ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ব্রিটেন। ফ্রান্স ও কানাডার সঙ্গে সমন্বয় করে মঙ্গলবার এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ছে। এরইমধ্যে দেশগুলো এই কঠোর পদক্ষেপ নিল।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড হাউজ অব কমন্সে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা অবিচার ও দুর্ভোগের বিষয়ে ব্রিটেন এখন আর শুধু মৌখিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তিনি বলেন, 'আজ আমরা ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথ বন্ধ হওয়া কেবল দাঁড়িয়ে দেখতে পারি না। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে আমাদের এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।'
মিলিব্যান্ডের মতে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের এই দখলদারিত্ব সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাজ্য বিশ্বাস করে যে, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর 'জাতিগত নিধন' চালানো হচ্ছে।'
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ তেল আবিব থেকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভীর পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেটটি বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই কনস্যুলেটটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ অভিযোগ করেছেন, আগামী অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রিটেন তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে।
উত্তেজনার কেন্দ্রে 'ই-ওয়ান' প্রকল্প
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে জেরুজালেমের কাছে ইসরায়েলের প্রস্তাবিত 'ই-ওয়ান' বসতি প্রকল্প। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নষ্ট হবে। এড মিলিব্যান্ড সতর্ক করে বলেন, এই প্রকল্প দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে চিরতরে শেষ করে দিতে পারে। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার দিনই স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরের দুটি বসতিতে আরও ১,০০০ নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
বাণিজ্যিক প্রভাব ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ব্রিটেন ও ইসরায়েলের মধ্যে বার্ষিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ডের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিদ্যমান। বসতিতে উৎপাদিত পণ্যগুলো মূলত কৃষিপণ্য ও ওয়াইন, যা মোট বাণিজ্যের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ। তাই এই নিষেধাজ্ঞার বাণিজ্যিক প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ব্রিটেনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে 'ইহুদিদের প্রতি বৈষম্য' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ব্যবসার সুযোগ হারাতে পারে।
জাতিসংঘ ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ইসরায়েলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করে, যদিও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে আসছে। ব্রিটেন ২০২৫ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং গত জুনে পশ্চিম তীরে সহিংসতায় জড়িত ইসরায়েলি নেটওয়ার্কগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডার পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন এবং নরওয়েও বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে।
