ক্রেতাদের চাপ, বিদ্যুতের খরচ কমানো: সৌরবিদ্যুতে ঝুঁকছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ একসময় প্রধানত বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন ছোট কারখানাগুলোও ধীরে ধীরে ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ (রুফটপ সোলার) অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে।
মোটা অঙ্কের প্রাথমিক ব্যয়, ব্যাংকঋণের অপ্রাপ্যতা ও উপকরণ আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক বহাল থাকার পরও রপ্তানিমুখী ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মূল কারণ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় কমানো। ইউরোপসহ উন্নত ক্রেতা দেশগুলোতে পোশাক, খাদ্যসহ অন্যান্য রপ্তানির বাজার ধরে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে এবং প্রস্তুতির জন্য হাতে সময় বেশি নেই—এ কঠোর বার্তা যত স্পষ্ট হচ্ছে, ততই গতি পাচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগ।
সেইসঙ্গে বৈশ্বিক বা স্থানীয় কারণে জ্বালানি বিভ্রাট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ও বিদ্যুৎ ব্যয় কমার সুফলও উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করছে।
তবে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তের ঋণ প্রাপ্তির পাশাপাশি সোলার পণ্যের শুল্ক কমালে আরো অনেকে এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তা ও গবেষকরা।
সবুজ রূপান্তরে এগিয়ে আসছে ছোট কারখানাগুলো
নারায়ণগঞ্জের ছোট আকারের কারখানা ফতুল্লাহ অ্যাপারেলসে শ্রমিক সংখ্যা মাত্র ৫০০। কারখানাটি চার বছর আগে সৌরবিদ্যুতে ৫৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, বিনিয়োগের এই টাকা উঠে আসতে আট বছর সময় লাগবে।
তবে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই কারখানাটি বিনিয়োগের পুরো টাকা তুলে আনার পথে রয়েছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) কারখানার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তারা এখন বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
ফতুল্লাহ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির ৯০ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো।
'ইউরোপ সাপ্লাই চেইনে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের জন্য বেশ কিছু নিয়ম-নীতি এনেছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন হবে। এজন্য রপ্তানি ধরে রাখতে তাদের নিয়ম অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে যাওয়ার বিকল্প নেই,' বলেন তিনি
বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম আরও বলেন, বর্তমানে তার কারখানায় যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, তার ২৫ শতাংশের জোগান দেয় সৌরবিদ্যুৎ। 'আগামী বছরের মধ্যে আমার বিদ্যুৎ চাহিদার শতভাগ সোলার থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।'
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে শুরুতে বড় বিনিয়োগ করতে হয়, সত্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ হিসাব করলে প্রথাগত জ্বালানি-নির্ভর বিদ্যুতে যে বিল আসে, সে তুলনায় কম বিল আসে।
প্রায় ৬৫০ শ্রমিক নিয়ে পরিচালিত শান্তির নীড় সোয়েটার্স লিমিটেড নামের আরেকটি ছোট রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাও তাদের ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ম্যানেজার আবদুর রউফ জানান, আগে মাসে কারখানায় বিদ্যুৎ বিল আসত প্রায় ৩.৫ লাখ টাকা, সেখানে এখন তাদের বিল আসছে ১.২১ লাখ টাকা।
'প্রাথমিকভাবে সোলার প্যানেলের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছিল, এবং এই অর্থ মালিকপক্ষকে তাদের নিজস্ব তহবিল থেকেই ব্যবস্থা করতে হয়েছে,' বলেন তিনি।
সৌরবিদ্যুতের অগ্রযাত্রার প্রতিফলন জরিপেও
ম্যাপড নামক একটি গবেষণা প্ল্যাটফর্ম সম্প্রতি ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ওপর জরিপ করে দেখেছে, এর মধ্যে ১ হাজার ১০৭টি কারখানা ইতিমধ্যে বিদ্যুতের সংস্থানের জন্য সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে।
এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট ও মাঝারি—যেখানে শ্রমিক সংখা ১ হাজারের কম—কারখানার সংখ্যা ৫০৬টি। আর ছোট কারখানা, অর্থাৎ শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০-র কম—এমন ২৮৯টি কারখানা সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র সদস্যদের বাইরেও প্রায় ৮০টি পোশাক কারখানা বিদ্যুদের সংস্থানের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, তাদের সদস্যভুক্ত আরো অন্তত ৬০টি কারখানা নতুন করে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
শিল্প খাতে বিদ্যুতের মোট চাহিদার কতটুকু সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন হচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায় না।
তবে টিবিএসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উদ্যোক্তা ও সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, শিল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সোলার প্যানেল ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে সংস্থান হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে আরো প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন হবে।
এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যবাধকতা
শিল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলোতে ভবিষ্যতে রপ্তানিতে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাধ্যবাধকতা ও সরবরাহ চেইনে এর প্রমাণ দেওয়ার শর্তের কারণে ওইসব অঞ্চলের ক্রেতাদের চাপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিজিএমইএর শিহাব উদ্দোজা বলেন, 'সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতের সংস্থান এখন যতটা না পরিবেশ-সংক্রান্ত, তার চেয়ে বেশি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য।'
গত বছর বিজিএমইএসহ পোশাক খাতের চারটি সংগঠন তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টাকে পঠানো এক চিঠিতে বলেছিল, পাঁচ বছরে শিল্পের ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহার হওয়া গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৮৬ শতাংশ। এছাড়া একই সময়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩৪ শতাংশ ও ডিজেলের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির চাপে সর্বশেষ গত মাসেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রস্তাব রয়েছে।
ইউরোপের নতুন নিয়মে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলো, যেখানে মোট রপ্তানির প্রায় ৪৪ শতাংশ হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যকে যোগ করলে এর পরিমাণ মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশের কাছাকাছি।
২০১৮ সালে ইউরোপীয় কমিশন ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নেট শূন্যতে নামিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রকাশ করে।
এর অংশ হিসেবে কর্পোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স ডিরেক্টিভ (সিএসডিডিডি) করেছে ইইউ, যার মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে পরিবেশগত ঝুঁকি, কার্বন নিঃসরণ, জ্বালানি ব্যহার ও জলবায়ুগত প্রভাবের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করতে হবে।
আবার সাপ্লাই চেইনে থাকা কারখানাগুলো সঠিক তথ্য দিচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে ইইউ।
ডিপিপির আওতায় প্রতিটি পণ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচিতি থাকবে, যেমন কিউআর কোড বা এনএফসি ট্যাগ। এটি একটি অনলাইন রেকর্ডের সাথে যুক্ত থাকবে, যার মাধ্যমে পণ্যটির সম্পূর্ণ জীবনচক্র ট্র্যাক করা যাবে। কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব এবং ব্যবহারের পর পণ্যটির ব্যবস্থাপনা—সব তথ্যই এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নৈতিক সোর্সিং ও মানবাধিকারের মানদণ্ড আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমের মতো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নির্গমন কমাতে রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনে, এমন বেশিরভাগ ইউরোপীয় ব্র্যান্ড ইতিমধ্যেই কারখানাগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে।
কার্যাদেশ হারানোর ঝুঁকি
বাংলাদেশ থেকে পোশাকপণ্য আমদানি করে, এমন দুটি শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কথা বলেছে টিবিএস। উভয় ব্র্যান্ডই সতর্ক করে বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর না করলে কারখানাগুলোকে কার্যাদেশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, কোনো কারখানার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত মান বা প্রত্যাশা পূরণ না হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। বরং তাদের মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষণ প্রদান ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়।
ইমেইলে পাঠানো জবাবে এইচঅ্যান্ডএম আরও বলেছে, 'কেবল যদি পর্যাপ্ত অগ্রগতি না দেখা যায়, তবেই আমরা পণ্যের পরিমাণ কমানো বা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করব।'
তবে প্রতিষ্ঠানটি এ-ও বলেছে যে, বাংলাদেশে তাদের সরবরাহকারী কারখানাগুলোতে সোলার প্যানেলের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় ২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সংস্থান হচ্ছে, যা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
লিনডেক্স এইচকে লিমিটেডের ঢাকা কার্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজার ও গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যাকশনস লিড কাজী মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, সরবরাহকারীদের জলবায়ু সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তর অন্যতম।
তিনি আরও বলেন, 'ভবিষ্যতে এই শর্তগুলো পূরণ না হলে তা আমাদের পণ্য কেনার সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ অতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের সাথে জড়িত পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশে বাধার মুখে পড়তে পারে।'
ইকবাল জানান, 'লিনডেক্স এইচকে বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করছে। তাদের অধীনে ৩০টিরও বেশি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কারখানাই ইতিমধ্যে তাদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে।'
অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা
স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করতে প্রাথমিকভাবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানার নিজেদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সিং ইউনিটের কিছু স্কিমের আওতায় স্বল্প সুদে ঋণের সুযোগ থাকলেও সেখানে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই ঋণ পাওয়ার এখনও বেশ কঠিন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সিংহভাগই পেয়েছে বড় বড় কোম্পানিগুলো। 'ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য তেমন অর্থায়ন করা হয়নি।'
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের টাকা উঠে আসতে ৮-১০ বছর সময় লাগে, অর্থাৎ এর মুনাফা আসে বেশ ধীরগতিতে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, 'ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে গ্যারান্টি একটা সমস্যা। ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ করার সময় টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়।'
একটি শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা, যিনি গ্রিন ফাইন্যান্স নিয়েও কাজ করেন, কোনো ক্ষুদ্র কারখানা এই ধরনের তহবিল পেয়েছে বলে এখন পর্যন্ত তিনি দেখেননি। 'বড়দের দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বিষয় বিবেচনা করে ঋণ দিতে হয়। ছোটদের ঋণ দেওয়ার মত ঝুঁকি কে নেবে?'
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের স্কিমের অর্থায়নে জটিলতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন পেতে ৬ থেকে ৮ মাস সময় লেগে যায়। এই সময়ে রেগুলার সুদহারে চার্জ করতে হয়।'
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব ঋণ প্রকল্পের আওতায় কতগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পেয়েছে, সে বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান লিখিত প্রশ্ন জমা দেওয়ার অনুরোধ করেন। লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জবাব পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহ-সভাপতি সালাহউদ্দিন জামান খান বলেন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে কিছু ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত, যা প্রকল্প ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। 'এ কারণে ভারতে যে প্রকল্প ১১.৫০ কোটি টাকায় করা সম্ভব, বাংলাদেশে তাতে আড়াই কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়।'
সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাজেট সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান সৌরবিদ্যুতের যন্তপাতি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের
সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে একের পর এক সরকার বিস্তর কথা বললেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে বর্তমান সরকার কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সোলার খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নামমাত্র আমদানি শুল্ক ও পাঁচ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তিনি আরও জানান, জুনের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের জন্য বিনিয়োগ-বান্ধব নীতিমালা ঘোষণা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিজেদের পরিকল্পনার সপক্ষে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, দেশটির সরকার সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি সরাসরি আমদানি করে বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশও সরাসরি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বিবেচনা করতে পারে অথবা বেসরকারি খাতকে শূন্য শুল্কে আমদানির সুযোগ দিতে পারে।
