প্যারিসের স্কুলগুলোতে শিশুদের ওপর একের পর এক যৌন হেনস্তার অভিযোগ, বাড়ছে ক্ষোভ
ফ্রান্সের প্যারিসের একটি স্কুলের একজন সহকারী তার তত্ত্বাবধানে থাকা ছোট শিশুদের যৌন হেনস্তার অভিযোগে মঙ্গলবার আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবেন।
এটি গত এক বছরে সৃষ্টি হওয়া এমন একটি কেলেঙ্কারির সর্বশেষ ঘটনা, যা ফরাসি রাজধানীর শিক্ষা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে প্রায় ১৫ হাজার এমন সহকারী কর্মী নিয়োজিত আছেন, যাদের 'অ্যানিমেটর' বা বিনোদন কর্মী নামে ডাকা হয় এবং তারা শিক্ষক নন।
বর্তমানে প্যারিসের প্রায় ১০০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, কিন্ডারগার্টেন ও জুনিয়র স্কুলে তদন্ত চলছে, যেখানে এসব সহকারী কর্মীদের বিরুদ্ধে অনুপযুক্ত, আগ্রাসী বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
গ্রীষ্মকালে আরও তিনটি মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং এ মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত আরেকটি মামলার রায়ও শীঘ্রই দেওয়া হবে। এছাড়া আরও অনেক মামলা সামনে আসতে পারে।
গত সপ্তাহে সপ্তম অ্যারঁদিসমঁ বা জেলার তিনটি স্কুলে অভিযানের পর পুলিশ ১৬ জনকে আটক করে। পরে তাদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে শিশুদের সঙ্গে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়।
মঙ্গলবারের মামলাটি একাদশ অ্যারঁদিসমঁ এলাকার আলফোঁস বোদ্যাঁ জুনিয়র স্কুলকে কেন্দ্র করে। সেখানে এক সহকারী কর্মীর বিরুদ্ধে পাঁচটি শিশুর সঙ্গে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ স্পর্শের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলেই তিনি তার চার বছর বয়সী মেয়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষণ দেখতে পান, যখন আরেক অভিভাবক জানান যে তাদের সন্তান যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমার স্ত্রী আমাদের মেয়েকে বাগানে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, স্কুল-পরবর্তী সময়ে কেউ তাকে স্পর্শ করেছিল কি না। তখন সে বলেছিল, "হ্যাঁ, দাভিদ আমাকে স্পর্শ করে এবং আদর করে।"'
'আমার স্ত্রী বলল, "আমাকে দেখাও।" তখন আমার মেয়ে অদ্ভুতভাবে তার পিঠে হাত বুলাতে শুরু করে। তখনই আমরা বুঝতে পারি কিছু একটা ভুল হয়েছে।'
এই কেলেঙ্কারি প্যারিসের ছোট শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে অবিশ্বাস ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সহকারী কর্মীদের নিয়োগদাতা সিটি হল প্রথমদিকে এসব অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।
স্কুল-পরবর্তী কার্যক্রমবিষয়ক সংগঠন 'এসওএস-পেরিসকোলেয়ার'-এর মতে, মূল সমস্যা হলো সহকারী কর্মীদের নিম্নমান। তারা খুব কম বেতন পান এবং চাকরি পেতে সর্বোচ্চ যে যোগ্যতা লাগে তা হলো শিশু পরিচর্যা বিষয়ে একটি সাধারণ সনদ। অনেক সময় কর্মী নিয়োগের চাপ এত বেশি থাকে যে সেই শর্তও শিথিল করা হয়।
২০২১ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা এলিজাবেত গুতমান বলেন, অভিভাবকদের মধ্যে সহকারী কর্মীদের দ্বারা বিদ্রূপ, অপমান ও অন্যান্য নিম্নমাত্রার নির্যাতনের গল্প ক্রমেই বাড়তে থাকায় তিনি সংগঠনটি গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি ষোড়শ অ্যারঁদিসমঁ এলাকার একটি জুনিয়র স্কুলের চার সহকারী কর্মীর ঘটনার উদাহরণ দেন, যারা 'একটি মারামারির আসর বসিয়েছিল, যেখানে অন্য শিশুরা দাঁড়িয়ে "ওকে মারো!" বলে চিৎকার করছিল।'
প্যারিসের নতুন মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার নিয়োগ ব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি প্রশিক্ষণ ও তদারকির জন্য দুই কোটি ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন, কোনো সহকারী কর্মীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ জমা পড়লেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এসব সহকারী কর্মীর বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কাজ করেন। তাদের দায়িত্ব হলো খাবারের সময় এবং ক্লাস শেষ হওয়ার পর বিকেলে ছোট শিশুদের দেখাশোনা করা। এছাড়া খেলাধুলা, কারুশিল্প ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার কথাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
তবে সহকারী কর্মীরা বলছেন, এই কেলেঙ্কারির কারণে তারাও এখন সাধারণ সন্দেহ ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গত সপ্তাহে তারা তাদের পেশার স্বীকৃতি ও আরও বিনিয়োগের দাবিতে ধর্মঘট পালন করেন।
শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি কার্লা বনেঁ বলেন, 'অভিভাবকেরা বলতে গেলে এখন স্কুলগুলোর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন এবং নানা অভিযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু তারা যা বলছেন তার সবই যে সঠিক, এমন নয়।'
স্কুল-পরবর্তী কার্যক্রমের এক সহকারী কর্মী রেমি বলেন, 'সিটি হল এখন আর নিরপেক্ষ নেই। তারা অভিযোগের তদন্ত করে না... আমাদেরও দেখভাল করে না।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে শিশুদের সঙ্গে কাজ করলে মুহূর্তের মধ্যে আপনার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের অভিযোগ আনা হতে পারে।'
অভিভাবক সংগঠন এফসিপিই-এর গ্রেগোয়ার আনসেল বলেন, 'যখন এমন একটি ব্যবস্থা থাকে যেখানে কর্মীদের ঠিকমতো বেতন দেওয়া হয় না, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না কিংবা নজরদারিও করা হয় না, আর সতর্কবার্তা জানানোর জন্যও পর্যাপ্ত অর্থ বা সঠিক পদ্ধতি থাকে না, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।'
এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দু প্যারিস হলেও অধিকারকর্মীরা বলছেন, একই ধরনের সমস্যা সারা দেশেই রয়েছে।
