জলবায়ু পরিবর্তন, বিপর্যয় আর শেষের সে দিন ভয়ংকর
সদ্য ঘটে যাওয়া নেপাল ট্র্যাজেডি নিয়ে ভারী চমৎকার (প্রায় লিরিক্যাল) একটি লেখা লিখেছেন ম্যানিলাবাসী ব্লগার অরূপ চ্যাটার্জি। লেখাটি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই আমার এ লেখা শুরু করব। তিনি লিখেছেন—
'পশুপতিনাথ থেকে বদ্রিনাথ, ভূমিকম্প থেকে হিমবাহ, বিমাপত্রের খতিয়ান থেকে পূত নদীধারা—এর পুরোটা নেপালের ব্যর্থতার গল্প নয়। এ হলো মানবসমাজের স্মৃতিভ্রংশের কাহিনি, এমন স্মৃতি, যা পর্বতপুঞ্জ মনে রেখেছে। নদীমালা মনে রেখেছে, হিমবাহ মনে রেখেছে, শিলাস্তরের ফাটল বা চ্যুতি মনে রেখেছে। শুধু মানুষ ভুলে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার কাছে অ্যানিভার্সারি—বার্ষিকীমাত্র। আর প্রকৃতির দিক থেকে সেই দুর্যোগের অর্থ হলো—একটি অসমাপ্ত আলাপ, অর্থাৎ সে আবার মুখ খুলবে। বছরের পর বছর আমরা গড় সংখ্যা নিয়ে আরামে থাকব—গড় বৃষ্টিপাত, গড় নদীপ্রবাহ, গড় সম্ভাবনা, গড় ক্ষয়ক্ষতি। পর্বতমালা গড়ে হিসেব করে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ গড়ের ধার ধারে না।'
আর অরূপ স্বগতোক্তির মতো করে লিখেছেন, 'শিবের তাণ্ডব আসলে ধ্বংস নয়, তাঁর মহাজাগতিক তাণ্ডবনৃত্য বরং আমাদের এটাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানবসৃষ্ট কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।...প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে যাবে। সরকার বদলাবে। প্রজেক্ট শুরু আর শেষ হবে। সাম্রাজ্যের পত্তন হবে—পতনও ঘটবে। এসবের ভিতর বাগমতী নদী পশুপতিনাথের পাশ দিয়ে অবিরাম বয়ে যাবে...নদীর আছে প্রতিদিনকার জার্নাল। পর্বতমালার আছে লেনদেনের জাবেদা খাতা। হিমবাহের আছে স্কোরকার্ড। সমস্ত প্রকৃতি হিসেবের খাতাপত্র খুলে রেখেছে। অথচ আমরা ব্যস্ত আছি প্রতিবেদন নিয়ে—ভুলে যাচ্ছি প্রকৃতির শিক্ষা। আমাদেরকে প্রকৃতি সতর্ক করে দিয়েছিল কি না প্রশ্নটা তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এবার (প্রতিবার) আমরা সতর্ক হতে মনে রাখব কি না!'
নদী-পাহাড়-অরণ্য সব্বাই স্মরণ রাখবে, আমরা রাখব তো? এই ছিল অরূপের প্রশ্ন। আমার প্রশ্ন হলো, স্মরণ রাখার আরেক শর্ত তো সেই স্মৃতির আজ্ঞাপালন করা, অর্থাৎ স্মৃতিতে যা আছে তা থেকে শিক্ষা নেয়া, মান্য করা। স্মৃতিস্মরণে গাছ-পাথর-নদী যতই আজ্ঞাবহ হোক, আমরা হচ্ছি কি? যে পাহাড়ে এক পাত্র পানির জন্য মাইলকে মাইল চড়াই-পথ ভাঙতে হতো, সেই পাহাড়ে আমরা গড়ে তুলছি একের পর এক রিসোর্ট আর হোটেল—যেখানে চাইবামাত্র ফ্লাশ করা যায়—ধারাস্নান করা যায়। ভূগর্ভস্থ জলস্তর নিয়ে কে ভাবে! চাইলেই পাহাড় কাটছি, ডিনামাইটে উড়িয়ে দিয়ে রেলপথ গড়ছি, নদীপথের পাথর সরাচ্ছি, প্রকৃতিকে ভয় করে মান্য করে যে আদিবাসীরা জীবনধারণ করে—সেই আদিবাসীদের আপন ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করছি, যেন পাহাড়পর্বতকে অমন নতুন করে গড়ে তুলবার কোনো পরিণাম নেই! যেন আগামীকাল ঠিক গতকালের মতোই রইবে, এমনটি ভাবছি। যেন পাহাড়ের এই ঢালে যে বৃষ্টিবিধৌত সমভূমি—সেই পাহাড়েরই অপর ঢালে বৃষ্টিছায় অঞ্চলে চুপটি করে পড়ে আছে বিশাল মরুভূমি...তা আমরা ভুলেই গেছি, ভুলে গেছি মেঘের ধাক্কা পাহাড়ে লাগবার জন্যই ঐ বৃষ্টি—পাহাড় না থাকলে বৃষ্টি থাকবে না, বৃষ্টি না হলে স্রেফ মরতে হবে—মরুভূমির নামে মরার ইঙ্গিতটা আছে কিন্তু। পাহাড় নিশ্চুপ, অথচ টুকটাক করে কত কিছু গোছায় ভাবতে পারেন? সানুদেশে কোথায় ঘাসের ফলন হবে, আর নিম্নভূমিতে কোথায় পুরু মাটির আস্তর পড়লে গজাবে গভীরমূল ফলজ বৃক্ষের অরণ্য। কোথায় পার্বত্য তৃণভূমি প্রয়োজন, কোথায় দরকার চা-বাগানের হিউমাসে ভরা সিক্ত মাটি, কোথায় কর্দম, কোথায় লোহা, কোথায় অ্যাসিড। কোথাও দরিয়া বইয়ে দেয়, কোথাও নোনা নিষ্ফলা মাটির রুখু চেহারা।
নেপালের হিমবাহ ধসে পড়ার ফুটেজ প্রথম দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, এও নিশ্চয়ই এআই। যখন বুঝেছেন, ওটা এআই নয়, ততক্ষণে ভয়ে গায়ে কদম ফুটেছে... 'দ্য লর্ড অভ দ্য রিংস'-এর প্রথম পর্ব 'দ্য ফেলোশিপ অভ দ্য রিংস'-এ আরওয়েনের সেই ঘোড়দৌড়ের সিকোয়েন্স মনে পড়ে যেতে পারে, লাউডওয়াটার নদীর জল ফুটছে...আরওয়েনের ঘোড়া আহত ফ্রোডো আর আরওয়েনকে নিয়ে পার হয়ে গেছে সেই যাদু-নদী। কিন্তু নাজগুলদের কালো ঘোড়ার দল সেই নদীতে পা ফেলতে গররাজি, কী যেন অমঙ্গলের আশঙ্কা ঘোড়াদের মনে, তবু আরোহী নাজগুলদের প্রবল ইচ্ছার কাছে পরাস্ত হয়ে কালো ঘোড়াদের নামতে হলো জলে...আরওয়েন কি এক যাদুমন্ত্র উচ্চারণ করলেন—আর মুহূর্তে ফোর্ড অভ ব্রুনেন ভেসে গেল ঝোড়ো নদীর তোড়ে। সেই তোড় দেখে তখন সান্ত্বনা ছিল, ওটা মুভি, বাস্তব নয়। এবার তো আমরা সান্ত্বনাহীন। মনে আছে—'দ্য টেন কমান্ডমেন্টস' এ মোজেস-রূপী চার্লটন হেস্টন দুহাত প্রসারিত করে চিৎকার করেছিলেন—'বিহোল্ড হিজ মাইটি হ্যান্ডস!!' ঈশ্বরের হাতের লীলা দ্যাখো। হও বলিলেই হইয়া যায়! আকাশে কালো মেঘের ঘূর্ণি, নিপীড়িত কোণঠাসা মানুষের বিস্ফারিত চোখের সামনে দুই ভাগ হয়ে গেল লোহিতসাগর। দুইধারে সুবিশাল জলস্তম্ভ, মাঝখানে শুকনো ডাঙা। ভীরু, জীবনপিয়াসী, বিশ্বাসী সে পথ পার হয়ে গেল, অবিশ্বাসী—মোহমদমত্ত ফারাও দম্ভভরে পার হতে গেল—ডুবে গেল। মানুষ জানল, কেউ কেউ তরে যায়, যদি তিনি তরিয়ে দেন। আহা, হৃদয়ে একটি অনির্বাণ সান্ত্বনা! কিন্তু দুর্যোগের সামনে কোনো মানুষ যে আলাদা নয়, মৃত্যু চিরদিন মরমানুষের কাছে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি। দুর্যোগের বিপরীতে মানুষ—তার লোকালয়—দেবালয়—আর তার সীমান্তরক্ষার কড়াকড়ি সবই কেমন বালখিল্য! অত প্রকাণ্ডের পাশে—অত ভয়ানকের পাশে পিপীলিকার মতো দেখায় তাকে, তেমনি তার দৌড়, তেমনি তার ভেসে যাওয়া। সেই যে অল্পবয়সে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মুখস্ত করেছিলাম 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ'—
'জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ
রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়,
বাহিরিতে চায়, দেখিতে না পায়
কোথায় কারার দ্বার...'
নির্ঝর নয়, হিমবাহের স্বপ্নভঙ্গ বুঝি এমন ভয়ংকর! জীবিত মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে প্রিয় পরিজন, থার্মাল ড্রোন দিয়ে খোঁজা হচ্ছে প্রাণের শেষ লেশ, মরদেহ জলে ভিজে এমন অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে যে কেউ শনাক্ত করার আগেই অজ্ঞাতপরিচয় লাশ হিসেবে তাদের স্থান হচ্ছে গণকবরে। কোথাও একই বাড়িতে একসঙ্গে তেইশ জনের মৃতদেহ মিলছে, কোথাও নিখোঁজ সাড়ে তিন শ স্কুলপড়ুয়া, কোথাও আস্ত গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এত ভয়ানক গর্জনে হিমবাহের ২০০০ ফুট চওড়া অংশ তার প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নেমেছিল যে প্রথম তাকে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধরে নিয়েছিল জিয়লজিক্যাল সার্ভে। ৭০০০ ফুট নিচে ঝাঁপিয়ে নেমেছে সেই বরফ-জল-পাথর-কাদার ধস, গিরিখাত তার সেই উন্মাদ গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ৬ মিনিটে পার হয়েছে ১৪ মাইল। এত বড় মানবিক দুর্ভোগে ভিডিওদর্শীরা কেউ কমেন্টে বলছে, দেখেছ, বুদ্ধমূর্তির গায়ে টোকাটাও লাগেনি। কেউ বলছে—পবিত্রগ্রন্থ পুড়িয়েছে বলে আজ এই শাস্তি। কেউ বলছে—শেষ বিচারের আগে এমনই হবে। শুনতে পেলাম, এ দুর্যোগে তিব্বতে কত মানুষ মরছে, তা নিয়ে চীন নীরব, সেন্সরশিপে চাপা পড়েছে প্রত্যক্ষদর্শী তিব্বতিদের ভিডিও ফুটেজ; তবে চীন পনেরোতম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কার্বন এমিশন ১৭% কমাবে, তাও বছর চারেক পর, এখন সে কয়লা জ্বালাতে ব্যতিব্যস্ত। বড় একা সেই কবি যিনি লিখেছিলেন—'কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা'র!'
নেপাল ট্র্যাজেডির দু'টি দিন পরের দৃশ্য একটি ভিডিওতে দেখলাম— বাঘগোত্রের প্রাণী যেমন করে গোঁফ থেকে চেটেপুটে আপন শিকারের রক্ত-মাংস-মজ্জা-মেদ মুছে ফেলে, তেমনি করে নদী- পাহাড়- অদূরে অরণ্য সেই অব্যর্থ ভাঙনের ছাপ মুছে ফেলেছে। পুরোটা মোছেনি, মস্ত খাদ রয়ে গেছে- রয়ে গেছে কর্দমের পুরু প্রলেপ। কিন্তু আশপাশের প্রকৃতি কি সুনসান, উজ্জ্বল আলোয় দোলায়িত উদ্ধত চিরহরিৎ বনের শিখর আর পাশটিতেই স্রোতস্বিনী নদী, তার যে অমন বিধ্বংসী ক্ষমতা আছে তাই তো জানার উপায় নেই অত সুশীল-স্বভাব দেখলে। জগদ্বিখ্যাত পরিবেশবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো প্রায়ই একটা কথা বলেন, সেটা তাঁর জবানীতে আমার প্রিয় উক্তি, 'প্রকৃতির রোষের প্রতি ভয় সমস্ত প্রাণীর মনে একটি স্থায়ী ভয়। এই ভয় ভালো।' এ ভয় মনে করিয়ে দেয়- পৃথিবী একমুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে। ইঁদুর-বাদুড়ও সেই সত্য জানে, সিনেমার নাজগুলদের সেই কালো ঘোড়াগুলোও জানে, প্রাণিজগৎকে থোড়াই কেয়ার করে দুলকিচালে হেঁটে যাওয়া বিগ ক্যাটসও জানে- ভয়বিহ্বল চোখে চেয়ে তারা দাবানল দেখে পালায়- ঘূর্ণিঝড় দেখে পালায়। প্রকৃতির এই দানবরূপের সঙ্গে যুঝবার ক্ষমতা এমনকি ডায়নোসর এবং আদি ম্যামথেরও ছিল না। আমরা কোনছাড়।
সুইডিশ পরিবেশবাদী কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ যা বারবার বলেছিলেন, জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেস তা বলতে বাধ্য হচ্ছেন— 'পৃথিবীর ছাদ বেঁকে ধসে পড়ছে, গ্লেসিয়ার শীর্ণ হচ্ছে, ফসিল ফুয়েল তথা জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়াবার এ যুগকে থামতেই হবে। ভয়াল পরিণতির দিকে গোটা পৃথিবীর এই ধ্বংসযাত্রা অব্যাহত থাকতে পারবে না।' হিমবাহ আর তুষার-আচ্ছাদন গলছে। রেকর্ড তাপমাত্রার অর্থই হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ হিমবাহ বিগলন। হিমালয়ের গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলো ২০১১-২০২০ সালে ভেতর অতীত কয়েক দশকের চেয়ে ৬৫% দ্রুত গলে গেছে। এসব গ্লেসিয়ার হিমায়িত জলাধার বৈ কিছু নয়; হিমালয়ান গ্লেসিয়ারগুলো উনিশটি প্রধান নদীর উৎস (ইন্দাস/সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এইসব নদীর কথা বলছি- যাদের নামের আগে 'মাননীয়া' লেখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত) তথা লক্ষকোটি মানুষের মিঠাপানির উৎস। নদী নয়, নদী-সম্প্রদায়ের উৎস এসব হিমবাহ। যেমন ইন্দাস সিস্টেমে পাঁচটি নদী (বিখ্যাত পঞ্চনদ- বিতস্তা, চন্দ্রভাগা, ইরাবতী, বিপাশা, শতদ্রু), গঙ্গা সিস্টেমে নয়টি নদী আর ব্রহ্মপুত্র সিস্টেমে তিনটে নদী। ভেবে দেখুন, হিমালয়ে হিমবাহ হাজার হাজার, যত নদীতে বাঁধ বেঁধে বা ভরাট করে আপনি আপনার স্বপ্নের শহর গড়েছেন, সেসমস্তকে নেই করে দিতে এসব উন্মত্ত বরফগলা নদীর কতক্ষণ লাগবে! শুধু কি তাই! গত ত্রিশ বছরে নেপালের এক-তৃতীয়াংশ বরফ গলেছে। এভাবে হিমবাহ নিঃশেষ হলে নদী মরবে- সমুদ্র গলাধাক্কা দিয়ে ঢুকে যাবে তার নোনাজল সমেত। গাছপালা জ্বলে যাবে, পশুপাখি নেই হয়ে যাবে, চাষের ক্ষেতে ঢুকবে নোনা বালি। কৃষিপ্রধান দেশগুলোর কী হবে? জীর্ণ-ক্ষুধার্ত মানুষের সেই সমাজে শিল্প কোন কাঁচামালের উপর ভিত্তি করে টিকে থাকবে? তারা দৌড়াবে আরো নিরাপদ ডাঙার দিকে, সীমান্ত-খণ্ডিত এই তিনভাগ স্থলে সে কোথায় গিয়ে আশ্রয় পাবে—আদি মানুষ তো তবু এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে হেঁটে পাড়ি জমাতে পারত! একদিকে বন্যা বাড়বে, অপরদিকে খরা। বাড়বে ভূ-ধস। সুপেয় পানি আর শুকনো উঁচু নিরাপদ জমিনের জন্য মানুষে মানুষে তখন কি ভয়ানক কোন্দল তৈরি হবে!
শুধু কি আর হিমালয় গলছে? গলছে গ্রীনল্যান্ড আর অ্যান্টার্কটিকার বিলিয়ন বিলিয়ন ভরের বরফ। এ বরফজল যাচ্ছে কোথায়? নদীতে আর সমুদ্রে, ফুলে ফেঁপে উঠছে পানি। তিনভাগ জলের এই সাগরসলিলা পৃথিবীতে সমুদ্রের পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, রেকর্ড ভাঙছে প্রতি বছর। পৃথিবীময় সমুদ্রসৈকত- দ্বীপমালা- নিম্ন অববাহিকা আর বদ্বীপের মানুষদের জীবনধারা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। পরবর্তী সামিট বা কনফারেন্সের জন্য অপেক্ষা করবে না প্রকৃতির এই টাইমবোমা, সে টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে আপন গতিতে, সেই গতি।
বিশ্ব জুড়ে ক্লাইমেট জাস্টিস বা জলবায়ুজনিত ন্যায়বিচারের কথা উঠছে। জলবায়ু ধ্বংসে যার হাত যত কম, দেখা যাচ্ছে পরোক্ষ প্রভাবে তার ক্ষতি তত বেশি, অথচ তাকেই বারবার ঠেলা হচ্ছে আরো বিপুল উদ্যমে জলবায়ু-পরিবর্তনের কুপ্রভাবকে কমানোর চেষ্টা চালাতে। তার অর্থবল কম, প্রযুক্তিবল কম, প্রাকৃতিক সম্পদ ইতোমধ্যে লুণ্ঠিত আর খণ্ডিত, তার মানুষ জীবিকা হারাচ্ছে, প্রাণও দিচ্ছে। অথচ যারা গরবিনী প্রথম বিশ্বের সভ্য, যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলুশন বা শিল্পবিপ্লব এনে দিয়েছে; তাদের ঘাড়েই বর্তানো উচিত গ্রিনহাউজ গ্যাস-এমিশনের দায়, দুনিয়ার কাছে তাদের দাদন শুধবার কথা, তাদের অর্থেই পুনর্নির্মিত হবার কথা জলবায়ু-পরিবর্তনে বিপর্যস্ত জনপদ। যাদের কালো হাত জলবায়ু-পরিবর্তনে প্রধানত দায়ী, তারা বরং মাঝে মাঝে জলবায়ুসংকটে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রগুলোকে কিছু তাৎক্ষণিক অথচ ছলনামূলক সমাধান বাতলে দিচ্ছে। মোদ্দা কথায় এর নাম ক্লাইমেট জাস্টিস, নামে জাস্টিস বা ন্যায়বিচার থাকলেও ব্যাপারটা মূলত একটি গভীর অন্যায়ের নাম। এই ক্লাইমেট জাস্টিসের ধাপ পাঁচটি—স্বীকৃতিমূলক, পদ্ধতিগত, বণ্টনমূলক, পুনরুজ্জীবক, রূপান্তরমূলক ন্যায়বিচার। গালভরা ওসব ন্যায়বিচারের ভিতর বর্গাচাষীর যেমন ঠাঁই আছে, ভিটেমাটিতাড়িত আদিবাসীর আছে, বিলুপ্তপ্রায় ভাষার জায়গা আছে, দিশি ধানবীজের জায়গা আছে, জলের ভোঁদড় আর জঙ্গলের শেষ পেঁচাটিরও আছে। কিন্তু সবাই তারা কাজীর গোরু, কেতাবে আছে গোয়াল ঢুঁ ঢুঁ।
দেখুন, এমন ভয়ানক দুর্যোগকালেও চীন স্বীকারই করছে না যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা উষ্ণায়নের ফলে এই হিমবাহ-ধস, সে বলে চলেছে- এটা ভূমিকম্প-পরবর্তী হিমবাহসম্প্রপাত, কেননা উষ্ণায়নে তার সুবিশাল ভূমিকা রয়েছে (পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড অর্থাৎ প্রায় ১৩ বিলিয়ন টন বাতাসে ছাড়ে চীন), এবং সেটি সংকোচনে তার তেমন আগ্রহ নেই। এই কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুতে ছাড়বার প্রতিযোগিতায় একদিকে আছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত (৫১-৫৩%), আরেকদিকে বাকি পৃথিবী। অবশ্য গত দুই শতকে সর্বোচ্চ দূষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় আটাশটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ১৭৫১ সাল থেকে প্রায় চার শ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছাড়বার জন্য দায়ী, অর্থাৎ ইহ-কার্বন ডাই-অক্সাইড দূষণের ইতিহাসের এক চতুর্থাংশ, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং চীনের চেয়ে ১৩% বেশি। এই যে ঘুরেফিরে সব অমঙ্গলকাণ্ডে পরিবেশবিরোধী- জলবায়ুবিরোধী এই বড়মামার (সুন্দরবনে বাঘের নাম নিতে নাই) নামটি উঠে আসে, আমার মাথায় বিজয়কেতন চক্রবর্তী ('মারীচ সংবাদ' নাটক, ১৯৭৩) তখন এক্কেবারে কোমর দুলিয়ে গান করেন- 'বন থেকে বেরুলো টিয়া, সোনার টোপর মাথায় দিয়া। সব জানতে পাবে টিয়ার কাছে টিয়া টিয়া টিয়া। পেট ভরে খাও কি থাকো পেটেতে কিল মারিয়া, সব জানতে পাবে টিয়ার কাছে টিয়া টিয়া টিয়া।' যাক সে দুঃখের কথা। নেপালে ভয়াবহ ভূ-ধস ও হিমবাহোচ্ছ্বাসের পর লাদাখের বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক একটি মোম জ্বালিয়ে হাতে নিয়ে স্মরণ করেছেন উপদ্রুত এলাকার মানুষদের, আর একটি চমৎকার কথা বলেছেন, যা ক্লাইমেট জাস্টিসের কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—'প্লিজ লিভ সিম্পলি ইন দ্য বিগ সিটিস সো দ্যাট উই ইন দ্য মাউন্টেনস মে সিম্পলি লিভ।' বড় বড় শহরে একটু সাধারণভাবে বাঁচুন, যেন আমরা পাহাড়ি সাধারণ মানুষরা অন্তত বেঁচে থাকি।
এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স বা ইপিআইয়ে কে কোথায়! কার কার্বন ফুটপ্রিন্ট কত? কে লো-কার্বন ইকোনমিতে চাইলেই যেতে পারে কিন্তু ধনাঢ্য তেলকুবেরদের বন্ধুতা তার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ? ক্লিন এনার্জি বা রিনিউয়েবল এনার্জি সর্বত্র চালু করতে যে প্রযুক্তি বা অর্থ প্রয়োজন, তা যাদের হাতে, তাদের সদিচ্ছা কতটুকু? জীববৈচিত্র আর বাস্তুরক্ষা সূচকে কে কত নিচে? পাহাড়-পর্বত- নদী-সমুদ্র ড্রিল করে কারা শেষ জীবাশ্ম-জ্বালানির সঞ্চয় গিলে খেতে বদ্ধপরিকর? কারা পৃথিবী দোহন করে শস্য ফলিয়ে আবার উদ্বৃত্ত শস্য সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়? আসুন জিজ্ঞেস করি, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জগুলোতে সচেতন মানুষ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট তৈরি করছে সৈকতে, যেন তলিয়ে না যায় তাদের আদরনীয়া মাতৃভূমি... সেই প্রথম বিশ্বের সে বা তারা এই মানুষগুলোর জন্য সে রকম কিছু করল কি? অনেক প্রশ্ন আমাদের সামনে। 'প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা!'
তবে যে যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেরটুকু নিজে করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কী কী বন্ধ করতে পারি? শাওয়ার ছেড়ে অবিরাম ধারাস্নানটা। এক সিজনে লাউ ফলাব বলে চিরহরিৎ গাছ কেটে ফেলাটা। মাংস-মাংস করে অস্থির হওয়াটা। প্লাস্টিকের থালা-গ্লাস-চামচ একবার ব্যবহার করেই পিকনিকে ফেলে আসাটা। প্যাকেজিং-এ অনাবশ্যক প্লাস্টিক ব্যবহার করাটা। বন্য প্রাণী দেখলেই পটাস পটাস করে মেরে ফেলাটা। যেখানে হেঁটে যাওয়া যায়, সেখানে গাড়ি চড়াটা। পুকুর-নদী-খালবিল ভরাট করাটা। আর জলবায়ু-বিপর্যয় ভবিষ্যতে আসবে ভাবাটা। এসব বন্ধ করার বিকল্প নেই! যে ঠাকুরগাঁওয়ের খোরশেদ আলী- কেরানীগঞ্জের তাজ-উল ইসলাম- নওগাঁর গৌতম সাহা এবং আরিফ সরদার তালবীজ সংগ্রহ করে হাজার হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন, সেইসব ক্ষুদ্রকৃষক- পুঁজিহীন দাতা আর গ্রাম্য শিক্ষকরাই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্লাইমেট চেঞ্জ হিরো। গেলাসের ঝুটা পানিটা সিংকে ফেলে না দিয়ে এক গৃহবধূ বালতিতে জমাতেন, সেই জলে ঘর মোছা হবে, বাগানের সেচ হবে... লোকে ডাকত- কঞ্জুস, মক্ষিচুষ! তিনি আরেক ক্লাইমেট চেঞ্জ হিরো। আমরা মাল্টি-স্টারার চলচ্চিত্রে ডুবে আছি, যেখানে দৈনন্দিন জীবনেই নায়কের অন্ত নেই। শহরের প্রতিটি ছাদবাগান করা মানুষ, প্রতিটি ব্যালকনিতে লতাবিতান রচনা করা মানুষ আমাদের হিরো। সাইকেলভ্যানে করে ময়লা আবর্জনা আর প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে আসা ক্ষুদে কিশোররা আমাদের মস্ত বড় হিরো। দিশি শস্য আর ফলের বীজ সংরক্ষণ করা কৃষাণী আমাদের হিরো। জলাশয়- বনভূমি- তৃণভূমি এমনকি বাদা জমিনের বাস্তু রক্ষায় দাঁড়িয়ে যাওয়া মানুষ আমাদের হিরো। একা হাতে অরণ্যানী পত্তন করা যাদব পায়েং আমাদের হিরো। ইকুয়েডরের আমাজনের রেইনফরেস্টে তেলকূপ খুঁড়তে না দেয়া নেয়ন্তে নেনিমো আমাদের হিরো। ড্যানিউবে বাঁধ নির্মাণে বাধা দেয়া পরিবেশকর্মী আমাদের হিরো। মানুষকে ধৈর্য ধরে মিয়াওয়াকি ফরেস্ট তৈরি আর সিড-বম্বিং শেখানো পরিবেশবিদরা আমাদের হিরো। বাঙালিরা তো স্বভাববশতই অনেক চমৎকার রিসাইক্লিং-এ অভ্যস্ত, তাদের লক্ষ্মীমন্ত ঘরে ফেলনা কিছুই নয়, ওভারকনজাম্পশন কখনোই তাদের বদভ্যাস ছিল না, সিলভোপাস্তুর কিংবা পার্মাকালচার লব্জ বুলি হয়ে উঠবার অনেক আগ থেকেই তো তারা ওসব চর্চা করে। এত সুন্দর এ পৃথিবী, এত উপাদেয়... আর এত সূক্ষ্ণ সব জালে জড়ানো এই পরস্পর নির্ভরশীল বাস্তু, এই গ্রহটি ছাড়া আজো আমাদের আর কোনো বাড়ি নেই। বাড়ি বদলে যায়, যাচ্ছে। চলুন এই আপন নিবাসটির স্বার্থে আমরা সব্বাই ক্লাইমেট চেঞ্জ হিরো হয়ে উঠি।