মুজতবা আলী: ‘চোখের পানির ঝালর-ঝুলানো হাসির খাঞ্চাপোশ’
দিনটা শুক্রবার। সাল? মনে নেই। ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি। চাঁদপুরের চৌধুরী মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে হেঁটে বাসায় ফিরছি। বগা, স্টার বা ক্যাপস্টেন সিগারেটের হোলসেলার ফজলুর রহমানের বাড়ির পাশ দিয়ে গিরিজা সাহার দোকানের সামনের রাস্তা আব্বা ধরলেন না। পাল বাজারের এক পাশ দিয়ে ওটাই বাসার ফেরার ছোট পথ।
বদলে টাউন হলের দিকে যে রাস্তা চলে গেছে, সেদিকে হাঁটলেন। কেন? মনে নেই। চাঁদপুর পৌর সভার দপ্তর পার হওয়ার পর আব্বাকে গল্প শোনাচ্ছি। পাঠানদের বিচিত্র আচার-আচরণ নিয়ে। মনোযোগ দিয়ে শুনছেন আব্বা। মাঝে মাঝে হুঁ-হ্যাঁও করছেন। গল্প বলা শেষ। থামলাম। একটু চুপ করে রইলেন আব্বা। তারপর মৃদু গলায় বললেন, হ্যাঁ, সৈয়দ মুজতবা আলীর 'দেশে বিদেশে'তে এভাবেই দেওয়া আছে বর্ণনা।
সেকালে গুরুজনদের অনেকেই বলতেন, ওসব নাটক-নভেল না পড়ে বই বেশি করে পড়ো। তাহলে কাজে দেবে। বা আমার ছেলেমেয়েরা আর যা-ই করুক, বাজে নাটক-নভেল পড়েই না, গর্বের সুরে বলতেন অনেকেই। এ বাবদ আমাদের বাসা ছিল মুক্তাঙ্গন। পাঠ্য-অপাঠ্য উভয়ই বইয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হতো। মনে হয় অপাঠ্য বই পড়ায় উৎসাহ একটু বেশিই জোগানো হতো। 'যাযাবরের দৃষ্টিপাত' পড়ার সময় বমালসমেতে পাকড়াও হই খালাম্মার হাতে। তিনি সোজা হাজির হলেন আব্বার দরবারে। বইটার বিরুদ্ধে সবচয়ে বড় অভিযোগ—চারুদত্ত আধারকারের প্রেমের কাহিনি। আব্বা এখানেও মনোযোগ দিয়ে গোটা নালিশ সবিস্তারে শুনলেন। কিছু পড়ছিলেন। পুরো সময় তার থেকে মাথা তোলেননি। খালাম্মার কথা-স্রোতের ইতি হলো। আব্বা মুখ তুলে বললেন, আমিই ওকে পড়তে দিয়েছি। 'হায়রে মানুষ মজার ফানুষ দম ফুরাইলে ফুস!' এ গানের ফুস শব্দের অর্থ বুঝতে হলে সে সময়ের আমার আপন একমাত্র খালাম্মার চেহারা মনে করতে হবে।
আমাদের বাসাকে বইয়ের আস্তানা বলা যেত। গ্রন্থাগার বা পাঠাগার নয়। কারণ, যেখানে শ্রী থাকে, ছাদ থাকে। এসব কিছুই ছিল না। ছিল বই আর বই। সন্দেশের পুরোনো সংখ্যা ছিল। মাসিক মোহাম্মদী ছিল। আবার সাপ্তাহিক দেশের তাজা সংখ্যা ছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষ। শনিবারের চিঠির কয়েকটি খণ্ড। 'গীতাঞ্জলি'র প্রথম সংস্করণ কিংবা অনেক পরে শংকরের বই—প্রায় সবই ছিল। কিন্তু কেন সেখানে মুজতবা আলী ছিলেন না, আজ এতকাল পড়ে ভাবতে অবাক লাগে। গভীর দুঃখ লাগে—আমাদের সেই বইয়ের আস্তানা ধ্বংস হয়ে গেছে। নিজেদের চালচুলা নেই। হয়তো চুলা না থাকলেও ঠেলেগুঁজে চলে যায়। কিন্তু চাল, মাথার ওপর চাল থাকা এন্তার দরকার। বইয়ের কথা মনে হলে দুঃখ উগড়ে ওঠে।
হ্যাঁ, মুজতবা আলীরও দুঃখ ছিল। গভীর এক দুঃখবোধ। সে কথায় শেষে আসব। ১৯৯৭ সালের রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগে চাকরি পেলাম। সপরিবারে গেলাম তেহরান। ডা. জেকিলকে মিস্টার হাইড রূপ সেখানে দেখেছি। আজকে শুধুই ধান ভানার গান করি। ভিন্ন গীত অন্যদিন। অন্য কোনো খানে হয়তো বলা হবে। বা হবে না। সে সময় তেহরানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন সৈয়দ মোয়াজ্জম আলী। তিনি সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাতিজা। সাহিত্যপ্রেমিক। মুজতবা আলীর দুর্দান্ত প্রেমের বই শবনম প্রসঙ্গে তিনি বেশ মজার কথা শোনালেন। এই বইয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি মুজতবা আলীর জীবনচরিত কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে লেখক বলেছিলেন, বাঘে মানুষ খায়। কথা ঠিক তো? মোয়াজ্জেম আলী দ্বিমত করেননি। কথাটা ঠিক মেনে নেন। এবার মুজতবা আলী বলেন, তাহলে এই বাঘই কি এ মানুষকে খেয়েছে, তা জানার দরকার নেই। তখন আবার 'শবনম' পড়ার স্বাদ জাগল। কিন্তু তেহরানে সে বই পাব কোথায়। তখন ইন্টারনেটের রমরমা অবস্থা ছিল না। নেট ঘেঁটে পিডিএফ নামানোর চিন্তুাই করা যেত না।
সৈয়দ মুজতবা আলী (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪—১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক বহুমাত্রিক ও অনন্য প্রতিভা। লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ভ্রমণসাহিত্যিক, গবেষক ও বহুভাষাবিদ—বিভিন্ন পরিচয়ে তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। জীবনের নানা সময় বাংলাদেশ, ভারত, জার্মানি, আফগানিস্তান ও মিসরে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও লেখাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের রম্যরচনা ধারাকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন নিজস্ব ভঙ্গি, তীক্ষ্ণ রসবোধ ও অসাধারণ তথ্যবহুল গদ্যে। তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ ও হাস্যরসাত্মক লেখা আজও পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে। তার মতো দ্বিতীয় লেখকের আশায় আশায় আজও বাংলা সাহিত্যের দিন কাটে। এখনো তেমন কেউ আসেনি।
১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর সিলেটের এক খ্যাতিমান তারকাসমৃদ্ধ বাঙালি মুসলিম সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর বাবা খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন একজন ডিস্ট্রিক সাব-রেজিস্ট্রার। তাঁদের পৈতৃক পরিবার হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার উত্তরসূর গ্রামের খান্দাকার বাড়ির অধিবাসী। তার আগে নিজের বংশ ও জন্মভূমি নিয়ে সৈয়দের ব্যাটা কি বলেছেন দেখে নেই। সৈয়দ মুজতবা আলী স্মৃতি পরিষদ সূত্রে জানা যায়, বস্তুত পরিবার আমার খানদানি। আমাদের পূর্বপুরুষ শাহ সৈয়দ আহমদ মোতাওয়াক্কিল (র.)-এর দরগা এখনো তরফ পরগনার (হবিগঞ্জের প্রাচীন নাম) উত্তরসূরে আমাদের ভদ্রাসনে বিরাজিত। জাগতিক শিক্ষা-দীক্ষায় কিন্তু এ বংশের লোকেরা কম নয়; মোটামুটি দেশখ্যাত। ১৯৪৯ সালে মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনি 'দেশে বিদেশে' প্রকাশিত হয়। প্রথম বইয়ে পাঠক সমাজের মন জয় করে নেন তিনি। তাদের মনে স্থায়ী আসন গাড়েন। ১৯৫১ সালে বিয়ে করেন রাবেয়া খাতুনকে। তাঁদের দুই পুত্রসন্তান ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট সফরে যান ১৯১৯ সালে। সে সময় তাঁর সাথে কিশোর মুজতবা আলীর সাক্ষাৎ হয়। সে সাক্ষাতের বিস্তারিত বিবরণ পাইনি খুঁজে। তার গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। বলা হয়,
সিলেট সফরকাল রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁদের আকাক্সক্ষা উঁচু করার জন্য কী করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে কথা বলেন। সেই কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুজতবা আলী তাঁকে চিঠি লিখে নিজের করণীয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আসমানি রঙের খামে এসে পৌঁছাল কবির জবাব, 'আকাক্সক্ষা উচ্চ করিতে হইবে, এই কথাটির মোটামুটি অর্থ এই—স্বার্থই যেন মানুষের কাম্য না হয়। দেশের মঙ্গলের জন্য ও জনসেবার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ কামনাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তোমার পক্ষে কী করা উচিত, তা এত দূর থেকে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তোমার অন্তরের শুভেচ্ছাই তোমাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে।'
তাকে প্রথম দেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, 'ওহে ছেলে, আমি নিশ্চিত তুমি পূর্ববঙ্গের সিলেটের বাসিন্দা। কারণ, তোমার কথা থেকে তো কমলালেবুর ঘ্রাণ পাচ্ছি!' শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ মুজতবাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী পড়তে চাও? তরুণ মুজতবা একটু ইতস্তত করে বললেন, তা ঠিক জানি নে। তবে একটি জিনিস খুব ভালো করে শিখতে চাই। রবীন্দ্রনাথ তখন বললেন, নানা জিনিস শিখতে আপত্তি কী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার শিক্ষার্থীদের একজন সৈয়দ মুজতবা আলী। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে অবস্থিত শান্তিনিকেতনের সেই বিদ্যাঙ্গনে পা রাখেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত কলেজ পর্যায়ে সেখানে পড়াশোনা করেন তিনি। ২২ বছর বয়সে শেষ হয় তাঁর বিশ্বভারতী পর্ব।
শান্তিনিকেতনে এলেন, দেখলেন আর ভর্তি করে নেওয়া হলো। না। বিষয়টা তত সহজ ছিল না। 'মুসলমান হিসেবে নয়, মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে জায়গা করে নেন আপন যোগ্যতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কবিতা, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবন্ধ তাঁর মুখস্থ ছিল। তিনি ও প্রমথনাথ বিশী সুসাহিত্যিক হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের একান্ত প্রচেষ্টায়।'
শান্তিনিকেতনে মুজতবা আলীর ভর্তির বিষয়ে আনন্দবাজারে কুহেলী চক্রবর্তী ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ লিখেছেন, 'এই বিশিষ্ট মানুষটি শান্তিনিকেতনে ছাত্র হিসেবে আসেন ১৯২১ সালে। তখন মুসলিম ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে অনেক আশ্রমিকেরই আপত্তি ছিল। কিন্তু জহুরির চোখ মহামূল্যবান রত্নটিকে চিনতে ভুল করেনি। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে আশ্রমিকের তকমা জুটল তাঁর। গুরুদেবের সঙ্গে মুজতবা আলীর নিম্নোক্ত আলাপচারিতায় সেই সংকটের আভাস কিছুটা পাওয়া যায়—বলতে পারিস সেই মহাপুরুষ কবে আসবেন কাঁচি হাতে করে? আমি তো অবাক। মহাপুরুষ তো আসেন ভগবানের বাণী নিয়ে, অথবা শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম নিয়ে। কাঁচি হাতে করে?
'হাঁ হাঁ কাঁচি নিয়ে। সেই কাঁচি দিয়ে সামনের দাড়ি ছেঁটে দেবেন, পেছনের টিকি কেটে দেবেন। সব চুরমার করে একাকার করে দেবেন। হিন্দু-মুসলমান আর কত দিন আলাদা হয়ে থাকবে?'
শান্তিনিকেতনের সেই শিক্ষাজীবনেই একে একে জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, রুশ ও ইতালীয় ভাষা আয়ত্ত করেন মুজতবা। গুরুদেবের সঙ্গেও তাঁর দেখা হতো নিয়মিত—ইংরেজি ও বাংলা ক্লাসে। রবীন্দ্রনাথ নিজে পড়াতেন শেলি, কিটস আর 'বলাকা'।
ড. মার্ক কলিন্সের কাছে তিনি শেখেন ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষা। অধ্যাপক তুচ্চির কাছে ইতালীয়, আর বগ্ দানফের কাছে আরবি ও ফারসি। এমন সব গুণী শিক্ষককে শান্তিনিকেতনে একত্র করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁদের কারও ক্লাসই ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ ছিল না মুজতবা আলীর।
১৯২৭ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত কাবুলের কৃষি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। আফগান গৃহযুদ্ধই তাকে সে দেশটি ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর জার্মানিতে যান পিএইচডির জন্য। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। মুসলমান বিশ্বের নামজাদা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যায়ন করেছেন। সময়টি ছিল ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫। ভারতের বরোদায় রাজ্যে অধ্যাপনা করেন ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত। ১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন তিনি। 'বগুড়ার অধ্যক্ষ পদে থেকে বাংলা ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লিখে তিনি পাকিস্তান সরকারের রোষের মুখে পড়েন। পদত্যাগ করে দেশ ছাড়লেও তাঁর সেই সাহসিকতা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের এক নীরব কিন্তু দৃঢ় যোদ্ধা।' (সৈয়দ মুজতবা আলী স্মৃতি পরিষদ)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কলকাতার জীবন গুটিয়ে পরিবারের কাছে ঢাকায় ফিরে আসেন সৈয়দ মুজতবা আলী। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই কেটেছিল তাঁর জীবনের শেষ দুটি বছর। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে।
অত্যন্ত সুদর্শন হওয়ার পরও নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করতে বাধেনি মুজতবা আলীর। আকছার টোস্ট খেতে গেলে দুই কানে মাখন লাগে বা সাগর কলা আড়াআড়ি মুখে ঢুকাতে কষ্ট হয় না—নিজের বর্ণনা দিতে গিয়ে এমন কথা সহজেই আওড়ে গেছেন। মুজতবা আলীর মাথাজুড়ে ছিল বিশাল টাক। মাছির উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য ঘনিষ্ঠ কেউ তাকে টুপি পরার পরামর্শ দেয়। জবাবে বলেন, বরং মাথায় একটা মাকড়শার জাল একে দাও। তা হলে মাছি ভয়ে বসবে না।
মুজতবা আলীর রসবোধের পরিচয় মিলত একেবারে অপ্রস্তুত মুহূর্তেও। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক মোহম্মদ আবদুল ওয়ালী একদিন কলকাতার নামকরা একটি কলেজের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপককে নিয়ে গিয়েছিলেন আলী সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। অধ্যাপককে দেখে মুজতবা আলী প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, 'হঠাৎ এখানে এসে হাজির কেন?' এমন প্রশ্নে অধ্যাপক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। পরিস্থিতি সামলাতে ডাক্তার বললেন, 'পরিচিত হওয়ার আগ্রহে এসেছেন।'
কিন্তু আলী সাহেব কি আর এত সহজে ছাড়ার পাত্র! সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন, 'না! না! না! আসল মতলবটা হলো এই চ্যাংড়া অধ্যাপকের রিসার্চ সেন্টারে জন্তু জানোয়ারের নিশ্চয় কিছু অভাব ঘটেছে। তাই আমাকে দেখতে এসেছে।'
নিজেকে অনায়াসে জন্তু-জানোয়ার এমনকি 'খট্টাশের' সাথেও তুলনা করেছেন। তা-ও রসিকতার স্বার্থেই। শান্তিনিকেতনের নানা দর্শনীয় ব্যক্তিত্ব ও স্থাপনার মতো সৈয়দ মুজতবা আলীও একসময় দর্শনার্থীদের কাছে যেন নিজেই একটি আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলেন। একবার একদল দর্শনার্থীকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'শান্তিনিকেতনে এসেছ কী কী দেখতে? ক্ষিতিমোহনবাবুকে দেখেছ?' ওরা বলল, 'দেখেছি।' 'নন্দলাল বসুকে?'—'হ্যাঁ, দেখেছি।' 'হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে?' 'তাঁকেও দেখেছি।' সব শুনে মুজতবা আলী আর দেরি না করে বললেন, 'ও, বাঘ সিংহ সব দেখে, এখন বুঝি খট্টাশটাকে দেখতে এসেছ!'
আরেকবার পুজোর ছুটিতে একদল ভক্তের সঙ্গে কলকাতায় ফিরছিলেন মুজতবা আলী। সঙ্গী ছিলেন তাঁর সেই ব্যক্তিগত চিকিৎসকও। স্টেশনে পৌঁছে জানা গেল, ট্রেন ৪৫ মিনিট দেরিতে আসবে। সময় কাটাতে মুজতবা আলীর প্রস্তাব, চলুন রেস্তোরাঁয় গিয়ে কিছু খাওয়া যাক।
খাওয়াদাওয়া চলছে, এমন সময় হঠাৎ শোনা গেল ট্রেনের বাঁশি। দলের একজন বলে উঠলেন, 'ওই বোধ হয় ট্রেন এসেছে।' আর কী! খাবার ফেলে সবাই ছুটলেন প্ল্যাটফর্মে। গিয়ে দেখা গেল, যাত্রীবাহী ট্রেন নয়, স্টেশনে ঢুকেছে একটি মালগাড়ি।
মুজতবা আলী তখন চিকিৎসকের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, 'ডাক্তারি পরিভাষায় একে কী বলে?' ডাক্তার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। মুহূর্তের মধ্যেই আলী সাহেব নিজেই জবাব দিলেন, 'একেই বলে ফলস লেবার পেইন।'
সৈয়দ মুজতবা আলীর রসবোধ কতটা ক্ষুরধার ছিল, তার নমুনা মিলত এমন সব অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও যেখানে অন্য কেউ হলে হয়তো ঘাবড়ে যেতেন। জার্মানিতে একবার জাহাজে ভ্রমণ করছেন তিনি। সেই জাহাজেই যাচ্ছিল স্কুলছাত্রীদের একটি বনভোজনের দল।
যাত্রীদের ভিড়ে সোনালি চুল আর নীল চোখের একটি কিশোরীকে বারবার তাঁর দিকে তাকাতে দেখলেন মুজতবা আলী। ব্যাপারটা তাঁকে খানিকটা অস্বস্তিতেই ফেলেছিল। জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু আগে মেয়েটি হঠাৎ তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বেশ গম্ভীর মুখে বলল, 'আমাকে সত্যি কথা বলে যাবে হানি?'
মুজতবা আলীর বুকটা যেন ধক করে উঠল। তিনি সস্নেহে বললেন, 'বলো ছোট্ট মেয়ে, কী জানতে চাও?' মেয়েটির প্রশ্ন শুনে তিনি আরও অবাক। সে জানতে চাইল, 'তুমি চুলে কী রং লাগাও?' হেসে মুজতবা আলী বললেন, 'আমার চুল ন্যাচারালিই কালো।' কিন্তু মেয়েটি তা বিশ্বাস করল না। উল্টো অভিযোগ তুলল, 'মিথ্যুক! লুকাচ্ছ। যদি না বলো, আমি মিসকে বলে দেব যে তুমি আমার সঙ্গে ফ্লার্ট করছিলে।'
এবার সত্যিই বিপাকে পড়লেন মুজতবা আলী। তবে এমন মুহূর্তেও তাঁর মাথা ঠান্ডা। এক নিমেষে শার্টের কয়েকটি বোতাম খুলে দিয়ে বললেন, 'দেখো, আমার বুকের চুলও কালো। বুকের চুল কেউ কালার করে?'
যুক্তিটা বোধ হয় মেয়েটির মনে ধরল। সে এবার বিশ্বাস করল। বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, 'ইউ আর সো বিউটিফুল।' তারপর দৌড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল তার দলের মধ্যে।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের গুপ্তচর সন্দেহে পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছিলেন জ্ঞানী এবং চির-রসিক মুজতবা আলী। যে পাকিস্তানে তিনি তিষ্টাতে পারেননি। সে পাকিস্তানের গুপ্তচর! কি সাংঘাতিক তোহমত। যে মানুষটি হিন্দু ধর্ম ও ইসলামের মূল ভাবধারাকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন, যার প্রিয় গ্রন্থগুলোর একটি ছিল 'মহাভারত', তাঁকেই এমন সন্দেহ ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্বভাবতই, আগে থেকেই নানা হতাশায় ভারাক্রান্ত এই মানুষটির মনে সেই ঘটনা গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। তাঁর বেদনা বোধ এখানেই শেষ নয়।
মুজতবা আলীর যে দুঃখের কথা শুরুতেই বলেছি। কিন্তু বিস্তারিত জানাইনি। এবারে তা তুলে ধরছি। পঞ্চাশের দশকে 'আকাশবাণী' রেডিওতে স্টেশন ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তবে ১৯৫৭ সালে সেই চাকরিও ছেড়ে দিয়ে তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। তখন তাঁর সামনে এক নতুন অনিশ্চয়তা। স্থায়ী কোনো চাকরি নেই, বয়সও বাড়ছে। অথচ তত দিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত নাম। তাঁর বহুল আলোচিত বইগুলোর প্রায় সবই তখন প্রকাশিত হয়ে গেছে।
মুজতবা আলীর ইচ্ছা ছিল, কোনো সংবাদপত্রে সম্মানজনক বেতনে একটি চাকরি করবেন। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ পাওয়ার আশাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। অন্যদিকে বড় বড় পত্রিকাগোষ্ঠী তাঁর কাছে নিয়মিত লেখা চাইত, বিনিময়ে দিত সম্মানী। কিন্তু শুধু লেখা বিক্রি করে সম্মানীর ওপর নির্ভরশীল জীবন তাঁর পছন্দ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ।
শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। অথচ জীবনের পরিহাস দেখুন—ভাগ্যের টানে তাঁকে সেখান থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিল। আর জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য মানুষটি।
বার্ষিক সওগাত কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যে চোখের পানির ঝালর-ঝুলানো হাসির খাঞ্চাপোশ যেন অশ্রুর গড়খাই-ঘেরা দিল্খোস ফেরদৌস-এর কথা বলেছেন, তা-ই বিমূর্ত হয়ে উঠেছে মুজতবা আলীর জীবনে।
