‘ওকে এক্ষুনি তাড়াও’: আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারের পর তোপের মুখে ইংল্যান্ড কোচ, এবারও পিছু ছাড়ল না ভিএআর বিতর্ক
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন। ম্যাচে ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডন ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিলেও ৩০ মিনিট পর এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরান। আর যোগ করা সময়ে লিওনেল মেসির ক্রস থেকে হেড করে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন লাউতারো মার্টিনেজ। এগিয়ে থেকেও সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ায় ইংল্যান্ডে বইছে তীব্র প্রতিক্রিয়ার ঝড়।
তবে এই ম্যাচেও ভিএআর বিতর্ক পিছু ছাড়েনি আর্জেন্টিনার। এনজো ফার্নান্দেজের একটি ফাউলের ঘটনায় রেফারির কার্ড না দেখানো অবাক করেছে অনেক ফুটবলবোদ্ধাকে।
টুখেলের কৌশলের সমালোচনা
ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের রণকৌশল নিয়ে শুরু হয়েছে কড়া সমালোচনা। ম্যাচের ৭২ মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে নিয়ে ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে নামানোর সিদ্ধান্তটি অনেককেই অবাক করেছে। এরপর সেন্টার ব্যাক ড্যান বার্ন এবং ফুলব্যাক ও'রাইলিকেও বদলি হিসেবে নামানো হয়। তবুও শেষ আধঘণ্টা আর্জেন্টিনার আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় রক্ষণাত্মক হয়ে পড়া ইংল্যান্ড।
সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েইন রুনি বিবিসিকে বলেন, 'একবার প্রথম গোল পাওয়ার পর আমরা দ্বিতীয় গোলের জন্য চেষ্টা করিনি। খেলোয়াড়দের জন্য এবং আমার নিজের কাছে মনে হয় টমাস টুখেল জুয়া খেলেছিলেন। তিনি পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলার যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সেটি আর্জেন্টিনাকে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দেয়। টুখেলের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই আজ আমাদের হারের কারণ।'
সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার মাইকাহ রিচার্ডস যোগ করেন, 'টমাস টুখেলকে এখানে আনা হয়েছিল পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা সবাই মনে করি কৌশলগতভাবে আজ তিনি ভুল করেছেন। আমরা যখন পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলতে শুরু করলাম, তখনই ছন্দ হারিয়ে ফেলি। আমরা উইঙ্গার নামিয়ে আক্রমণ ধরে রাখতে পারতাম। অথচ শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো উত্তর ছিল না।'
স্কাই স্পোর্টসে আলাপকালে আর্সেনালের সাবেক ফরোয়ার্ড পল মারসন বলেন, 'আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। গ্যারেথ সাউথগেট রক্ষণাত্মক খেলার জন্য অনেক সমালোচনা সয়েছেন—যদিও আমি মনে করি তিনি ভালো করেছিলেন—কিন্তু টুখেল এসে গ্যারেথের মতোই কাজ করলেন। আমি জানি না কী হতে যাচ্ছে। মেক্সিকো ম্যাচে ১০ জন নিয়ে খেলার সময় বিষয়টি বুঝতাম, কিন্তু এখানে আমাদের ভিন্ন কিছু করা উচিত ছিল। আমাদের এটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং ইউরোর দিকে তাকাতে হবে।'
মারসন আরও বলেন, 'গ্যারেথ একজন ডিফেন্ডার ছিলেন, তাই প্রাকৃতিকভাবেই তিনি রক্ষণাত্মক কোচ ছিলেন। কিন্তু আমি টুখেলের কাছ থেকে এমনটা আশা করিনি। আমি ভেবেছিলাম তিনি আর্জেন্টিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন। কিন্তু যা হলো—আমরা কেবল রক্ষণ করে গেছি এবং যখন তারা গোল করল, তখন দেখলাম, মাঠজুড়ে কেবল ডিফেন্ডার।'
ঘানার সাবেক ফুটবলার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং এসবিএস-এর এক অনুষ্ঠানে বলেন, 'গোলটি ইংল্যান্ডের জন্য সেরা মুহূর্ত ছিল আবার সবচেয়ে খারাপও, কারণ এর পর তারা ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর্জেন্টিনা সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এনজো ফার্নান্দেজকে আটকানো উচিত ছিল, সে দুইবার জোরালো শট নিয়েছে। জুড বেলিংহাম চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার মতো মানের খেলোয়াড়ের জন্য ওটুকু সময় যথেষ্ট ছিল। মেসির জন্য সেটি বেশ সহজ অ্যাসিস্ট ছিল। ওই সময় আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল এবং গোল হওয়াটা ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার।'
জার্মান কোচ টমাস টুখেল গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৮ সালের ইউরো পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছেন। তবে সেমিফাইনালের এই ফলাফল নিয়ে এফএ সন্তুষ্ট না হলে পারফরম্যান্স ক্লজ অনুযায়ী তাকে ছাঁটাই করার সুযোগ রয়েছে। এফএ-র প্রধান নির্বাহী মার্ক বুলিংহাম সম্প্রতি জানান, 'এফএ-র প্রতিটি চুক্তিতেই পারফরম্যান্স ক্লজ থাকে, তবে আমি এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলব না।'
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের তোপ
ইংল্যান্ডের এই হারের পর কোচ টুখেলকে নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোও কঠোর সমালোচনা করেছে। বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান' তাদের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে—'এটি ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে জয়ের সংকল্প, আর টুখেল দেখিয়েছেন ভীরু মানসিকতা'।
অন্যদিকে 'দ্য টেলিগ্রাফ' তাদের ম্যাচ রিপোর্টে সাবেক কোচের উদাহরণ টেনে লিখেছে—'সাউথগেটও কখনো এমন রক্ষণাত্মক হয়ে যাননি, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টুখেল যেমনটি হলেন'।
পিছিয়ে ছিল না 'ডেইলি মিরর'-ও। পত্রিকাটি তাদের একটি মতামত কলামের শিরোনামে লিখেছে—'আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে অগ্রহণযোগ্য সব পরিবর্তন এনে খেলোয়াড়দের ডুবিয়েছেন টমাস টুখেল'। পত্রিকাটির আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল—'বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে এমন "কাপুরুষোচিত" হারের পরও ইংল্যান্ডের কোচ হিসেবে বহাল থাকছেন টমাস টুখেল'।
ভিএআর বিতর্ক
আর্জেন্টিনার এই জয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথমার্ধে এনজো ফার্নান্দেজ ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসনের মাথার পেছনে সরাসরি আঘাত করলেও রেফারি কোনো কার্ড দেখাননি এবং ভিএআর-ও নীরব ছিল। সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক পল রবিনসন বলেন, 'এটি খুব বাজে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।'
বোয়াটেং এ প্রসঙ্গে বলেন, 'অন্য কোনো দেশ হলে এই পরিস্থিতি হয়তো ভিএআর পরীক্ষা করে দেখত। কিন্তু আমি দেখছি রেফারিরা আর্জেন্টিনাকেই বেশি সমর্থন দিচ্ছেন।'
ম্যাচের শেষ দিকে লিওনেল মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্সের প্রশংসাও করেন বোয়াটেং। তিনি বলেন, 'মেসিকে কীভাবে আটকাবেন? আপনি ৯০ মিনিট ধরে তা পারবেন না। ইংল্যান্ড প্রথম ৬০ মিনিট দারুণ খেলেছিল, কিন্তু মেসি যেন নিজেকে কেবল প্রস্তুত করছিলেন এবং শেষে দুটি অ্যাসিস্ট করলেন। ১-০ তে এগিয়ে থাকার সময় আপনি খেলা বন্ধ করতে পারেন না। টুখেল বা খেলোয়াড়দের ক্লান্তি—কারণ যা-ই হোক, এমন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে শেষ ৩০ মিনিট কেবল ডিফেন্ড করে টিকে থাকা অসম্ভব।'
