জীবনানন্দ দাশের লেখায় জলরং বৃষ্টি
জীবনানন্দ দাশের লেখায় বর্ষা ঋতু, বৃষ্টি, শ্রাবণ, মেঘ তথা জল ঘুরে ঘুরে এসেছে। খুব অল্প বয়সে লেখা, একটি কবিতার বিষয়বস্তুই তো এই 'বর্ষা'! কবিতাটি এই রকম:
'এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
পায়রাগুলো উড়ে যায় কার্নিশের দিকে এলোমেলো।
এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
ছেলেদের খেলা মাঠে মুহূর্তেই সাঙ্গ হয়ে গেল!
এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
ছিপ ফেলে বাথানের দিকে ঐ চলে যায় কেলো!
এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
জল ধ'রে গেলে মাসী, তারপর কাঁথাগুলো মেলো!
এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
গেল গেল আমসত্ব-পোড়ামুখো বৃষ্টি সব খেল!
এল-বৃষ্টি বুঝি এল-
হরির মা কতগুলো ডাঁটো আম পেল।...'
বাল্যরচনা হিসেবে কবিতাটি হয়তো দুর্বল কিন্তু কবি হঠাৎ বৃষ্টি এলে কী কী হয় তার একটি নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন।
এটা সত্যি জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত বা শীত নিয়ে যতটা অনুভবী বা স্পর্শকাতর ছিলেন, বর্ষা নিয়ে তেমনটি ছিলেন না। তবে বর্ষার যে তীব্র অভিঘাত তা জীবনানন্দের বিভিন্ন লেখায় ছড়িয়ে থাকে। যেমন 'প্রেতিনীর রূপকথা' উপন্যাস। উপন্যাসের শুরুতেই নায়ক যখন দেশের বাড়ি থেকে স্টিমারে করে কলকাতার পথে যাত্রা করে, তখন 'শ্রাবণের মেঘের সঙ্গে রাতের অন্ধকার এসে হাহাকার করে মিশছে'। অতঃপর উপন্যাসের পরতে পরতে মেঘের আনাগোনা। নায়ক সুকুমার যখন ঘর থেকে স্টিমার ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়, তখন বৃষ্টি নিয়ে মায়ের সঙ্গে সুকুমারের কথোপকথন:
তাকিয়ে দেখলাম মা এসেছে—'একটা ছাতা নিলে না?'
—'না কোনো দরকার নেই।'
—'পথে যদি বৃষ্টি হয়?'
—'না, বৃষ্টি হবে না।'
—'বৃষ্টি হবে না—তুমি কি দৈবজ্ঞ?'
মালতীর দিকে তাকিয়ে মা—'শ্রাবণ মাস, বৃষ্টি হবে না—সুকুমারের জন্য বিধাতা আকাশ শুকনো করে রেখে দেবেন।'
আমাকে বললেন—'রাজমোহনের ডাটভাঙা ছাতাটা নিয়ে যেও।'
—'আচ্ছা।'
—'সেটা রাজমোহনের ঘরেই পাবে।'
—'নিয়ে যাব।'
উপন্যাসে আমরা আরও দেখি:
'বিছানায় শুয়ে ধীরে-ধীরে ঘুম আসে; সমস্ত আকাশ মেঘে ভরে আছে; বৃষ্টি নেই তবু বাতাস আসছে, বড় আরাম।...নদীর মুখের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ, নিরবচ্ছিন্ন গভীর বাতাস, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, শরীরের ভিতরে রক্ত।'
'প্রেতিনীর রূপকথা' উপন্যাসের নায়িকা বিনতা। কেমন নায়িকা এই বিনতা? নায়কের 'গোপন সঞ্চয়ের জিনিস' বিনতা। তবে এ এক আশ্চর্য উপন্যাস। যাকে নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উপন্যাসটি লেখা হচ্ছে, সেই বিনতার দেখা উপন্যাসে নায়ক ঠিক কবার পান! ষোলো-সতেরো বছর আগে নায়ক যখন কলকাতায় বিএ পড়ত, প্রতিবেশী মেয়েটিকে 'এসকর্ট' দিয়ে পুজোর ছুটি গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি নিয়ে আসত। মেয়েটিকে ভালবেসে দুঃখ পেয়েছে একসময়, আজ মনে হয় প্রেমের চেয়ে বেশি বিমূঢ় করে, কষ্ট দেয়, বেদনা। জীবনানন্দীয় কেমেস্ট্রিতে নায়কের মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়নি কোনো দিন, একবার একটা চিঠি লিখেছিল মাত্র, উত্তর পায়নি। তো এই হলো প্রেম!
তো এই অব্যক্ত প্রেমের মধ্যে একটা পলকা সেতু হয়ে ঝুলে থাকে বৃষ্টি। বৃষ্টি না এলে, সুকুমারের সারা জীবনে হয়তো বোঝা হতো না বিনতার প্রেম। চমৎকার সেই বর্ণনা:
আরেক দিনের কথা মনে পড়ে। বিনতাদের নিয়ে কলকাতায় যাচ্ছিলাম: বর্ষাকাল তখন। রাত্রির একটা সময় ভয়ংকর ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হলো। বিছানা ছিল আমার থার্ড ক্লাশের ফ্ল্যাটে-একেবারে এক কিনারে-নদীর কাছকাছি। ক্যানভ্যাস টেনে দিতে একটু দেরি হয়েছিল, আর ক্যানভ্যাস টেনে দিলেই বা কি-দারুণ বৃষ্টিতে সমস্ত বিছানাপত্র ভিজে গেল...কাপড়চোপড় পর্যন্ত। অবশেষে একজন ভদ্রলোকের একটা টিনের স্যুটকেসের ওপর গিয়ে বসে রইলাম।
আমি যেখানে বসেছিলাম সেকেন্ড ক্লাশ কেবিন সেখানে থেকে ঢের দূরে দেখতেও পাওয়া যায় না। অত রাতে মেয়ে দুটি ঘুমিয়ে পড়েছে এই-ই তো প্রত্যাশা করবার জিনিস। সেকেন্ড ক্লাশ কেবিনে ঝড়জলে কিছু এসে যায় না, বৃষ্টিতে ঘুম জমে ভালো। বসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। এমন সময়ে কাঁধে একটা হাত পড়ল। তাকিয়ে দেখি স্টিমারের কেরানিবাবু। জিজ্ঞেস করলাম, 'কী ব্যাপার, টিকিট চেক করতে এসেছেন।'
—'আজ্ঞে না।'
—'তবে?'
ঈষৎ সন্দিগ্ধভাবে আমার দিকে তাকালেন ভদ্রলোক।
—'আমাকে দিয়ে আপনার দরকার? ভুল করছেন না তো?'
—'হ্যাঁ, আপনাকে দিয়েই আপনার নাম সুকুমার মজুমদার, না?'
—'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
ভাবলাম ট্রাফিকের আইনকানুন কিছু ভাঙলাম নাকি, অতিরিক্ত লাগেজ নিয়ে এসেছি নাকি, নাকি আফিং কোকেন চালান দিচ্ছি এই সন্দেহ এদের!
—'আপনি সেকেন্ড ক্লাশ কেবিনে যান।'
—'কেন?'
—'সেখানে আপনাকে যেতে বললেন।'
—'কে?'
—'সেকেন্ড ক্লাশ কেবিনের একটি মহিলা।'
—'ওদের বিছানাপত্র বৃষ্টিতে ভিজে গেছে নাকি?'
—'না না।'
—'কিছু অসুখবিসুখ করেছে?'
—'না-আপনি এ-রকম ভিজে গেছেন বলে আপনাকে যেতে বলেছে।'
—'ওঃ সেই কথা, কিন্তু মেয়েদের কেবিনে আমি কী করে যাব।'
—'মেয়েদের কেবিনে নয়-মেল কেবিনে চলুন।'
গিয়ে দেখলাম মেল কেবিনের একটা বেঞ্চিতে দুধের মতো সাদা ধবধবে একটা বিছানা পেতে ঠিক করছে বিনতা। আমাকে দেখেই তাড়াতাড়ি বালিশ দুটো সাজিয়ে একটা বিচিত্র মোলায়েম রাগ গুছিয়ে দিয়ে চট করে চলে গেল সে।
অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কী করে বুঝল আমার বিছানাপত্র ভিজে গেছে? কেরানিকেই-বা এত রাতে কোথায় খুঁজে পেল? নিচে গিয়েছিল? এ সুন্দর বিছানাটাও সে আমার জন্য ছেড়ে দিল, এ জন্য তার দিদি তাকে ক্ষমা করবে বলে বোধ হয় না। পাটাতনের উপরেই শতরঞ্চি পেতে আজ রাতে বোধ করি তার শয্যা?
কিন্তু তবুও নিবিড় চমৎকার ঘুমে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। ঘুমিয়ে এত শান্তি ও আশ্বাস কোনো দিনও পাইনি আর জীবনে।
আমার মনে হয়েছে 'বনলতা সেন' কবিতায় যে শান্তির কথা বলেছেন জীবনানন্দ দাশ, 'প্রেতিনীর রূপকথার' এই 'শান্তি ও আশ্বাস' তার অনুরূপ। এবং পটভূমিতে বৃষ্টি জলরঙের মতো লেপটে থাকে।
জীবনানন্দ দাশের কাছে বর্ষা এক গভীর দর্শন। যিনি জানেন, 'জলের থেকে ছিঁড়ে গিয়েও জল জোড়া লাগে আবার যেমন অতল জলে এসে' ( জল, আলো আঁধারের জার্নাল) তাঁর কাছে তো বর্ষা এক অফুরন্ত সম্ভাবনা। তাই তো লিখবেন:
'বৃষ্টির গভীর শব্দে অন্ধকারে এইখানে আমি
আগত ও অনাগত দিন যেন একটি যমজনক্ষত্রের একজন—অথবা অপরজন, ছায়ারি প্রাণের
বিচিত্র বিষয়জ্ঞানে মিলে গেছে, তবুও প্রেমের অমর সম্মতিক্রমে।'
(৪৩ নং কবিতা, আলো আঁধারের জার্নাল)
লিখবেন এমন ইতিহাসাশ্রয়ী অমোঘ পঙক্তি, 'বৃষ্টির রোলের ভিতরে বাঙালির ঘর ভেঙে ঝরে গেলে জেনিভার অমেয় প্রাসাদ গলে যায়' (৪৪ নং কবিতা, আলো আঁধারের জার্নাল)।
একজন ছাত্রর সাক্ষ্য অনুযায়ী 'হায় চিল' কবিতাটি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে বসে লেখা। জীবনানন্দ খুব একটা স্টাফ রুমে বসতেন না, অফ পিরিয়ডে লম্বা করিডরে একটা চেয়ারে একা বসে থাকতেন। ছাত্রটি কী একটা কাজে যেন সেদিন স্যারের কাছে গিয়েছিলেন। নিমগ্ন হয়ে খাতায় কিছু লিখছিলেন কবি, ছাত্রটির ডাকে ঘোর ভাঙল। স্বভাববিরুদ্ধভাবে ছাত্রটিকে বললেন, এইমাত্র একটা কবিতা লিখলাম, শুনবি! বরিশাল তো জলের দেশ, খালবিলনালার দেশ, বৃষ্টির দেশ, যেমন মার্কেসের মাকান্ডোও বৃষ্টির দেশ। মাকান্ডোতে ৪ বছর ১১ মাস ২ দিন ধরে বৃষ্টি হয়েছিল। 'হায় চিল' কবিতায় যে 'ভিজে মেঘের দুপুরের' কথা বলেন তাতে কী এক টুকরো বরিশাল লেপটে নেই! হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মধ্যে একপশলা বৃষ্টিপাত তথা অশ্রুপাতের কী ভূমিকা থাকে না!
নানা অনুষঙ্গে প্রসঙ্গে এমনকি কখনো কখনো বৃষ্টি নিজেই বিষয় হয়ে উঠেছে জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। যেমন এই কবিতাটি:
'বৃষ্টি ঝরে
রাত্রি পরে
মানুষের পৃথিবী আঁধার
ধর্মতলার দীর্ঘতাকে
নদী বলে মনে হয়...
বুদ্ধ জন্মে গিয়েছিল কবে
খ্রিস্ট প্রতিশ্রুতি
দিয়ে গিয়েছিল
ফরাসির মদিরা ও মহিলার
দেশ জন্ম নিয়েছিল
ভিলোঁ
কবে
সে সব নিষ্পন্ন হতে গিয়ে
কী করে কররোখিত হবে
পুনরায়
বৃষ্টি ঝরে
রাত্রি পরে
রাত্রি পরে...
অধিক সবুজতর হয়ে ওঠে ঘাস
মায়াবিনী রমণীর মতো খৃস্ট
মায়াবীর মতন জুদাস
রাত্রি ঝরে
বৃষ্টি ঝরে
মাঠের হাঁসের বুকে, গুগলির বুকে শব্দ করে
১৯৪২ সালে পৃথিবীর
অন্ধকার তৃপ্তির ভিতরে।'
(১০৬ নম্বর কবিতা, জ্যোতিতিমির)
আমাদের মনে পড়বে, কবিতার ১৯৪২ সময়টা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সব থেকে অস্থির সময়। ইতিহাসের সব থেকে অন্ধকার সময়ে বৃষ্টি তাই রাত্রি হয়ে ঝরে পড়ছে। কবির মনে হচ্ছে এ সময় একজন বুদ্ধ খৃস্ট ও ভিলোঁর খুব প্রয়োজন। বৃষ্টি যে সব সময় শান্তির প্রতীক হয়ে ঝরে পড়ে না, এ কথা কবি জানতেন। কবিরা দ্রষ্টা হন। তিন বছর পর, ১৯৪৫-এ হিরোশিমায় যে বোমা পড়বে, এবং তাতে মরণ বৃষ্টি হবে, তা যেন জীবনানন্দ টের পেয়ে গিয়েছিলেন। বৃষ্টি ঝরাকে রাত্রির ঝরার সঙ্গে তুলনা করছেন।
জীবনানন্দ দাশের 'রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলোতে সবগুলো ঋতু মিশে আছে। সেখানে বর্ষা বড় বেশি মরমি, নাজুক ও দরদি। মন কেমন অনুপ্রাসে এই উচ্চারণ আমাদের বুকেও বৃষ্টি ঝরায়, 'কেমন বৃষ্টি ঝরে-মধুর বৃষ্টি ঝরে-ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরে রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ' (৭ নং কবিতা, রূপসী বাংলা সংযোজন ১৯৮৪)।
'রূপসী বাংলা'র ৪৬ নং কবিতার নাম 'বৃষ্টির জল'। কবিতাটির শুরু:
'এই জল ভালো লাগে-বৃষ্টির রুপালি জল কতদিন এসে ধুয়েছে আমার দেহ-বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে তার শান্ত স্নিগ্ধ হাত রেখে খেলিয়াছে-আবেগের ভরে ঠোঁট এসে চুমো দিয়ে চ'লে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে;
এই জল ভালো লাগে-নীল পাতা মৃদু ঘাস রৌদ্রের দেশে ফিঙ্গা যেমন তার দিনগুলো ভালোবাসে-বনের ভিতরে বারবার উড়ে যায়-তেমনি গোপন প্রেমে এই জল ঝরে আমার দেহের 'পরে আমার চোখের 'পরে ধানের আবেশে...'
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বর্ষা বা বৃষ্টি বা মেঘ একটি নির্দিষ্ট রূপ ধরে আসে না। আমরা মহাপ্লাবনের কথা জানি, জানি প্রাণের জন্ম এই জল থেকে, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বৃষ্টি অক্ষর হয়ে জেগে ওঠে:
'হায়, বাতাস ও বৃষ্টি
আমার ইচ্ছা করে একটা মস্ত বড় সারসের মত ডানা মেলে
নরম সোঁদা মৃত্তিকার জরায়ু ছুঁই গিয়ে
নদীর মতন ফুলে উঠি, ঘাস হই,
চ্ছল-চ্ছল মৃত্তিকার তরঙ্গ হয়ে বাতাস ও বৃষ্টির
বাতাস ও বৃষ্টির অপরূপ যোনির ভিতর প্রবেশ করি মানুষের রক্তমাংসের অতীত সে এক নিবিড় অন্ধকারের মূলে।'
(পাণ্ডুলিপির কবিতা)
বৃষ্টির অপরূপ যোনির কথা বলেন যে কবি, তাঁকে কিছুটা হলেও বৃষ্টির দেবতা বলা যায়।
