ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় ‘ম্যারাডোনার জন্য উপহার’: মেসি
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় প্রয়াত কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে উৎসর্গ করেছেন লিওনেল মেসি।
বুধবার আটলান্টায় প্রথমে পিছিয়ে পড়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু সেখান থেকে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা।
ক্যারিয়ারজুড়েই মেসিকে তুলনা করা হয়েছে আর্জেন্টিনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ম্যারাডোনার সঙ্গে। ৩৯ বছর বয়সি মেসি এই ম্যাচেও জাদুকরী ভূমিকা রেখেছেন—দলের দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেছেন।
ম্যাচ শেষে মেসি বলেন, 'ডিয়েগো সত্যিই অসাধারণ ছিলেন। আমি কখনোই তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে চাইনি। আমার চোখে তিনিই সর্বকালের সেরা।
'আমরা একসঙ্গে দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছি। ২০১০ বিশ্বকাপের সময়টা তার জন্য দারুণ ছিল। সেই টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচ আর প্রতিপক্ষ নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হতো।'
মেসি আরও বলেন, 'জাতীয় দল তার [ম্যারাডোনা] কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা আমরা জানি। তিনি যে লিগ্যাসি রেখে গেছেন, তাতে আজ যেখানেই থাকুন না কেন—এই জয় দেখে তিনি নিশ্চয় খুশি হবেন, উপভোগ করবেন। এই জয়টা তার জন্য একটা উপহার।'
২০২০ সালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই হাত দিয়ে সেই ঐতিহাসিক প্রথম গোলটি করেছিলেন তিনি, ফুটবল ইতিহাসে যা 'হ্যান্ড অভ গড' নামে অমর হয়ে আছে।
বোকা জুনিয়র্স ও নাপোলির এই কিংবদন্তি এরপর একাই বল টেনে নিয়ে গিয়ে এক অতিমানবীয় গোল করে দলের লিড দ্বিগুণ করেন। ফিফার ভোটে পরে এই অবিশ্বাস্য ম্যাজিক স্বীকৃতি পায় 'গোল অভ দ্য সেঞ্চুরি' হিসেবে।
সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আর সেই টুর্নামেন্টেই দ্বিতীয়বারের মতো নিজেদের ঘরে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে নিয়েছিল তারা।
ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বৈরিতা চিরকালীন। সে কারণেই বুধবারের লড়াই যে তার নিজের এবং গোটা আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে বিশেষ আবেগের জায়গা, তা স্বীকার করে নিয়েছেন মেসি।
তিনি বলেন, 'হতে পারে এটা শুধুই একটা ম্যাচ, কিন্তু আমরা বিশেষ কিছু অনুভব করছিলাম। জাতীয় সংগীত বাজার মুহূর্ত থেকেই সেই আবেগটা টের পাচ্ছিলাম আমরা। সমর্থকরা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এই জয়টা সবচেয়ে বেশি চেয়েছিল। কারণ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া আর টানা আরও একটা বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখার মাহাত্ম্যই আলাদা।
'আমি জানি, এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার মানুষ ঠিক কতটা খুশি...আমার মা আর পরিবারের অন্য সদস্যরা আমাকে সবার উদ্যাপনের ছবি পাঠিয়েছে।'
মেসি আরও বলেন, 'আর্জেন্টিনাবাসীকে এমন বিশেষ আনন্দ উপহার দিতে পেরে আমি দারুণ গর্বিত, ভীষণ খুশি। কোনো আর্জেন্টাইন অন্তত এই ম্যাচটা হারতে চায়নি।'
২০২২ সালে কাতারের মাটিতে দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে তৃতীয় শিরোপা ঘরে তুলেছিল আর্জেন্টিনা। সেই শিরোপা জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লিয়োনেল মেসি। এবারের এই টুর্নামেন্টেও তার সেই অতিমানবীয় ফর্ম অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
ইন্টার মায়ামির এই ফরোয়ার্ডের নামের পাশে এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২১ গোল। শুধু গোল করাই নয়, গোল করানোতেও তিনি অনন্য। বিশ্বকাপে মোট ১৩টি অ্যাসিস্ট নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ডও এখন তার দখলে।
মেসি বলেন, 'গত এক বছর ধরে আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি, অনুশীলন করেছি। জানতাম, সেরা ছন্দে ফিরতে আমি আমার সর্বস্ব উজাড় করে দেব। এই মুহূর্তে আমি কেবল নিজের এই সময়টা উপভোগ করতে চাই। এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ কি না, তা নিয়ে ভাবছি না। এই দলটা সব সময় নিজের সেরাটা দেয়, কারও কাছে এদের কিছু প্রমাণ করার নেই।
'এই দল কখনো হাল ছাড়ে না। আমাদের ফুটবল আর জেদকে অস্ত্র করে আমরা জিততেই মাঠে নেমেছিলাম; আর এখন আমরা আরও একটা বিশ্বকাপের ফাইনালে। ইংল্যান্ডকে আমরা ওদের অর্ধেই চেপে ধরেছিলাম। প্রমাণ করে দিয়েছি যে অতিরিক্ত সময়ে না গিয়ে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই ম্যাচটা জেতা সম্ভব।'
রোববারের মেগা ফাইনালে প্রতিপক্ষ দলে অনেকগুলো চেনা মুখের দেখা পাবেন মেসি।
স্পেনের স্কোয়াডের আটজনই মেসির ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ের সাক্ষী বার্সেলোনায় খেলেন।
মঙ্গলবার ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে ইউরো ২০২৪-এর চ্যাম্পিয়নেরা।
স্পেনের প্রশংসা করে মেসি বলেন, 'ওরা দুর্দান্ত দল। অসাধারণ কয়েকজন খেলোয়াড় আছে ওদের, যারা অসাধারণ ফুটবল খেলে।
'এই দলটাকে আমি ভালো করেই চিনি। ওদের খেলার একটা দর্শন আছে; বহু বছর ধরে ওরা এই ধারা বজায় রেখে খেলছে। স্পেনের খেলোয়াড়দের আমি চিনি—ওদের বিপক্ষে খেলেছি, ওদের খেলা নিয়মিত দেখি। বেশ কয়েকজন তো আমার ভালোবাসার ক্লাব বার্সাতেই খেলছে। ম্যাচটা বিশেষ, কারণ এটা বিশ্বকাপের ফাইনাল। আমার ধারণা, লড়াইটা সমানে-সমানে হবে।'
