নমো যন্ত্র তথা এআই
"কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি।-
তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কণিকা'র একখানা ছোট্ট দু'লাইনের কাপলেট। তাঁর জহুরীর চোখ, কমলহীরে থেকে নকল হীরে...কেউই ফাঁকি দিতে পারত না, কিন্তু আমজনতার চোখ তো তা নয়। নকল হীরেটি বৃহদাকার বা জেল্লাদার হলেই সে আজকাল বিশ্বাস করে বসছে। বহুকাল যাবত তার বিবিধ সুকুমারবৃত্তির চর্চা ফিকে হয়ে এসেছে। চিল কান নিয়েছে এ বিষয়ে আজকাল সে শুধু সন্দেহ নয়, প্রগাঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। ইতিহাসের গোঁজামিল বুঝবার জন্যে তার আছে ফেসবুক রিল, সেখানে ঝিঙের ঝোলে পোস্ত গুলতে গুলতে কেউ যদি তাকে শোনায় পৃথিবী ফরাসের মতো চ্যাপ্টা—সে কোপার্নিকাসের ধার ধারবে না। একবারও সে ভাববে না—দস্তয়েভস্কি ঠিক কোথায় নার্সিসিস্ট চিনবার নয়টি প্রণালি জানিয়ে গেছেন। নিজের চেহারাটি এআইয়ের ভেতর দিয়ে চালান হয়ে এলে যখন তার দ্বিতীয় চিবুক অদৃশ্য আর প্রথম চিবুক দ্রষ্টব্য হয়, টাকে চুল গজায়, সরু চোখ আয়ত হয়ে আসে—আর মধ্যদেশে একটি বৃহৎ পোঁটলার বদলে ছয়টি দুই সারিবদ্ধ পুঁটুলির (সিক্স প্যাক আর কি) আবির্ভাব হয়, তখন তার মনে হয়—এআই আর এমন কী খারাপটা! এ তো দেখি কামধেনুর মতো, যা তার কাছে চাওয়া হয় তাই দিতে পারে! হলিউডের স্বর্ণালী যুগের নায়কনায়িকারা—এই গ্রেগরি পেক, ক্যারি গ্র্যান্ট, এভা গার্ডনার, এলিজাবেথ টেইলর, হেডি লামার, মেরিলিন মনরো...যাঁরা এআই-হীন যুগে এআইয়ের পালিশ ছাড়াই অত সুন্দর ছিলেন, তাঁদেরকে সাধারণ মানুষ চেনে এআইয়ের ডে-কার্টেনের ঝালরের ভিতর দিয়ে (যেসব খুঁত তাঁদের চেহারাকে বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল—সেসব শুধরে দিয়ে এআই "সকলি সমান করে" কিনা)! খোদ উত্তমকুমারের মিষ্টি হাতে হালকা মেদ-মাখানো চেহারাটা হয়ে যাবে এআইয়ের বাটালির আঘাতে ক্ষুরধার, তাতে আজকালকার দর্শক তোয়াক্কা করবে না। রাজেশ খান্নার লিপে কিশোরকুমার রীতিমতো গেয়ে গেছেন- "মুফ্তমে দিলকো কিঁউ তরসায়ে, চল দরিয়ামেঁ ডুব যায়ে।", মন-মাথা অত বিচলিত করে লাভ কি, দরিয়ায় গা ভাসালেই হয়।
শুধু কি ওসবই? সাহিত্যেও ঘটে গেছে এআই জলোচ্ছ্বাস। আজ তাই নিয়েই লিখব।
পাঠক হিসেবে এআই জমানার আম-পাঠক একবারও ভাবে না- ছত্রে ছত্রে এতগুলো দার্শনিক কথা শুনিয়ে যাওয়া এ গল্পটা কেন দেদারসে ঘি ঢেলে রাঁধা স্বপ্নের পোলাওয়ের মতো গুরুপাক লাগছে? কেন এত পুনরাবৃত্তি? তার মনে হয় না- এ যে দেখি এমন এক যাত্রা, যেখানে সবাই বিবেক, রাজা বিবেক, রাণী বিবেক, রাজদ্রোহী বিবেক, রাজদ্রোহীর পেছনের ফেউটাও বিবেক! ক্লিশে সে চেনে না তা নয়, এআই-জমানায় বহুব্যবহৃত ক্লিশেকে সে আপনজনের মতো চেনে আর ভালোবাসে। ফলে তার প্রতিদিনকার পাঠ্য গদ্য আত্মিকযোগ-রহিত অথবা উত্তুঙ্গ আত্মিকযোগকামী, প্রেরণাবিহীন ক্লিশেতে ঠাসা, পুনরাবৃত্তিময়। ১৯১২ সালের পৌষমাসের শীতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন শব্দবন্ধ- 'লঘু মায়া', এআই গোলানো সাহিত্য সেই লঘু মায়া বৈ তো নয়। মাতাপিতা সংক্রান্ত দু-ফোঁটা করুণরস, ধর্মানুভূতির চার ফোঁটা বীররস আর রুদ্ররস, আর কর্মা তথা কর্মফল জনিত বীভৎস রস...ওসব মিলিয়ে ঝাঁকুনি দিলেই গল্প তৈরি। সাধারণ পাঠক এই 'লিখালিখি'র প্রেমে পড়ে, 'লিখনী'র প্রেমে পড়ে, ঐ স্বপ্ন-রন্ধিত পোলাও খেয়ে চোঁয়া ঢেকুর তুলতে তুলতে সে সারারাত কাঁদে আর পাঠক হিসেবে আত্মতুষ্টিলাভ করে। সে নিজেই অন্যের খাতা দেখে পরীক্ষার হলে উত্তর লিখেছে, ছোট্ট শিশু কোনো চমকপ্রদ ছড়া লিখে আনলে আদর করে দিব্যি জিজ্ঞেস করেছে- "এটা কে লিখে দিয়েছে সোনামণি?" অন্যে লিখে দেবার চর্চার সঙ্গে সে আজীবন জড়িত।
বাঙালিকে দোষ দিয়ে লাভ কি? কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ ছোট গল্পের জন্য পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ (নানান নিরিখে) পুরস্কার, তিনবার ছেঁকে (শর্টলিস্ট=> রিজিওনাল তথা আঞ্চলিক=> শ্রেষ্ঠ) অবশেষে বিশাল সংখ্যক সাহিত্যিকদের ভিতর থেকে বিজয়ীকে তুলে আনা হয়। সেই পুরস্কারের বেলায় গতবার ত্রিনিদাদের গল্পকার জামির নাজিরের 'দ্য সারপেন্ট ইন দ্য গ্রোভ' তথা 'কুঞ্জবনে সাপ' গল্পটিতে এআই ব্যবহার হয়েছে কি হয়নি, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এ গল্পটি নির্বাচিত হবার পরেই বিশ্বব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়াতে পাঠক ও সমালোচকরা বলতে শুরু করেন- এ গল্প রচনায় এআই ব্যবহার করা হয়েছে। একদিকে সমালোচকরা বলছেন- নাজিরের গল্পে এআইয়ের সুস্পষ্ট পদছাপ রয়েছে, অপরদিকে বিচারকরা বলছেন- এ গল্প কাব্যগুণসমৃদ্ধ, মৌলিক ও মর্মস্পর্শী। দীর্ঘদিন ধরে কমনওয়েলথ পুরস্কারের শর্টলিস্টেড গল্প ছাপা হয় 'আড্ডা' ম্যাগাজিনে, এরপরের ধাপে আঞ্চলিক বিজয়ীদের গল্প ছাপা হয় 'গ্রান্টা' ম্যাগাজিনে। জামিরসহ একাধিক নির্বাচিত গল্পে এআইয়ের প্রয়োগ নিয়ে বাদানুবাদ তুঙ্গে উঠবার একপর্যায়ে গ্রান্টা ম্যাগাজিন তাদের সম্পাদনা-সততার স্বার্থে কমনওয়েলথ শর্টস্টোরির আঞ্চলিক বিজেতাদের গল্প ছাপবার চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। আত্মপক্ষ সমর্থন করে নাজির বলেন- ফোনে স্পিচ টু টেক্সট সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণেই তাঁর গল্পে এআই ব্যবহারজনিত পালিশ এসেছে। তাঁর গল্পটি চূড়ান্ত রায়ে নির্বাচিত হওয়াকে অনেকে কমনওয়েলথের গোঁয়ার্তুমি বলেও দাবি করেছেন। কমনওয়েলথ অবশ্য জানিয়েছে- এআই ব্যবহার হয়েছে কিনা তা নিরীক্ষার জন্য যে এআই ডিটেকশন সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়- তা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়, ফলে যন্ত্রের রায় চূড়ান্ত হতে পারে না। কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন বরং লেখকদের ড্রাফট, প্রাথমিক আউটলাইন, গল্পের বিকাশমানতার যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখেছে। ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর জেনারেল রাজমী ফারুক গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলেছেন- যন্ত্রের জমানায় যন্ত্রস্বরই মুখ্য, যখনই একজন সাহিত্যিক ছাঁচের বাইরে বের হবেন, তাঁর প্রতিভার যত চমক থাকবে- সেই অচেনা দীপ্তি মানুষকে তত বিচলিত করবে। ততই সেই সাহিত্যিককে সন্দেহের চোখে দেখা হবে আর বলা হবে তিনি নিশ্চয়ই এআই ব্যবহার করেছেন। একজন উদীয়মান সাহিত্যিককে আজ কেবল নিজের প্রতিভাই নয়, নিজের মনুষ্যসত্তার প্রমাণও দিতে হবে- তা তিনি কিংস্টোন- কোলকাতা- কুয়ালালামপুর কিংবা কিগালি যেখান থেকেই আসুন!
কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারে শর্টলিস্টেড হওয়া আমার সামান্য লেখালেখির জীবনে একটি ঝলমলে অধ্যায়। নির্বাচিত সেই ছোটগল্পটা লিখেছিলাম স্বল্পসময়ে (বাঙলায় আমি যা লিখি, তা একটানে একাসনে লিখেছি বহুবার, কারণ মাথার ভেতর শব্দ জমতে জমতে আকার পাবার এক পর্যায়ে লিখতে বসি, তখন দুরন্ত বেগে লেখা ছাড়া উপায় থাকে না), কিন্তু অনুবাদ করেছিলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, অনেকগুলো ড্রাফট করে। সেই পুরস্কারকে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখে ক্ষুণ্নমনা হয়েছি অস্বীকার করব না। যে লেখা দীর্ঘ নির্জলা উপবাসে পাখির ডিমের মতো তা দিয়ে ফোটাতে হয়, সেই লেখা যদি অন্যে যন্ত্রবলে পাষাণ গলিয়ে লিখে ফেলে তবে শঙ্কার কারণ আছে বৈকি। আবার যে লেখা একাসন সাধনায় লেখা, তাকে যদি চৌর্যবৃত্তির কালিমা নিতে হয়, তাতেও প্রভূত বিপদ।
এমন প্রযুক্তি মানুষের হাতে এসেছে- যা দিয়ে অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষকে দমিয়ে রাখা যায়, তাঁদের ইতোমধ্যে সংকটাপন্ন জীবনকে এমন শূন্য অবস্থায় নিয়ে আসা যায়, শিল্পের দর নামাতে নামাতে এমন অবনিবনার জায়গায় এনে ফেলা যায়- যেখানে তাঁরা ব্যর্থ বিপন্ন হয়ে আরেক পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন। সূক্ষ্মতা আর সৌকর্যের প্রশ্ন আসছে এখনো। আর আসছে এথিক্স বা নৈতিক সততার প্রশ্ন। কে মৌলিক, আর কে এআইয়ের যৌগ? এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্রমেই মানুষকে নিরলস সাধনার পথ থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্যের প্রধান শর্ত মৌলিক হওয়া, স্বতন্ত্র হওয়া, বিচিত্র হওয়া; সেই ব্যষ্টি থেকে কি তাকে এআই সরিয়ে ফেলছে না? অত শত শত সুকুমারবৃত্তিহীন, অগভীর চর্চাসম্বলিত অলস মানুষকে নিয়ে এরপর মানুষের সমাজ কোন গন্তব্যের দিকে চলবে? সাধনাকে পাশ কাটিয়ে আরেক আর্ট (কিংবা আর্টের মুখব্যাদান) উপস্থিত, মুখ কিংবা মুখশ্রীর বদলে মুখোশ।
বিবিসি গত নভেম্বরে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ- কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপ মোতাবেক, শতকরা পঞ্চাশভাগ ঔপন্যাসিক বিশ্বাস করেন, জেনারেটিভ এআই তাঁদের সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম। জরিপে আরো দেখা গেছে, শতকরা সাতানব্বই ভাগ ঔপন্যাসিক এআইয়ের সম্পূর্ণ উপন্যাস নামানোর ক্ষমতার বিরুদ্ধে। চল্লিশভাগ সাহিত্যিক জানান- উপন্যাস লেখাকালীন তাঁরা অন্যান্য যেসব কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন- তাতে এখনই ভাগ বসিয়েছে এআই। সময়সাপেক্ষ পাঠ দাবী করে এমন জটিল- দীর্ঘ লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ কমিয়ে দেবার জন্যও এআই দায়ী বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। শিল্পী-সাহিত্যিক সম্পর্কে পূবে-পশ্চিমে ধারণায় ফারাক আছে, পশ্চিমে এখনো জ্ঞানী-বিদ্বান-বীর-রাজা জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করেন কবি-শিল্পীর প্রতিভা (ঠিক রবীন্দ্রনাথের 'সাধারণ মেয়ে' যেমন ভেবেছিল)—ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি সেখানে জাতীয় সম্পদ। শিল্পীসত্তার ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি ভরসা থাকাটা সেখানে অত্যন্ত জরুরি। তাই এআইয়ের সর্বগ্রাসী প্রভাবকে রুখতে- শাসন করতে এঁরা সজাগ হচ্ছেন। সোসাইটি অভ অথর্স তার কনফারেন্সের বিষয় করছে- এআই জমানায় সাহিত্যিকরা কেমন করে তাঁদের শিল্পীসত্তা এবং পেশা টিকিয়ে রাখবেন। অনুবাদসাহিত্যেও এআইয়ের প্রভাব নিয়ে অনুবাদকরা বিচলিত। গত গ্রীষ্মে আমি ব্রিস্টল ট্রান্সলেটস-এ একজন সাহিত্য-অনুবাদক হিসেবে নির্বাচিত হই, আর শীতে যোগ দিই আমেরিকান লিটারারি ট্রান্সলেটরস অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্সে। ব্রিস্টল ট্রান্সলেটসে সোসাইটি অভ অথর্স এবং ড্যানিশ ট্রান্সলেটরস অ্যাসোসিয়েশন এবং ড্যানিশ অথর্স অ্যাসোসিয়েশনের প্যানেলে এআই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুনি। বিগ-টেকগুলো কপিরাইট আইনের চোখে ধুলো দিতে পারছে, প্রকাশনীগুলো এবং সম্পাদকমণ্ডলী অনুবাদসাহিত্যকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন- কদ্দূর বদলাতে সক্ষম হবেন, নির্দিষ্ট পরিসরে এআইয়ের ব্যবহার ভালো কি মন্দ- কেননা যন্ত্রানূদিত লেখা ক্ষেত্রবিশেষে পাঠের অযোগ্য ও মানুষের সম্পাদনাসাপেক্ষ, অনুবাদকের কাজ বেড়ে গেল না কমে গেল, পয়সাকড়ি তখন কীভাবে ভাগ হবে, এআইয়ের সাহায্য নিয়ে অনূদিত সাহিত্যে ঘোষণা দিয়ে রাখতে হবে, পুরোটা লেখা যাবে না- অনুবাদ করা যাবে না- তবে কি পোস্ট এডিট করা যাবে, মনুষ্য-অনুবাদকের হাতে অনুবাদের যে মিষ্টতা আর সততা- তা নিয়ে পাঠকের মাথাব্যথা থাকবে কি না- নাকি সে সুলিখিত সাবলীল অনুবাদ হলেই তুষ্ট হবে...বিবিধ প্রসঙ্গ। মোট কথা- কোনোভাবে এআই ব্যবহৃত হলে সাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রকাশক সব্বাইকে সে ব্যাপারে স্বচ্ছ হতে হবে। সাহিত্যের অনুবাদে যাঁরা এআই ব্যবহার করেন, তাঁরা কখনোই অনুবাদক হিসেবে উৎকর্ষলাভ করতে পারবেন না বলে মতামত দেয়া হয়, তবে এআইকে টুল হিসেবে ব্যবহার করলে সাহিত্যে-অনুবাদে মানুষের প্রবেশাধিকার আরো গণতান্ত্রিক হবে সেটা অস্বীকার করা যায় না। এআই নিয়ন্ত্রক আইনগুলো আদতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবার যুদ্ধ কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে বারবার। শেষ অব্দি প্রশ্ন থেকে যায়, সৃষ্টিশীলতার এই অসামান্য মানবিক (সকল অর্থে) ভুবনে আসলেই এআইয়ের দরকার আছে কি না। আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে ইওরোপ আসলে আমেরিকার চেয়ে বেশি সন্দিগ্ধ। যন্ত্র বাতলে দেয়া সাহিত্যকে আবার যন্ত্রে পুরে অনুবাদের যে ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে অদূর-ভবিষ্যৎ, এবং যন্ত্রসম্বলিত দিন বলেই বড় বিপদের দিন। "হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়।"-রবীন্দ্রনাথের সেই স্বগত প্রশ্নই যেন জগত জুড়ে আজ একটি স্বগতোক্তি হয়ে উঠছে।
আশৈশব যাঁদের আমরা ওল্ড মাস্টার বা মাস্টার পেইন্টার হিসেবে জেনেছি, যাঁরা মাস্টার আর্কিটেক্ট, কিংবা যাঁরা সর্বকালশ্রেষ্ঠ মাস্টার কম্পোজার...তাঁদের কারো তো এআই দরকার হয়নি (কম্পিউটারই তো আসবে আরো কত কাল পর)। ভাগ্যিস হয়নি। তবে তাঁরা যেমন আকরিক ঘষে চুর করে রঙ বানাতেন- এরপর চামড়ার থলেতে সেসব রঙ সংরক্ষণ করতেন- শিষ্যদের জনম জনম চলে যেতো গুরুর রঙ চুর্ণ করতে, সেসবের বদলে টিউবের রঙ আসাটা ভালো হয়নি? মনে আছে, সৈয়দ মুজতবা আলী মিনিয়েচার শিল্পীদের গল্প শুনিয়েছিলেন- প্রথম চল্লিশ বছর হাত তৈরি হবে, তারপর হাত তৈয়ার হলে চলে যাবে চোখ। কোমর থেকে পা অব্দি মাটিতে খোঁড়ল করে মাসের পর মাস বসে তাঁতী যে জামদানি বোনে আর মিলের কলে বোনা জামদানি...এক হতে পারে কি? অটোক্যাড যখন কেবল আমাদের হাতে এলো, আমাদের স্থাপত্যের শিক্ষকরা ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের হাতে আঁকা অসংখ্য ড্রয়িং-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কাজ করবার নানান টুল দরকার, চিরদিনই সেই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আজ এমন টুল উপস্থিত যে শুধু খুঁটিনাটি সাহায্য করে সন্তুষ্ট নয়, সে মাথার বিকল্প হতে চায়, হাতের বিকল্প হতে চায়...চায় বলছি, আসলে যন্ত্র তো চায় না, যন্ত্রের পেছনের মানুষই তাকে দিয়ে মানুষের মাথা-হাত-শিল্পবোধের অনন্য কাজগুলো করিয়ে নিতে চায়। আজ এআই শুধু আপনাকে কীভাবে লিখবেন দেখিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হবে না, কী লিখবেন তাও বাতলে দেবে, তারপর উপদেশ দেবে- আপনি কী ভাববেন।
এআইকে দিয়ে লেখালিখ করালে এখন মানুষ ধরতে পারছে, কারণ এআই কাজটা প্রকৃত শিল্পীর মতো ভালোভাবে করতে পারছে না। একদিন নিশ্চয়ই পারবে, একদিন অ্যানথ্রপিক আর প্রজেক্ট পানামা দুর্লভ আউট-অভ-প্রিন্ট বইগুলো গিলে খেতে খেতে আর বই গায়েব করে দিতে দিতে মস্ত জ্ঞানী-গুণী হবে, ফেডারেল জাজের সম্মতি নিয়েই হবে, কপিরাইট আইনকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দানব হবে (হয়ে গেছে কিনা জানি না), লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলস লেখককে চমকে দিয়ে লেখকেরই ভাষায় এমন কথা বলবে যা লেখকের লিখিত নয়। হয়তো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তাকে ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু, লেখালিখির সবচেয়ে আনন্দদায়ক দিকটি হচ্ছে- লেখালিখি। কীলকে খোদাই করে বা পাহাড় কুঁদে বা প্যাপিরাসে বা দিস্তা কাগজে বা স্ক্রিনের সামনে বসে লিখে যাওয়ার কাজটা। একাকী সেই অনন্ত যাত্রার যে ক্যাথারসিস, যে উচ্ছলিত বেদনা আবেগ সহমর্মিতা, যে ডোপামিন আর এনডরফিনের ফোয়ারা, তা যন্ত্রের কাছে হস্তান্তর করে শেষ অব্দি লেখক আসলে কী হতে চাইবেন?
বড় হতে হতে লোকমুখে শুনেছি- হাতের লেখা দিয়ে নাকি মানুষ চেনা যায়- সৌন্দর্যবোধ- শৃঙ্খলাবোধ, বানান দেখে চেনা যায় শিক্ষাদীক্ষা, বাক্যরীতি দেখে পরিশীলন- সাবলীলতা। তারপর হাতের লেখার যুগ বলতে গেলে উঠেই গেল, লোকে তো মেসেজ-ইমেইল-চ্যাট করে, সেখানে বানান শুধরে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। একদিন কথার ভঙ্গিতে চেনা যেতো মানুষ, কোন পংক্তি থেকে সে উঠে এসেছে...এখন এআই দিয়ে তাও করিয়ে নেয়া যায়। একদিন সাহিত্য লিখে আর পড়ে হৃদয়ে হৃদয়ে গড়ে তোলা যেতো অতুলনীয় সেতু, এটাও এআইয়ের হাতে গেলে কোথায় গিয়ে মানবিক স্পর্শ জুটবে? শুনেছি এআইয়ের মহীয়ান উচ্চাকাক্সক্ষা হচ্ছে সুপার ইন্টেলিজেন্স নির্মাণ, একদিন সে হবে স্রষ্টা আর যাঁরা যুগের পর যুগ রন্ধ্রে রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা সঞ্চয় করেছিলেন স্মৃতিপিপীলিকার মতো- তাঁরা হবেন পিরামিডস্রষ্টা শ্রমিকদের মতো নামহীন? আজ এআই বাঁদরের মতো অনুকরণ করে, একদিন সে হবে বাঁদরসম্রাট, শিল্পের পৃথিবী হবে- 'প্ল্যানেট অভ দ্য এপস'। টেড-এক্স টকসে এআই-শঙ্কুল ভবিষ্যৎকে তো এখনই ডাকা হচ্ছে অরওয়েলের ১৯৮৪। শুনেছি- এআই দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত সমস্যাবলীর সমাধান সম্ভব, মন্বন্তরকে টেক্কা দিয়ে ক্ষুধা নিরসন সম্ভব। তাই করুক না! কয়েকদিন আগে অনলাইনে একটি লেখা দেখেছিলাম- সেখানে ভারী সুন্দর করে আমার মনোবাঞ্ছা কেউ লিখে রেখে গেছেন, অবিকল মনে নেই বলে এখানে নিজের ইচ্ছেমতো লিখলাম- এআই সেইসব কাজ করুক যেসব করতে আমার সাহায্য লাগে- ঝিঙে ছিলুক, চালতা কাটুক, বঁটি দিয়ে সরু সরু করে দুধ-কদুর জন্য লাউ কুচি করুক, মশারি টাঙিয়ে দিক, ফুটো দিয়ে মশা ঢুকলে সযত্নে মেরে দিক। যা আমি নিজে ভালো পারি- কারো নাক গলাবার যেখানে দরকার নেই, সেসব লিখে দিতে- ভেবে দিতে আর এঁকে দিতে এআই যেন না আসে। কোনো একটি কবিতায় একদিন পড়েছিলাম- কবি লিখছেন, জয়দেবের ছদ্মবেশে এসে ঈশ্বর যেন তাঁর কবিতার অসমাপ্ত লাইন সম্পূর্ণ করে দিয়ে না যান। খানিকটা ওরকম।
মুশকিল হলো, যন্ত্রের বিবেক নেই, তাকে চালাবার দায় মানুষের, অর্গলবদ্ধ করবার দায় মানুষের। মোটরগাড়ি এসে একদিন ঘোড়ায় টানা গাড়িকে হটিয়ে দিয়েছিল, ঘোড়ার গাড়ি তুলনামূলকভাবে অনেক পরিবেশবান্ধব- কিন্তু মোটরগাড়ির সুবিধার সঙ্গে ঘোড়া কুলিয়ে উঠতে পারেনি। পারেনি বলেই তাকে সরে যেতে হয়েছে। কিন্তু মোটরগাড়িকে মনপসন্দ গতিতে চালালেও ভারী অসুবিধের কথা, তাই মোটরেও দরকার হয়েছে সহিস- চালক, তাকে শিখতে হয়েছে মোটরওয়ের আপদবিপদ। জলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে নদী মরুপথে ধারা হারায়- হ্রদ শুকায়, নিম্নভূমিতে প্লাবন ঘটে; আবার জলের সুনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে মুঘলদের সুবিশাল প্রাসাদগুলো দিলখুশ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত থাকত...খানিকটা ঐরকম, সিদ্ধান্ত মানুষের। "হে আমার প্রেরণা- আমার দেবী, গাও মানুষের জয়গান, মোড়ে আর মোচড়ে ভরা সেই মানুষ (জীবন)—পবিত্র- প্রকান্ড ট্রয় (নগরী) লুণ্ঠনের পর বারে বারে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে।" হোমার 'অডিসি'তে লিখেছিলেন। উৎকর্ষের অথবা বিজয়ের তুঙ্গমুহূর্তে পৌঁছলেই মানুষের যেন কী হয় প্রতিবার, হোমারের চেয়ে ভালো আর কে তা জানতেন!
Don't steal my book
অনুমতি ছাড়াই এআই বানানোর প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রকম অনুমতির ধার না ধেরে, কপিরাইট আইন না মেনে চুরি নিচ্ছে অসংখ্য বই। কপিরাইট না মেনে লেখকদের কাজ ব্যবহারের প্রতিবাদে কাজুও ইশিগুরো, ফিলিপা গ্রেগরি এবং রিচার্ড ওসমানসহ হাজার হাজার লেখক একটি এমটি বুক প্রকাশ করেছেন। 'ডোন্ট স্টিল দিস বুক' শিরোনামের এই বইটিতে প্রায় ১০,০০০ লেখক যুক্ত হয়েছেন, যেখানে বইটির একমাত্র বিষয়বস্তু হলো তাঁদের নামের একটি তালিকা। আর কিছু নেই, খালি এই বইকে বলা হয়েছে এ কারণে এমটি বুক। মার্চে লন্ডন বইমেলায় আগত দর্শকদের মধ্যে এই বইটির কপি বিতরণ করা হয়েছে। কপিরাইট আইনের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে কী ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকার একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করার ঠিক এক সপ্তাহ আগে লেখকরা এই প্রতিবাদী পদক্ষেপ নেন।