লামিন ইয়ামাল নামের পেছনের গল্প: কার স্মরণে রাখা হয়েছিল স্প্যানিশ ফুটবল তারকার নাম?
রোববার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের হয়ে মাঠে নামবেন লামিন ইয়ামাল। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক এই ম্যাচ দেখবেন। আর এই দর্শকদের ভিড়ে হয়তো এমন দুজন মানুষও থাকবেন, বার্সেলোনার এই সুপারস্টারের জীবনে যাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। যদিও জনসমক্ষে তাদের পরিচয় আজও এক রহস্য।
গত সোমবার ১৯ বছর বয়সে পা দিয়েছেন ইয়ামাল। অধিকাংশ স্প্যানিশ নাগরিকের মতো ইয়ামালেরও দুটি পারিবারিক পদবি রয়েছে—একটি তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া 'নাসরাউই' এবং অন্যটি মায়ের দিক থেকে আসা 'এব্যানা'। তবে অনেক স্প্যানিশ ফুটবলারের মতো তিনিও নিজের প্রথম নামটি ব্যবহার করতেই বেশি পছন্দ করেন। এক্ষেত্রে তার প্রথম নামের দুটি অংশ রয়েছে; যেমনটি পিএসজি কোচ লুইস এনরিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
স্পেন ও বার্সেলোনা উভয় দলের জার্সিতেই তার নাম লেখা থাকে 'লামিন ইয়ামাল'। তবে পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার পুরো নাম—লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এব্যানা।
আরবিতে 'লামিন' বেশ জনপ্রিয় একটি নাম, যার অর্থ সৎ বা বিশ্বাসযোগ্য। এটি মূলত 'আল-আমিন' শব্দ থেকে এসেছে, যা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি উপাধি ছিল। অন্যদিকে 'ইয়ামাল' নামটি বহুল ব্যবহৃত আরবি নাম 'জামাল'-এর একটি ভিন্ন রূপ, যার অর্থ সৌন্দর্য বা লাবণ্য। যারা তাকে ফুটবল খেলতে দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে ইয়ামালের খেলার সঙ্গে নামের বেশ মিল রয়েছে।
২০০৭ সালের জুলাই মাসে স্পেনের কাতালুনিয়ায় একটি অভিবাসী পরিবারে জন্ম ইয়ামালের। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোতে এবং মা শিলা এব্যানা ইকুয়াটোরিয়াল গিনিতে জন্মগ্রহণ করেন।
স্প্যানিশ গণমাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইয়ামালের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক চমৎকার গল্প। ইয়ামালের বাবা-মা তাদের দুজন বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই নাম দুটি নির্বাচন করেছিলেন।
ইয়ামালের জন্মের সময় শিলা এব্যানার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। নতুন বাবা-মা হিসেবে সেই সময় পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে তাদের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। তখন মুনির ও শিলাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের দুই পারিবারিক বন্ধু। তাদের একজনের নাম ছিল 'লামিন' আর অন্যজনের 'ইয়ামাল'। সেই উপকারের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই তারা তাদের সন্তানের নাম রাখেন—লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এব্যানা।
সেই ছোট্ট শিশুটি আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে লিওনেল মেসির সঙ্গে তার একটি ছবি সম্প্রতি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১২ বছর বয়সে তিনি বাড়ি ছেড়ে বার্সেলোনার 'লা মাসিয়া' একাডেমিতে যোগ দেন। এরই মধ্যে বার্সার হয়ে লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন তিনি। ২০২৫ সালে হওয়া নতুন চুক্তি অনুযায়ী কর প্রদানের আগে বার্সেলোনায় তার বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো। এ ছাড়া অ্যাডিডাস, ভিসা, কোকা-কোলার মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের সাথেও তার বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে।
বড় তারকা হওয়ার পরও ইয়ামাল প্রায়ই তার ছোটবেলার কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। স্পেনের অন্যতম দরিদ্র ও অভিবাসীবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত মাতারোর রোকাফন্দা পাড়ায় তার বেড়ে ওঠা। গোল করার পর ইয়ামাল দুই হাত দিয়ে যে '৩০৪' ভঙ্গি করেন, সেটি মূলত ওই এলাকার পোস্টকোডের শেষের তিন ডিজিট।
গত জুলাইয়ের শুরুতে স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন কাদেনা এসইআর-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেন, 'দেখুন, আমার মায়ের যখন ১৬ বছর বয়স, তখন আমার জন্ম হয়। আমার বাবাকে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাইরে গিয়ে কাজ খুঁজতে হতো। এমনকি আমাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য তাকে মাঝেমধ্যে রাস্তা থেকে জিনিসও কুড়াতে হয়েছে। আমার কাছে এটাই হলো আসল চাপ, বর্তমানে আমি যে অবস্থায় আছি সেটি নয়।'
তবে সেই দুই বন্ধুর পরিচয় আজও আড়ালেই রয়ে গেছে। ইয়ামাল নিজে কখনো তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি। মুনির বা শিলাও তাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বা প্রকৃত সহায়তার বিষয়ে মুখ খোলেননি। হয়তো সেই দুই রহস্যময় ব্যক্তি নিজেদের আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন অথবা তারা চান না খেলোয়াড় ইয়ামালের দিক থেকে সব মনোযোগ তাদের দিকে চলে আসুক। তবে ১৯ বছর আগে দুই তরুণ বাবা-মায়ের প্রতি তারা যে উদারতা দেখিয়েছিলেন, আজ ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালকে দেখে তারা নিশ্চয়ই সেটির জন্য গর্ববোধ করছেন।
