আগামী সপ্তাহে ঢাকাসহ ১৫ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে: আইইডিসিআর
চলতি মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
আইইডিসিআরের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী—এই ১৫ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে।
আইইডিসিআরের জলবায়ুভিত্তিক আগাম সতর্কতা ও সাড়াদান ব্যবস্থা বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নরসিংদী, যশোর, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও রাজশাহীর পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে।
পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় আইইডিসিআর বলেছে, ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি চাপ এখনো ঢাকায়। তবে খুলনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ডেঙ্গুর সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা এখন এপিডেমিওলজিক্যাল বছরের ৩৬তম সপ্তাহে আছি। ৩৬ থেকে ৩৯তম সপ্তাহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তা জানতে আমরা ব্যাক-এন্ড মডেলিং করেছি। এখন পর্যন্ত এই মডেল প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সঠিক পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে।"
তিনি বলেন, আগের সময়ের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আর্দ্রতা এবং সামনের দিনের জলবায়ু পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে এই মডেল তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোথায় কতসংখ্যক রোগী হতে পারে এবং কোন কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
ডা. জাকী বলেন, "এটি নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং সম্ভাব্য পরিস্থিতির একটি বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, যা স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে।"
ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৬১ জন।
এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জনে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মাত্র পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। জুনে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জনে।
আর সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ বছর ডেঙ্গুতে ডেনভি-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর ডেনভি-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল। তবে ২০২৬ সালে হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতে ডেনভি-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।
আইইডিসিআরের 'ডেঙ্গু সেরোটাইপ সার্ভেইল্যান্স ইন বাংলাদেশ, ২০২৩–২০২৬' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে নয়টি হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৯৭টি এনএস১ পজিটিভ নমুনার মধ্যে ৭১টির সেরোটাইপ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় ডেনভি-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেনভি-২ শনাক্ত হয়েছে।
ঢাকায় ডেনভি-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য পাওয়া গেলেও ঢাকার বাইরে ডেনভি-২ শনাক্ত হয়েছে। আইইডিসিআর বলছে, বান্দরবান ও বরগুনায় পরীক্ষা করা সব নমুনাতেই ডেনভি-২ সেরোটাইপ পাওয়া গেছে।
রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪। কোনো ব্যক্তি একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সাধারণত সেই নির্দিষ্ট সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। তবে বাকি সেরোটাইপগুলোতে পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় আক্রান্ত হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানান আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী।
তিনি বলেন, "একজন ডেঙ্গু রোগী আগে এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে প্লাজমা লিকেজসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।"
ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে জ্বর শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ডা. জাকী। তিনি বলেন, প্রয়োজনে এনএস১ পরীক্ষা করে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করতে হবে এবং ফল পজিটিভ হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক রোগী সাত থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করে হাসপাতালে আসেন। তখন তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে শকের পর্যায়ে চলে যান।
ডেঙ্গু আর শুধু শহরের রোগ নয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এবার ডেঙ্গু আর শুধু ঢাকার রোগ নয়। এডিস মশা এখন জেলা, উপজেলা, এমনকি অনেক গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।"
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় সমস্যা হলো প্রমাণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করা।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, "যেখানে এডিস মশা জন্মাচ্ছে, সেখানে যদি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমই না পৌঁছায়, তাহলে শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।"
