চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে প্রতিযোগিতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড ও আরএসজিটি
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম ব্যস্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং স্থাপনা চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার অধিকার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে দুবাইভিত্তিক লজিস্টিকস কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সৌদি আরবের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)।
ডিপি ওয়ার্ল্ড ও আরএসজিটি যথাক্রমে গত ৮ এপ্রিল ও ২২ এপ্রিল কর্তৃপক্ষের কাছে আলাদা আলাদা প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য প্রস্তাব জমা দিয়ে প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এমজিএইচ গ্রুপও।
২০২৪ সালে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ২২ বছরের চুক্তি করে আরএসজিটি। অন্যদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
এই প্রথম সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের এই দুই বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের একই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার জন্য মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
জানতে চাইলে আরএসজিটি চট্টগ্রামের হেড অভ কমার্শিয়াল সৈয়দ আরিফ সারওয়ার নিশ্চিত করেন, কোম্পানিটি সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)—দুটোই পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপারেটরদের মতোই আমরাও টার্মিনাল দুটি পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন জমা দিয়েছি। সরকার আমাদের সুযোগ দিলে আমরা প্রায় ১ বিলিয়ন বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছি।'
প্রস্তাবের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একইভাবে প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সিসিটির কৌশলগত গুরুত্ব
দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু আছে: জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল।
এর মধ্যে প্রথম তিনটি টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করছে, আর পতেঙ্গা টার্মিনাল পরিচালনা করছে আরএসজিটি।
কৌশলগত অবস্থানের কারণেই সিসিটির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এনসিটি ও জিসিবি-র মাঝখানে অবস্থিত এই টার্মিনাল বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার হ্যান্ডলিং জোনগুলোকে যুক্ত করেছে।
বন্দরের তথ্য অনুসারে, গত বছর বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ হ্যান্ডলিং করেছে এনসিটি। এরপরই রয়েছে জিসিবি (৩৬ শতাংশ), সিসিটি (১৬ শতাংশ) ও পতেঙ্গা টার্মিনাল (প্রায় ৪ শতাংশ)।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসিটি যদি ডিপি ওয়র্ল্ডের অধীনে এনসিটির সাথে একীভূত হয়, তবে আরব আমিরাতের এই অপারেটর বন্দরের প্রায় ৬০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর প্রভাব পেয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সিসিটি ও জিসিবি যদি আরএসজিটির অধীনে চলে যায়, তবে এই সৌদি অপারেটরের হিস্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৫ শতাংশে।
প্রতিযোগিতায় শামিল এমজিএইচ গ্রুপও
উপসাগরীয় অঞ্চলের অপারেটরদের পাশাপাশি দেশীয় পরিচালনার মডেলের জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এমজিএইচ গ্রুপ।
কোম্পানিটি গত বছরের মার্চে সিসিটি পরিচালনার জন্য প্রথম একটি প্রস্তাব জমা দেয়। এরপর একই বছরের ২৮ এপ্রিল এনসিটি পরিচালনার জন্য দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাব জমা দেয়।
বন্দরের স্টেকহোল্ডারদের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড এর আগে প্রতি কনটেইনারের জন্য বন্দরকে ৯৩.৫০ থেকে ৯৭.৫০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
তবে এমজিএইচ প্রতি কনটেইনারের জন্য ৯৮.৫০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি, এ চুক্তির মাধ্যমে আগামী ১৫ বছরে বন্দর প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারবে।
এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করতে সরকার এখন একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এগোচ্ছে।
টিবিএসের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের বেসরকারি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার জন্য সিপিএকে মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠন করতে বলেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
৬ মে মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আনুষ্ঠানিক চিঠিতে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা মূলত 'পিপিপির অধীনে বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটর দ্বারা ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডসহ (ওসিওয়াই) সিপিএর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ' শীর্ষক প্রকল্পের সাথে সম্পর্কিত।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে আগের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় বন্দর কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন কমিটি গঠনের বিষয়ে একটি নতুন প্রস্তাব জমা দিয়েছিল।
জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাকারিয়া টিবিএসকে বলেন, 'এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি পরিচালনার জন্য অনেক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপারেটর আগ্রহ দেখিয়েছে। এনসিটির জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবটি মূল্যায়নাধীন রয়েছে। অন্য প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রস্তাবগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) মাধ্যমে এসেছে। তারা এই প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবে।'
তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিবিএসর পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও পিপিপিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
