎপাদনব্যবস্থা। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেক ঘটনা। ইউটিউবের বহু নির্মাতা জানতে পারেন, তাঁদের অনুমতি না নিয়েই অ্যাপলসহ চারটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাঁদের ভিডিওর সাবটাইটেল সংগ্রহ করে বিশাল এক ডেটাভান্ডার বানিয়েছে। সেই সৃজনশীল শ্রমই ব্যবহার করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দিতে। না ছিল স্রষ্টাদের সম্মতি, না ছিল কোনো পারিশ্রমিক। মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিতে দিতে প্রযুক্তি-করপোরেশনগুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃষ্টিকেই বিনা মূল্যে নিজেদের সম্পদে পরিণত করেছে।
তারা মানুষের লেখা, ভিডিও, অনুবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট—সবকিছু দিয়ে এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আমরা ক্যাপচা পূরণ করছি, প্রশ্ন করছি, উত্তর দিচ্ছি, তথ্য তৈরি করছি—অর্থাৎ অজান্তেই বিনা মজুরিতে তাদের ভাষা-কারখানায় শ্রম দিয়ে যাচ্ছি।
একে সহযোগিতা বলা হয়। লেখক ডি পি স্নাইডারের ভাষায়, এ হলো আসলে ডিজিটাল সামন্তবাদের নতুন খাজনা।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এক বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে ক্যামেরা ঢোকে। বৃদ্ধা রান্নাঘরের কল খুলে দেখান—পরিষ্কার পানির বদলে ঝরছে মরিচাধরা লালচে পানি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর স্বামী বলেন, তাদের কূপের পানি আর আগের মতো নেই। কাছেই মেটার বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরি হওয়ার পর থেকেই এই অবস্থা। তারপর তাঁরা সাংবাদিককে বাড়ির বাইরে নিয়ে যান। কয়েক শ গজ দূর থেকে সারাক্ষণ ভেসে আসে যন্ত্রের অবিরাম গর্জন। যে বাড়িতে শান্ত বার্ধক্য কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে বাড়িটি আজ প্রযুক্তির দাঁতে আটকে পড়া এক যুদ্ধক্ষেত্র।
এআইকে আমরা প্রায়ই কেবল সফটওয়্যার হিসেবে দেখি। কিন্তু তারও একটি ভৌত শরীর আছে। বিশ্বে এখন প্রায় বারো হাজার ডেটা সেন্টার। এর অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিটি কেন্দ্র প্রতিদিন গড়ে হাজার হাজার গ্যালন বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে। বিদ্যুৎ খরচ করে একটি মাঝারি শহরের সমান। আমরা যখন মোবাইলে একটি প্রশ্ন করি, তখন তার উত্তর তৈরি হয় কেবল অ্যালগরিদম দিয়ে নয়; বিপুল পরিমাণ পানি, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে।
এই অবকাঠামোর সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার ঘটছে বৈশ্বিক দক্ষিণে—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সিঙ্গাপুর, চিলি, ব্রাজিলসহ বহু দেশে। সেখানে ডেটা সেন্টারের জন্য জমি, পানি ও বিদ্যুৎ দখলের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর।
'সংস্কৃতি' শব্দটির লাতিন উৎসের অর্থই হলো লালন করা, রক্ষা করা, চাষ করা। ভাষাও তেমনই। ভূমি, মানুষ এবং ভাষার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে ভাষাও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। তবে এ ছবির দৃশ্য পুরোপুরি অন্ধকার নয়।
বিশ্বের নানা প্রান্তে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা বাঁচাতে ছোট ছোট ভাষা-আদল বা মডেল তৈরি করছে। অলাভজনক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা এমন প্রযুক্তি গড়ে তুলছে, যা হারিয়ে যাওয়া ভাষাকে আবার মানুষের মুখে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। কেউ তৈরি করছেন মাতৃভাষার বাক্স্বীকৃতি ব্যবস্থা। কেউ অনলাইন বর্ণবাদ শনাক্ত করার সফটওয়্যার। কেউ আবার ভাষার ডিজিটাল অভিধান। এখানে এআই প্রভুর হাতিয়ার নয়; মানুষের সহকারী।
পার্থক্যটি প্রযুক্তিতে নয়, উদ্দেশ্যে। একদিকে প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে মুনাফা, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির জন্য। অন্যদিকে একই প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতি রক্ষার কাজে। এই দুইয়ের পার্থক্য ভুলে গেলে এআইকে বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়; গতির।
পুঁজিবাদের দুই প্রধান চালিকাশক্তি হলো গতি ও মুনাফা। এআই সেই লক্ষ্য পূরণ করে মানুষের শ্রম কমিয়ে নয়, অনেক সময় মানুষকেই প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে। দ্রুত লেখা, দ্রুত অনুবাদ, দ্রুত প্রকাশ—সবই সম্ভব। কিন্তু দ্রুততার বিনিময়ে যদি ভাষার গভীরতা হারিয়ে যায়, তাহলে লাভের হিসাবের বাইরে আরেকটি ক্ষতির খাতা খুলে যায়।
দার্শনিক থিওডর অ্যাডোর্নো একে বলেছিলেন 'অশুভ স্বাভাবিকতা'। এ অবস্থায় মানুষ অন্য রকম পৃথিবী কল্পনা করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। আমরাও কি সেই দিকেই এগোচ্ছি? প্রশ্ন করেন ডি পি স্নাইডার।
এআই-নির্ভর লেখালেখি যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, যদি আমরা ভাবতেই না পারি যে যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াও লেখা, অনুবাদ বা চিন্তা করা সম্ভব, তাহলে ধীরে ধীরে ভাষা আর মানুষের যৌথ সৃষ্টি থাকবে না। সাহিত্য জায়গা ছাড়বে 'কনটেন্ট'কে। বইয়ের বদলে বাজার ভরে যাবে যন্ত্রে-তৈরি লেখায়। শিল্প নিজেই একসময় পণ্যের অনুকরণে পরিণত হবে—যেমন কোনো কোনো দেশে পনিরের বদলে 'চিজ প্রোডাক্ট' বিক্রি হয়, দেখতে প্রায় একই, কিন্তু আসলে এক নয়।
অরওয়েল একসময় লিখেছিলেন, মানুষের নিজের বাক্য গঠনের বদলে আগে থেকে সাজানো শব্দগুলোকে জোড়া লাগিয়ে 'দেখতে ভালো' একটি লেখা বানানোর কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেই সতর্কবাণী নতুন অর্থে ফিরে এসেছে। তাই প্রয়োজন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়; প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করার সাহসও।
ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। লেখক, অনুবাদক, গবেষক, শিল্পী—যাঁরা শব্দ দিয়ে পৃথিবী নির্মাণ করেন, তাঁদের কাজের মূল্য স্বীকার করতে হবে। প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে স্বয়ংক্রিয়তা কেবল করপোরেট মুনাফা বাড়ায়, মানুষের সক্ষমতা নয়, তাকে প্রশ্ন করতে হবে। নিজস্ব তথ্যের ওপর নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে সেই পথেই হাঁটছে। অন্য দেশগুলোকেও ভাবতে হবে।
এই নিবন্ধের শুরুতে অরওয়েলের ১৯৮৪ আর অড্রে লর্ডের একটি বাক্য পাশাপাশি এসেছিল। শেষে এসে বোঝা যায়, দুজনই একই সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন—ভাষার নিয়ন্ত্রণ মানেই মানুষের নিয়ন্ত্রণ। আর যে হাতিয়ার ক্ষমতার দুর্গকে আরও শক্তিশালী করে, তাকে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ভুল করলে বিপদ অনিবার্য।
এআইকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাকে দেবতা বানানোরও কারণ নেই। প্রযুক্তি মানুষের সেবক হলে সভ্যতা এগোয়। মানুষ যদি প্রযুক্তির কাঁচামালে পরিণত হয়, তখন সভ্যতা পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি মানুষের নিজের বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ে। আমরা কি নিজের নিজের ভাষা, কল্পনা, স্মৃতি এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বর ধরে রাখতে চাই? নাকি সেগুলো ধীরে ধীরে এমন এক যন্ত্রের হাতে তুলে দেব, যে আমাদের ভাষায় লিখতে পারে, কিন্তু কখনো আমাদের মতো বাঁচেনি? এই সিদ্ধান্তই ঠিক করবে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে নাকি প্রযুক্তিই মানুষকে ব্যবহার করবে।