সেমিফাইনালে স্পেনকে হারানোর মতো খেলতে পারেনি ফ্রান্স, মানলেন কোচ; ক্ষোভ ঝাড়লেন রেফারির ওপরও
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ০-২ ব্যবধানে হারের পর ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম স্বীকার নিলেন, এদিন তার দল কৌশলগত দিক থেকে স্পেনের সমকক্ষ ছিল না। তবে স্পেনকে দেওয়া পেনাল্টিতে রেফারি ইভান আরসিদেস বারটন সিসনেরোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেশম।
ম্যাচ শেষে ফরাসি কোচ বলেন, 'জয়ের আশা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে হতো। দুর্ভাগ্যবশত আমরা সেটা পারিনি।'
ম্যাচের শুরুতেই মিকেল ওয়ারজাবালের পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে যায় স্পেন। এরপর ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর পাস থেকে ব্যবধান বাড়িয়ে স্পেনের জয় কার্যত নিশ্চিত করেন পেদ্রো পোরো।
পোরোর গোলের সময় পর্যন্ত স্পেন আটটি শট নিয়েছিল, তার বিপরীতে ফ্রান্স শট নিয়েছিল মাত্র দুটি। বল দখলের লড়াইয়েও ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে জিতেছে স্প্যানিশরা। পুরো ম্যাচে গোলের জন্য ফ্রান্স মোট ১০টি শট নিয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র একটি শটই গোলের ১৩ মিটারের মধ্যে থেকে নেওয়া হয়েছিল। আর লক্ষ্যে (অন টার্গেট) শট ছিল মাত্র তিনটি।
দেশম বলেন, 'আজ স্পেন অসাধারণ ডিফেন্ড করেছে। আমাদের নড়াচড়া করার মতো তেমন কোনো জায়গাই দেয়নি ওরা। তার ওপর আমরা কিছু টেকনিক্যাল ভুল করেছি। ফলে ওদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আগের ম্যাচগুলোতে আমরা যে মানের খেলা দেখিয়েছি, আজ আমাদের টেকনিক্যাল লেভেল তার চেয়ে অনেকটাই নিচে ছিল।'
টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের প্রথম ছয় ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল অলিস—এই ফরোয়ার্ড ত্রয়ী মিলে ১৩ গোল করেছেন। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১০ গোল। কিন্তু স্পেনের জমাট রক্ষণের সামনে তারা এতটাই বোতলবন্দি ছিলেন যে তিনজন মিলে শট নিতে পেরেছেন মাত্র পাঁচটি—যাতে এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) ছিল ০.১৫!
ফরাসি কোচের পর্যবেক্ষণ, 'আমাদের পাসিং কম্বিনেশন আর সিকোয়েন্সের তুলনায় ওরা অনেক দ্রুত ম্যাচের গতিপ্রকৃতি পড়তে পারে, মাঝপথে পাস আটকেও দিতে পারে। আমরা এর কোনো সমাধানই বের করতে পারিনি। আমি বলতে চাই না যে, আমাদের আক্রমণের ধার ও কৌশলগত সামর্থ্য হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। সাধারণত এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।'
দেশ মনে করেন, বিপক্ষ হিসেবে স্পেনের পারফরম্যান্সেরও প্রশংসা প্রাপ্য। তিনি বলেন, 'প্রতিপক্ষের কৃতিত্বকেও খাটো করে দেখার উপায় নেই। আমরা যা করেছি, তার সবটাই যে খারাপ, তা নয়। আমাদের এতদিনের অর্জনগুলোকে মুছেও ফেলছি না। তবে আমি আবারও বলব: স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে এরকম একটা ম্যাচে নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিতে হবে। আজ রাতে ফ্রান্সের খেলা সেই পর্যায়ে ছিল না।'
এ সময় রেফারি ইভান আরসিদেস বারটন সিসনেরোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেশম।
ম্যাচের ২২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন ওয়ারজাবাল। ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিনিয়ে-র ফাউল থেকে ওই পেনাল্টি আদায় করে নেন লামিন ইয়ামাল।
হেড করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন দিনিয়ে। পেনাল্টি বক্সে তিনি বল ক্লিয়ার করতে যাওয়ার মুহূর্তেই পিছন থেকে ছুটে এসে বাধা দেন ইয়ামাল। ফরাসি ডিফেন্ডারের পা লাগার ঠিক আগেই লাফিয়ে ওঠা স্প্যানিশ তরুণের কনুইয়ে লেগেছিল বল।
দেশম বলেন, 'এখন কিছু বললে মনে হবে হেরে গিয়ে অজুহাত দিচ্ছি। কিন্তু আপনাদের কাছেই আমার প্রশ্ন: সেমিফাইনালের মতো একটা ম্যাচ পরিচালনা করার যোগ্যতা কি এই রেফারির আছে? ওই পেনাল্টিটা তো আছেই, সাথে আরও অনেক কিছুই যোগ হয়েছে। আজকের রেফারির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো ক্ষোভ নেই, তবে প্রশ্নটা আপনারা নিজেদেরকেই করে দেখুন।'
এই হারের ফলে টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার ফরাসি স্বপ্ন অধরা থেকে গেল। ফুটবল ইতিহাসে এই বিরল কীর্তি আছে কেবল পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২, ১৯৮৬ ও ১৯৯০) ও ব্রাজিলের (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২)। এটি ছিল ফ্রান্সের টানা তৃতীয় সেমিফাইনাল ও টানা চতুর্থ কোয়ার্টার ফাইনাল যাত্রা। পাশাপাশি বিশ্বকাপের গত ২১টি ম্যাচের নির্ধারিত সময়ে এটি তাদের মাত্র দ্বিতীয় হার।
দেশম বলেন, 'ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমরা সেভাবে রাখতে পারিনি। প্রতিপক্ষ আমাদের ভুল করতে বাধ্য করেছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, এটা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। আমাদের দলের দুজনের জন্য এটা ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। এর আগে আমরা যে দারুণ খেলেছি, এই হার তাকে মুছে দিতে পারে না। এতদিনের অর্জনগুলোকে আমি খাটো করতে চাই না।'
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে পরাজিত দলের বিপক্ষে আগামী শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে নামবে ফ্রান্স। এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই ফরাসি হেড কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশমের ১৪ বছরের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
স্পোর্টস নেটওয়ার্ক ইএসপিএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বসন্তেই দেশমের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান।
