কোকিল কেন ডাকে?
বিগত ফাল্গুনের তিন তারিখ ভোরে মোবাইল ফোনে আমার কথা হচ্ছিল রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একজন পাঠিকার সঙ্গে। অপর প্রান্ত থেকে নারীর কণ্ঠের পাশাপাশি একটি পাখির ডাক ভেসে আসছিল। কথার ফাঁকে পাঠিকাটি বলে উঠলো, 'ভাই, আপনি তো প্রকৃতি বিলাসী মানুষ, শুনতে পাচ্ছেন কোকিল ডাকছে, অর্থাৎ বসন্ত এসে গেছে।'
আমি মহিলার কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম, একইসঙ্গে কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম পাখিটির প্রতি। কারণ এই ইট পাথরের শহরের মানুষগুলো বড়ই দুর্ভাগা। এখানে ফুল ফোটে না, শীত শেষে সবুজ শোভিত কচি পাতার বাহার দেখার সুযোগ নেই এখানে। ধূলিকণাময় এই নগরের বিষাক্ত বাতাসের সীসা আর কার্বনের প্রভাবে বাসন্তী বাতাস এখানে কল্পনার অতীত। তবুও ফুল ফুটুক আর না ফুটুক, বাসন্তী বাতাস আসুক আর না আসুক, কোকিল ডাকলেই নগরের মানুষেরা বুঝতে পারে বসন্ত আর দূরে নয়।
সুতরাং সকল নাগরিকের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বসন্তের এই প্রতিনিধির প্রতি। আমি ওই মহিলার কাছে আরও জানতে পারলাম ঢাকা শহরের অনেক জায়গায়ই এখন কোকিলের ডাক শুনতে পাওয়া যায়। বিষয়টা খুবই আশাব্যঞ্জক।
কোকিল বলতে মানুষের চোখের সামনে কালো একটি পাখির ছবি ভেসে ওঠে। বসন্তের শুরুতেই তার কুহু কুহু কলতানে প্রকৃতি মুখর হয়ে ওঠে। এই সময়টাতে কেন অস্থির হয়ে ওঠে গায়ক পাখিটি? কেন সুরে সুরে মাতিয়ে রাখে প্রকৃতিকে?
আসলে বসন্তের প্রথম দিকেই ওদের প্রজনন ঋতু শুরু হয়ে যায়। স্ত্রী পাখিটিকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ পাখিটি সুরে সুরে নানা রকম চেষ্টা চালিয়ে যায়। তবে তার সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে শুধু মেয়ে কোকিল নয়, যুগে যুগে আকৃষ্ট হয়েছেন বহু গীতিকার,লেখক আর কবি।
কেউ গেয়েছেন, 'কোকিলা কালো বলে গান শোনে না কে?' কেউ লিখেছেন, 'আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেল রে মরার কোকিলে।' আবার কেউ বলেছেন, 'কোকিল রে তুই দেখতে কালা, তোর মনে কে দিল জ্বালা?'
শুধু তাই নয়, নানাভাবে কোকিলের প্রশংসায় মানুষ পঞ্চমুখ। কোনো নারী সুন্দর কথা বললে কিংবা সংগীত পরিবেশন করলে, তাকে সম্মানিত করা হয় 'কোকিলকণ্ঠী' উপাধি দিয়ে।
তবে বসন্তের বাসন্তি বাতাসে ভেসে আসা কোকিলের 'কুহুতান' শুধুমাত্র প্রণয় সংগীত নয়, এ হচ্ছে এক ধরনের 'টেরিটোরিয়াল অ্যালার্ম', যার মাধ্যমে অন্য পুরুষ পাখিকে সতর্ক করা হয়। আর সতর্ক সংকেত অগ্রাহ্য করে কেউ অন্যের সীমানায় প্রবেশ করলে দুই পুরুষ কোকিলের লড়াই বেঁধে যায়। তখন প্রকৃতিজুড়ে তীব্র-তীক্ষ্ণ কিউউউ-কিউউউ শব্দ ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে কোকিল নিয়ে এক বিশেষ বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন কোকিল মানেই পাতিকাকের আকৃতির একটি কুচকুচে কালো পাখি। যার চোখ দুটো টকটকে লাল। আসলে যে কুচকুচে কালো নয়,কাছে গিয়ে দেখা যাবে নীলচে কালো। অর্থাৎ, কালো কোকিলটি হচ্ছে পুরুষ কোকিল। স্ত্রী কোকিল কিন্তু দেখতে সম্পূর্ণ অন্যরকম। এদের গায়ের রং বাদামী। পিঠের দিকে সাদা ফোঁটা ফোঁটা দাগ রয়েছে। বুকে পেটে রয়েছে কালো ডোরাকাটা দাগ। আর সবচেয়ে সুন্দর তার লম্বা লেজের ডোরাকাটা দাগগুলো। এদের ঠোঁট সবুজ।
স্ত্রী কোকিল আত্মগোপনকারী পাখি, সহজে তার দেখা পাওয়া যায় না। পুরুষের মতো এত ঘন ঘন ডাকাডাকিও করে না, কেবলমাত্র উত্তেজিত হলে কিক কিক শব্দে ডেকে ওঠে।
কোকিল বাসা পরজীবী পাখি। অর্থাৎ, নিজে বাসা তৈরি করতে পারে না। কৌশলে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে থাকে। এক্ষেত্রে স্ত্রী কোকিল প্রথমে বাসা থেকে কাকের ডিম ফেলে দেয়। কাক কোকিলের ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। একেবারে নিজের বাচ্চার মতই তাকে আদর যত্ন করে বড় করে তুলতে থাকে। কিন্তু এক সময় সে বুঝতে পারে আসলে এগুলো কোকিলের ছানা।
বাংলাদেশে শুধু কালো কোকিল নয়, কোকিল পরিবারের প্রায় ২০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এদের মধ্যে ১৬ জাতের পাখি অন্যের বাসায় ডিম পাড়ে, অর্থাৎ তারা নিজেরা বাসা বানাতে অক্ষম। আর বাকি দুই প্রজাতি নিজেরাই নিজেদের বাসা তৈরি করে তাতে ডিম পাড়ে। এরা হচ্ছে সবুজ মালকোয়া এবং মেটে মালকোয়া।
অন্যান্য বন্য প্রাণীর মতো কোকিলের সঙ্গেও আমার বহু স্মৃতি জড়িত। ছোটবেলায় উঠানের আম গাছে কোকিল ডাকলে, অন্য শিশুদের মতো আমিও তার অনুকরণে কুহু কুহু বলে ডেকে উঠতাম। তখন মা বলতেন, 'এই ডাক বন্ধ কর, নাইলে তোর চোখ উঠবে।'
আসলে তখন সবাই বিশ্বাস করত কোকিলের ডাক অনুকরণ করলে মানুষের চোখ কোকিলের মতো টকটকে লাল হয়ে যায়।
আমাদের বাড়ির পাশের বটগাছে যখন ফল আসতো, সেখানে তখন সারাদিন পাহাড়ি ময়না থেকে শুরু করে কতো জাতের পাখি যে আসতো তার কোনো হিসেব ছিল না। কীটপতঙ্গের পাশাপাশি নরম ফল কোকিলের খুব প্রিয়। আমি সেখানে যেতাম হরিয়াল শিকারের জন্য। স্ত্রী আর পুরুষ কোকিল সারাদিন ডাকাডাকি করে বটগাছের মাথা মাতিয়ে রাখত।
মাঝেমধ্যে গাছের নিচে গুলতি নিয়ে হাজির হত বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। কোকিলের মাংস ছিল ওদের খুব প্রিয়। কোকিলকে ওরা ডাকতো 'কুলি' বলে। কোকিল ভীষণ সতর্ক পাখি। কুহু কুহু কিংবা কিক কিক শব্দ ছাড়াও ওরা বিভিন্ন স্বরে ডাকতে পারে। বট গাছের নিচে শিকারিদের উপস্থিতি টের পেলে ওরা বিচিত্র শব্দে ডাকাডাকি শুরু করতো। আর তাতে অন্যান্য পাখিরা সতর্ক হয়ে যেত, কেউ কেউ উড়ে পালাতো। তাই শিকারি জীবনের সেই অবোধ সময়ে কোকিল মোটেও আমার পছন্দের পাখি ছিল না।
যদিও এখনো রাজধানীর অনেক জায়গায় বসন্তকালে কোকিলের ডাক শুনতে পাওয়া যায়। তবু সারা দেশের কোকিলরা কিন্তু মোটেও ভালো নেই। ক্রমাগত বৃক্ষ নিধনের ফলে খাদ্য এবং আশ্রয় স্থলের সংকট।
আরেকটা বিষয় রয়েছে যেটা একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে ধরা পড়ে। কোকিলের ডিম পাড়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল কাকের বাসা। বিগত ২ দশকে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে মারাত্মকভাবে কমে গেছে কাক। তারও একটা বিশেষ প্রভাব পড়েছে কোকিলের প্রজনন জগতে।
