প্রাণী প্রেমী শরীফ খান এবং এক আহত সবুজ ঘুঘুর গল্প
বলতে গেলে জন্ম লগ্ন থেকেই বন জঙ্গল আর বন্যপ্রাণীর প্রতি এক দুর্বার আকর্ষণ জন্ম নিয়েছিল মনে। যখন খুব ছোট ছিলাম বাবা শিকারে বের হলে তার পেছনে পেছনে ছুটতাম। তিনি শিকারের উপর গুলি করার পর সবসময় খালি কার্তুজটি আমার দিকে এগিয়ে দিতেন। সদ্য ফোটা কার্তুজে লেগে থাকা বারুদের গন্ধ আমাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেত, ওটাই ছিল আমার প্রথম প্রেম।
শৈশব ছেড়ে কৈশোরে পদার্পন করার পর বাবা নিজ হাতে আমাকে বন্দুক চালানো শিখিয়ে দিলেন। এরপর থেকে শুরু হলো আমার রোমাঞ্চকর এক জীবন। বন্দুক হাতে ছুটেছি জঙ্গল থেকে জঙ্গলে। যতবার জঙ্গলে গিয়েছি অরণ্যভূমি আমাকে আরো দৃঢভাবে আকর্ষণ করেছে। অরণ্য বন্যপ্রাণী আর বনের বাসিন্দাদের নিয়ে কাটতো আমার বেশিরভাগ সময়। গভীর আগ্রহ, কৌতুহল আর ভালোবাসা নিয়ে সেই আরণ্যক পৃথিবীতে নিয়ত বিচরণ ছিল আমার।
এরপর অনেকদিন পেরিয়ে গেল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম মানুষ যেমন প্রকৃতির সন্তান বন্যপ্রাণীরাও তেমনি প্রকৃতির সন্তান। এদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। মনের মধ্যে এ ধরনের ধারণা জন্ম নেওয়ার পর শিকারের মধ্যে আর আগের মত উৎসাহ কিংবা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এর মধ্যেই আবার এক বন বিড়ালের সঙ্গে ভীষণ ভালোবাসা হয়ে গেল আমার। তারপর এক সময় শিকার করা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বন আর বন্যপ্রাণীর নেশা আমাকে একবিন্দু ছাড় দিল না, ওরা আগের মতই রয়ে গেল হৃদয় জুড়ে। আর এই সূত্র ধরেই আমার পরিচয় ঘটে দেশের খ্যাতনামা পক্ষী বিশারদ জনাব শরীফ খানের সঙ্গে। তবে শুধু পাখি নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণী সম্পর্ক তার গভীর জ্ঞান ছিল। আসলে মানুষটির কাছ থেকে আমি প্রথম বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বাণী শুনতে পেয়েছিলাম। তার কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম বন্যপ্রাণী শিকার করার কিংবা খাওয়ার জিনিস নয়, তারা প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা ভালো না থাকলে পৃথিবীও ভালো থাকবে না। আর বন্যপ্রাণী ছাড়া পৃথিবীতে মানুষের বেশিদিন টিকে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। এত সব গভীর বিষয় আমার জানা ছিল না। চোখের সামনে যেন একটা নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো। তিনি সবসময় বলতেন,'হত্যা করে নয়, তুমি সত্যিকারের ভালোবাসার আনন্দ পাবে ওদের রক্ষা করে।" কি চমৎকার কথা বলেছিলেন তিনি!
এই মানুষটির সঙ্গে অনেক স্মৃতি আমার। ওনার সঙ্গে কত জায়গায় যে গেছি বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে, তার কোন হিসাব নেই। ফিল্ডে গেলে তিনি যেন এক সতর্ক বাঘের মতো আচরণ করতেন। প্রকৃতির প্রতিটি শব্দ তিনি গভীরভাবে অনুভব করতেন। কোথায় কোন পাখি ডাকছে, কোথায় পাতার শব্দ হল, কোনটা সাপের চলাচলের আওয়াজ; এসব বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ছিল তার।
একবার আমরা পাখির ছবি তোলার জন্য গেলাম নরসিংদীর চরসিন্দুরের শীতলক্ষার চরে। এই চরের নাম মাঝের চর কিংবা ভবেরচর, দেখতে অনেকটা দ্বীপের মত, লম্বায় প্রায় দুই কিলোমিটার, চারদিক ঘিরে রেখেছে নদী। চরের অর্ধেক জুড়ে রয়েছে গাছপালা আর বাকি অর্ধেক বালুচর।
এখন শীতকাল, আর এই সময়টাতে এখানে আসে নানা জাতের পরিযায়ী বুনোহাঁস। আমরা অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই বিরল ধূসর রাজ হাঁসের দেখা পেয়ে গেলাম। ভাগ্য ভালো, সুন্দর কিছু ছবিও ক্যামেরাবন্দি করা গেল। গভীর আনন্দে ভরে গেল আমাদের মন। এরপর আরো কিছু পাখির ছবি ক্যামেরাবন্দি করে আমরা যখন চরের ঝোপ-জঙ্গল গুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম-ঠিক তখন শরীফ খান কেমন যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন, এরপরই একটি ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি তার এই আচরণে কিছুটা অবাক হলেও, এটা বুঝতে পারছিলাম নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে! কিছুক্ষণ পর তিনি যখন ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলেন, দেখলাম তার হাতে একটি সবুজ রঙের পাখি। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,'পাখিটিকে উড়ে এসে ঝোপের ভিতর পড়ে যেতে দেখেই আমি বুঝতে পারছিলাম, সে মারাত্মকভাবে আহত।'
আমি দেখতে পেলাম-পাখিটির একটি পা নাই, খুব সম্ভবত ইয়ারগানধারী কোন শিকারির কাজ। পাখিটাকে ভালোমতো পরীক্ষা করে আমরা বুঝতে পারলাম এটা আসলে একটা সবুজ ঘুঘু, অনেকে যাকে পান্না ঘুঘু নামেও ডাকে। কারণ তার ডানা দুটো পান্নাসবুজ। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় Emerald Dove/Green Winged Pigeon. আহত পাখিটির বয়স হবে খুব বেশি হলে এক মাস, সবেমাত্র উড়তে শিখেছে। পাখিটির পা থেকে ক্রমাগত রক্ত পড়ছিল।
বন্যপ্রাণী নয় সকল প্রাণীর জন্য তার ভীষণ মমতা ছিল। আহত ঘুঘুটির বিষয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বললেন,'যেভাবেই হোক এই অসাধারণ সুন্দর পাখিটিকে বাঁচাতে হবে। প্রকৃতিতে ওদের সংখ্যা খুবই বিরল। আর এরা বেশ লাজুক স্বভাবের পাখি, সহজে যার দেখা পাওয়া যায় না। দেশের বহু অঞ্চল থেকে এই পাখি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। একে বাঁচাতেই হবে, এখানে ফেলে রেখে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু ঘটবে তার।' এদিকে পাখিটির পা থেকে ক্রমাগত রক্ত ঝড় ছিল। আমি ব্যাগ থেকে এক টুকরো কাপড় বের করে তার আহত পায়ে জড়িয়ে দিলাম। তারপর আমরা পাখিটিকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। শরীফ খান বললেন,'পাখিটিকে চিকিৎসার জন্য চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।' এই ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় পঁচিশ বছর আগে, ৩০-১২-২০০১ ইং তারিখে। তখন বন বিভাগে আহত বন্যপ্রাণীদের চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ছিল না, চিড়িয়াখানাই ছিল একমাত্র ভরসা।
পরদিন সকালে আহত সবুজ ঘুঘটিকে নিয়ে আমরা ঢাকা চিড়িয়াখানায় গেলাম। পাখিটিকে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার কথা জেনে তারা খুশি হলেন। তারপর আহত ঘুঘটিকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, আমরাও সেখানে গেলাম। ভেটেনারি ডাক্তার আহত পাখিটিকে ভালো করে পরীক্ষা করে ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিলেন। তারপর তাকে একটি সুন্দর খাচায় ভরে রাখা হলো। চিড়িয়াখানায় তখন দুই জোড়া সবুজ ঘুঘু ছিল। কিউরেটর সাহেব আমাদের বললেন,'এই আহত সবুজ ঘুঘুটি সুস্থ হয়ে উঠলে, তাকে অন্যদের সঙ্গে থাকতে দেওয়া হবে।" চিড়িয়াখানার সেই নতুন অতিথিকে নিয়ে সবাই কিছুক্ষণের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ পাখিটির জীবন রক্ষার জন্য আমাদেরকে অনেক ধন্যবাদ দিলেন। এবং উপহার হিসেবে সুন্দর একটি দানপত্র লিখে দিলেন। সেই সম্মাননা আজও আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আজও আমার যতবার সেই আহত সবুজ ঘুঘুর কথা মনে হয়, ততবারই কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে প্রাণী প্রেমী শরীফ খানের প্রতি। তিনি এখনো ভালো আছেন, গ্রামের বাড়িতে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তবে এখনো হাজার পাখির হাজার গানে তার ঘুম ভাঙ্গে।