গাজায় গণহত্যা নিয়ে বানানো তথ্যচিত্রের দুই পরিচালকের নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি ইসরায়েলি মন্ত্রীর
গাজায় সাধারণ মানুষকে গণহারে হত্যার ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র 'নাজা'-এর পরিচালকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী।
'নাজা' নামটি মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার করা একটি অ্যাক্রোনিম থেকে নেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে গাজায় কোনো বিমান হামলায় আনুমানিক কতজন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হতে পারে তা নির্দেশ করা হয়।
৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন হুইসেলব্লোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এতে তারা গাজায় বোমাবর্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত টার্গেটিং সিস্টেমের ব্যবহার কীভাবে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তা তুলে ধরেছেন। একটি সাক্ষাৎকারে এক সূত্র দাবি করেন, মাত্র একজন হামাস সদস্যকে হত্যার জন্য ৫০০ জন 'নাজা' (বেসামরিক নাগরিক) হত্যার অনুমোদন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল।
গত শনিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটি প্রদর্শনের পর দর্শক টানা ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন, যা উৎসবের ইতিহাসে একটি রেকর্ড। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রটি চলতি বছরের ভেনিস উৎসবের 'স্পেশাল জুরি প্রাইজ' লাভ করে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে লিখেন, তারা 'বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষীদের হাততালি পাওয়ার জন্য নিজ মাতৃভূমির ক্ষতি করতেও প্রস্তুত।'
এক্স-এ জোহার আরও লিখেন, 'রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে এই ঘৃণ্য নির্মাতাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য আমি অবিলম্বে ব্যবস্থা নেব।'
অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ওপর নির্মিত 'নো আদার ল্যান্ড' চলচ্চিত্রের জন্য ২০২৫ সালে অস্কারজয়ী এই পরিচালকদের নিশানা করেছেন অন্যান্য ইসরায়েলি মন্ত্রীরাও।
দেশটির উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এক্স-এ লিখেছেন, 'আপনারা সমগ্র ইসরায়েলি জনগণের জন্য এক লজ্জা ও কলঙ্ক। চলে যান!' তিনি আরও বলেন, 'আমি নিশ্চিত যে আপনাদের বন্ধুরা, অর্থাৎ গাজায় আমাদের শত্রু হামাস, আপনাদের দু'হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাবে।'
অন্যদিকে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডোর লিবারম্যান দুই পরিচালক আব্রাহাম ও জোরকে 'ইসরায়েলবিদ্বেষী' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তথ্যচিত্রটিকে 'আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ও মিথ্যা অপবাদ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইসরায়েলে আইনত নাগরিকত্ব বাতিল করা সম্ভব হলেও তা খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। ২০২২ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যদি কেউ 'আনুগত্য' দেখাতে ব্যর্থ হয়—যেমন গোয়েন্দাগিরি বা রাষ্ট্রদ্রোহিতায় লিপ্ত হওয়া—তবে রাষ্ট্র তার নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারে। ২০২৩ সালে আইনটি বিস্তৃত করে 'সন্ত্রাসবাদে' দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ওপরও এটি প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়। আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবেদন দাখিল করতে হয়, বিচারমন্ত্রীকে তা অনুমোদন করতে হয় এবং বিচারকদের মাধ্যমে তা সত্যায়িত হতে হয়।
অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধকে তুলে ধরা ২০২৪ সালের 'নো আদার ল্যান্ড' তথ্যচিত্রটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর ডানপন্থী একদল জনতা পরিচালক আব্রাহামের পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্রাহাম বলেছিলেন, 'আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে ঝুঁকি নিচ্ছি যা আমাদের বিশেষ সুবিধা দেয়, যার মূল বৈশিষ্ট্যই হলো ইহুদি-ইসরায়েলি আধিপত্য।' তিনি আরও যোগ করেন, 'অসংখ্য ফিলিস্তিনির জন্য কোনো ডানপন্থী জনতা তাদের বাড়িতে হামলা চালাতে আসে না; বরং তাদের ওপর আসে মার্কিন অর্থায়নে তৈরি বুলডোজার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র।'
আব্রাহাম বলেন, 'একবার ভাবুন, গাজার কোনো ফিলিস্তিনি সাংবাদিক যদি আমাদের মতো কাজ করার চেষ্টা করতেন এবং ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ফোন দিতেন, তবে কী হতো। এর কোনো তুলনাই হয় না; তাদের সম্ভবত হত্যা করা হতো।'
'নাজা'-এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুরুতে জানায়, তারা তথ্যচিত্রটিতে আনা অভিযোগগুলো 'সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান' করছে। একই সঙ্গে বেনামী সাক্ষ্য ব্যবহারের সমালোচনা করে তারা দাবি করে, তথ্য ফাঁসকারীদের পরিচয় 'যাচাই করা সম্ভব নয়।' তবে পরবর্তীতে অন্য একটি প্রতিক্রিয়ায় সামরিক বাহিনী স্বীকার করে যে, 'অভিযোগগুলো ঢালাওভাবে উড়িয়ে দেওয়ার বদলে বিস্তারিত ও প্রমাণভিত্তিক জবাবের প্রয়োজন রয়েছে।'
ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন বামপন্থী রাজনীতিবিদ এই চলচ্চিত্র ও এর পরিচালকদের প্রশংসা করেছেন। বামপন্থী হাদাশ পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক আইনপ্রণেতা ইউসুফ জাবারিন পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য পরিচালকদের অভিনন্দন জানান। লাখ লাখ মানুষের সামনে 'গাজার এই ভয়াবহ অপরাধ ও নির্মম বাস্তবতা' তুলে ধরার জন্য তিনি তাদের ধন্যবাদ জানান।
এক সম্পাদকীয়তে দেশটির প্রখ্যাত সংবাদপত্র 'হারেৎজ' ইসরায়েলিদের গাজায় তাদের কর্মকাণ্ডের মূল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। হ্যারেটজ লেখে, 'ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে আব্রাহাম ও জোর মূলত ইসরায়েলিদের সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন যা তারা আগেই জানে। সহজ কথায় বলতে গেলে, গাজায় ইসরায়েল যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছে তার ওপর এক বিশাল কালো দাগ পড়ে গেছে।'
সরকারি ইসরায়েলি তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়, যার ফলে ১,২২১ জনের মৃত্যু হয়। সে সময় হামাস যোদ্ধারা ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়।
এর পরবর্তী তিন বছরের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যাদের বিশাল একটি অংশই বেসামরিক নাগরিক।
