এআই ব্যবহারের অভিযোগ: ফরাসি সাহিত্য পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ পড়ল বেস্টসেলার উপন্যাস
ফরাসি সাহিত্য জগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত এক ঘটনায় তোলপাড় হয়ে উঠেছে। একটি বেনামী এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, হাইতিয়ান-কানাডীয় লেখক থেলিসন ওরেলিয়েন-এর উপন্যাসটি "প্রায় পুরোটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা"।
এমন অভিযোগের পরপরই গত শুক্রবারে ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার 'প্রি গকুর'-এর চূড়ান্ত তালিকা থেকে উপন্যাসটি বাদ দেওয়া হয়।
'ইট ওয়াজ আইদার দ্যাট অর ডাই' নামের এই উপন্যাসটি ব্রাজিল, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র হয়ে কানাডার উদ্দেশ্যে এক হাইতিয়ানের বিপজ্জনক যাত্রার গল্প নিয়ে রচিত। বইটি ফরাসি বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৩৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।এমনকি গত সোমবার বইটি ফ্রান্সের আরেক মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার 'এফএনএসি নোভেল প্রাইজ' জয় করে এবং সমালোচকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
৩৮ বছর বয়সী ওরেলিয়েন ২০১০ সালে হাইতিতে হওয়া বিধ্বংসী ভূমিকম্পে নিজের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর কানাডায় অভিবাসী হন। তিনি তার বই রচনায় এআই ব্যবহারের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
যে 'প্যাংগ্রাম' সফটওয়্যারের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযোগগুলো তোলা হয়েছে, সেটিকে এআই ডিটেক্টর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকরণ ব্যবস্থার "স্বর্ণমান" (গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড) হিসেবে গণ্য করা হয়। গকুর একাডেমি যা প্রি গকুর পুরস্কার পরিচালনা করে থাকে—বইটিকে তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। তারা এর কারণ হিসেবে "বিশ্বস্ত গবেষক ও সাংবাদিকদের বিশদ বিশ্লেষণের ধারাবাহিক ফলাফল"-কে উল্লেখ করেছে, যা ইঙ্গিত করে যে বইটি "খুব সম্ভবত, সিংহভাগই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি"।
ওরেলিয়েনের ফরাসি প্রকাশক জানান, তিনি ২০১৭ সালে এই উপন্যাসটি লেখা শুরু করেন এবং ২০১৯ সালে একটি খসড়া শেষ করেন—যা জেনারেটিভ এআই বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য হওয়ার অনেক আগের ঘটনা। গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে ওরেলিয়েন বলেন, তিনি বহু বর্ণবাদী আক্রমণের" শিকার হয়েছেন এবং তার দাবি প্রমাণের জন্য তিনি বর্তমানে ফ্রান্স ও কুইবেকের প্রকাশকদের সাথে একটি নথিপত্র প্রস্তুত করছেন।
রক্ষণশীল সংবাদপত্র 'লা ফিগারো'-র কলামিস্ট স্যামুয়েল ফিতুসি, যিনি নিজেকে "একটু ডানপন্থী" বলে পরিচয় দেন, স্বীকার করেছেন যে ওই এক্স অ্যাকাউন্টটি পরিচালনার পেছনে যে "যৌথ উদ্যোগটি" ছিল, তিনি তার অংশ। তবে 'ওক ফিকশন' গ্রন্থের এই লেখক কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করার কথা অস্বীকার করে বলেন যে, তিনি মূলত "একজন লেখক ও তার পাঠকদের মধ্যকার নৈতিক চুক্তিকে" রক্ষা করছেন এবং "এআই-লিখিত সাহিত্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন।"
এআই-সংক্রান্ত এই অভিযোগগুলোর পর, কুইবেকের সংবাদপত্র 'লা প্রেসি' ২০১২ ও ২০১৩ সালের মধ্যে ওরেলিয়েনের লেখা বিভিন্ন নিবন্ধ ও মতামত কলামে প্লাজিয়ারিজম বা লেখা চুরির অভিযোগ তুলে ধরে। পরবর্তীতে রেডিও-কানাডার এক অনুসন্ধানেও সত্যতা পাওয়া যায় যে, ওরেলিয়েনের লেখা কলাম ও মতামতভিত্তিক লেখার "কমপক্ষে পাঁচটি" অংশ অন্য লেখকদের রচনা থেকে কিছুটা হুবহু নেওয়া হয়েছিল।
'লা প্রেসি' প্যাংগ্রাম সফটওয়্যার ব্যবহার করে আরও দেখতে পায়, ২০১২ সালে পুরস্কারজয়ী ওরেলিয়েনের ছোটগল্প 'উ ভা ল্য মোঁদ'-এর সাথে লুই পাওয়েলসের ১৯৬০ সালের বই 'লে মার্তেঁ দা মাজিসিয়াঁ'-এর "কমপক্ষে চারটি হুবহু একই বাক্য" রয়েছে। এ বিষয়ে 'লা প্রেস' ওরেলিয়েনের সাথে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এই কেলেঙ্কারিটি এআই ডিটেক্টরগুলোর নির্ভরযোগ্যতার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। এটি লেখকদের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে, যেখানে কয়েকজন ফরাসি সাহিত্যিক যুক্তি দিচ্ছেন যে এআই এখন আমাদের জীবনেরই অংশ—এবং লেখকত্বের ধরনও দিন দিন বদলে যাচ্ছে।
ওরেলিয়েন বলেছেন, 'বইয়ের উপমা, পুনরাবৃত্তি আর ছন্দগুলো জীবন্ত কথ্য ভাষার রূপ, এগুলো আমার নিজের সৃষ্টি। আমার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হলো হাইতিয়ান এবং ক্যারিবীয়।'
অপ্রচলিত ও লোকমুখের আঞ্চলিক ফরাসি ভাষা কি প্যাংগ্রাম সফটওয়্যারকে ভুলের দিকে পরিচালিত করতে পারে?
এই সম্ভাবনাটি পরীক্ষা করার জন্য ফরাসি এআই বিশেষজ্ঞ বেনোয়া রাফায়েল দুটি, এবং পরবর্তীতে চারটি হাইতিয়ান উপন্যাসের দুটি করে অধ্যায় প্যাংগ্রাম-এ ইনপুট দেন। প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রে এটি সঠিকভাবে মানুষকে রচয়িতা হিসেবে শনাক্ত করেছে।
এরপর রাফায়েল ২০২৩ সালের আগে প্রকাশিত ওরেলিয়েনের কবিতা, সংক্ষিপ্ত গদ্য এবং সমালোচনামূলক লেখার কিছু অংশ ইনপুট দেন—যখন জেনারেটিভ এআই এই ধরনের লেখা তৈরি করার মতো যথেষ্ট উন্নত ছিল না। প্যাংগ্রাম এগুলোকেও মানুষের সৃষ্টি বলেই শনাক্ত করেছে।
রাফায়েল জানান, এই কেলেঙ্কারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই তিনি আরেকজন এআই বিশেষজ্ঞের কাছে ওরেলিয়েনের উপন্যাসটি এআই-এর সহায়তায় লেখা হয়েছে বলে নিজের সন্দেহের কথা লিখে জানিয়েছিলেন। তিনি এআই-উৎপাদিত গদ্যের স্পষ্ট কিছু লক্ষণ ধরে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু অলঙ্কারযুক্ত বাক্যের অতিরিক্ত ব্যবহার অন্যতম।
এআই ডিটেক্টরগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য?
গবেষণায় দেখা গেছে যে এআই-এর ব্যবহার শনাক্তকরণে প্যাংগ্রাম অত্যন্ত নির্ভুল। এর সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি এবং ভুল শনাক্তকরণের (ফলস পজিটিভ) হার প্রায় নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও, দু-একটি ভুল হতেই পারে।
সাম্প্রতিক সময়ের আরও কিছু সাহিত্যকর্ম নিয়ে অভিযোগ তুলতে এটি ব্যবহার করা হয়েছে—যার মধ্যে জামির নাজিরের 'কমওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ' জয়ী ছোটগল্পটিও রয়েছে, যা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগমুক্ত করা হয়।
পূর্ব-ভারতীয় বংশোদ্ভূত ত্রিনিদাদীয় লেখক নাজির বিচারকদের জানিয়েছিলেন যে, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি 'স্পিচ-টু-টেক্সট' সরঞ্জাম ব্যবহার করে মুখে বলে লেখা রেকর্ড করতেন এবং পরে তা গভীরভাবে সম্পাদনা করতেন।)
লেখকদের এআই ব্যবহার কি গ্রহণযোগ্য?
গত সপ্তাহে ফরাসি টেলিভিশনে 'ম্যান ইন্টারন্যাশনাল বুকার'-এর চূড়ান্ত তালিকায় থাকা 'ভের্নন সুবতেক্স ১'-এর লেখক, খ্যাতনামা সাহিত্যিক ভির্জিনি দেপাঁত লেখকদের এআই ব্যবহারের জন্য জবাবদিহি করার ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, 'থেলিসন ওরেলিয়েনকে কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না, এর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি যেভাবে খুশি লিখবেন। নিকুচি করেছে প্যাংগ্রামের।'
দেপাঁত বইটির ছোট বাক্য, শক্তিশালী রূপক এবং পর্বভিত্তিক শৈলী বেশ পছন্দ করেছেন, যেগুলোকে তিনি সমসাময়িক রচনার মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন। ২০২৩ সালে চ্যাটজিপিটি-র সাহায্যে লেখা বিকল্প ইতিহাসের যৌথ-স্রষ্টা রাফায়েল দোয়াঁ, দেপাঁতের সাথে একই টিভি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ওরেলিয়েনের অস্বীকৃতি সত্ত্বেও দোয়াঁ বিশ্বাস করেন যে লেখক এআই ব্যবহার করেছেন। এর সপক্ষে তিনি উপন্যাসটির বাঁধা ধরা এআই ধাঁচ, জীর্ণ রূপক এবং ধারাবাহিকতাহীন কাহিনিসূত্রের কথা উল্লেখ করেন, যা এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে হঠাৎ লাফিয়ে চলে (এআই সাধারণত শত শত পৃষ্ঠা জুড়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ধারাবাহিক গদ্য বজায় রাখতে হিমশিম খায়)।
'কালচারাল হিস্ট্রি অফ এআই'-এর লেখক আলেকজান্দ্রে জেফেন ওরেলিয়েনকে রেনেসাঁ যুগের এমন একজন শিল্পীর সাথে তুলনা করেছেন, যিনি তার নিজস্ব স্টুডিওতে নিজের অধীনে অন্য শিল্পীদের দিয়ে কাজ করাতেন। তিনি বলেন, লেখার প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে লেখকত্বের ধারণাও সবসময় পরিবর্তিত হয়েছে।
