সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারি মেসির জন্য ‘পয়মন্ত’; কে তিনি?
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড। যে রেফারিকে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার উপস্থিতিতে লিওনেল মেসির জয়ের হার ১০০ শতাংশ।
আজ রাতের এই ম্যাচ পরিচালনা করবেন মরক্কোতে জন্ম নেওয়া আমেরিকান রেফারি ইসমাইল এলফাত।
কে এই এলফাত?
৪৪ বছর বয়সি এই রেফারির জন্ম কাসাব্লাঙ্কায়। ১৮ বছর বয়সে সরকারি 'ডাইভার্সিটি লটারি টিকিট' জিতে আমেরিকায় পাড়ি দেন তিনি।
আট বছর বয়সে মাকে হারান এলফাত। পকেটে মাত্র ২০০ ডলার নিয়ে তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সেখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে ফুটবলও খেলতেন। ইউএসএল লিগ টু-তে অস্টিন লাইটনিং দলের স্ট্রাইকার ছিলেন তিনি।
রেফারিংয়ের মান নিয়ে অভিযোগ করতে গিয়ে নিজেই এই পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েন এলফাত। ২০১১ সালে স্থায়ীভাবে রেফারি হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরের বছরই মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) অভিষেক হয় তার।
এক দশক আগে পরীক্ষামূলক ভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। সেই সময় মাঠে প্রথম ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার হওয়া ম্যাচেও রেফারি দায়িত্ব পালন করেছিলেন এলফাত।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় এলফাতের হাঁটুতে মারাত্মক চোট লাগে। জোড়া অস্ত্রোপচারের পর এক বছরের বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাকে। এমনকি অবসরের চিন্তাও শুরু করেছিলেন তিনি।
রেফারি হিসেবে অভিজ্ঞতা
ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহারে পথপ্রদর্শক হওয়ার পাশাপাশি আরও দুটি কৃতিত্ব রয়েছে এলফাতের ঝুলিতে। ২০২০ ও ২০২২ সালে এমএলএসে বর্ষসেরা রেফারি নির্বাচিত হন তিনি।
গত বিশ্বকাপের জন্যও এলফাতকে বেছে নিয়েছিল ফিফা। সেবার তিনটি ম্যাচ খেলিয়েছিলেন তিনি।
পর্তুগাল বনাম ঘানা ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে তার অভিষেক। গ্রুপ পর্বের ওই ম্যাচে ৩-২ গোলে জেতে পর্তুগাল। তবে ফাউলের কারণে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একটি গোল বাতিল করে তাকে ক্ষুব্ধ করেছিলেন এলফাত। পরে অবশ্য একটি পেনাল্টিও দেন। তা থেকে গোল করেন পর্তুগিজ তারকা।
এছাড়া ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে জার্সি খুলে উদযাপন করায় ক্যামেরুনের ভিনসেন্ট আবুবকরকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন এলফাত।
গত বিশ্বকাপে রেফারি হিসেবে তার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট ছিল জাপান বনাম ক্রোয়েশিয়া প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল। টাইব্রেকারে সেই ম্যাচ জিতেছিল ক্রোয়েশিয়া।
এছাড়াও ২০১৯ সালে ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মেক্সিকোর ক্লাব মন্টেরির বিরুদ্ধে লিভারপুলের জয়ের ম্যাচটিও পরিচালনা করেছেন তিনি।
চলতি বিশ্বকাপ কেমন যাচ্ছে এলফাতের?
চলতি প্রতিযোগিতায় এখনও পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ খেলিয়েছেন এলফাত: নেদারল্যান্ডস ও জাপানের ২-২ ড্র হওয়া ম্যাচ, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে স্পেনের ১-০ গোলে জয়ের ম্যাচ এবং শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের বিরুদ্ধে নরওয়ের ২-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচ।
স্পেনের ম্যাচে পাউ কুবারসিকে বিপজ্জনক ট্যাকল করার জন্য স্টপেজ টাইমে অগাস্টিন কানোবিওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন তিনি। ব্রাজিলের ম্যাচে অবশ্য একটি স্পষ্ট পেনাল্টি চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল তার। পরে ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে সেই ভুল শুধরে নেন। একটি লাল কার্ড ছাড়াও এখনও পর্যন্ত আটজন ফুটবলারকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন এলফাত।
আর্জেন্টিনা ও মেসির সঙ্গে তার অতীত কেমন?
২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার ফাইনালে এলফাত চতুর্থ অফিসিয়াল ছিলেন। সেই ম্যাচে বিশ্বকাপ জেতার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান লিয়োনেল মেসি।
পরে এমএলএসের দল ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন মেসি। এরপর থেকে এ পর্যন্ত মেসি খেলেছেন, এমন পাঁচটি ম্যাচে রেফারিং করেছেন এলফাত। এর মধ্যে ২০২৩ সালের লিগস কাপ ফাইনাল রয়েছে। ন্যাশভিল এসসির বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে প্রথম গোলটি করেছিলেন মেসি। টাইব্রেকারে ১০-৯ ব্যবধানে জিতেছিল তার নতুন ক্লাব।
মায়ামির হয়ে মেসির খেলা আরও চারটি ম্যাচে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন এলফাত। সব কটিতেই জয় পেয়েছেন আর্জেন্টাইন তারকা। কাজেই এলফাতকে মেসির জন্য (এখন পর্যন্ত) 'পয়মন্ত' বলাই যায়।
'ফকল্যান্ডস নিয়ম' কী?
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ওঠায় ইংরেজ রেফারি মাইকেল অলিভারের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলানোর স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচটি খেলানোর অন্যতম দাবিদার ছিলেন অলিভার। ২০১০ সালে হাওয়ার্ড ওয়েবের পর প্রথম ইংরেজ রেফারি হিসাবে এই স্বপ্নের দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল তার সামনে।
কিন্তু নিজের দেশের ম্যাচে রেফারির দায়িত্ব পালনের নিয়ম এমনিতেই নেই। তার ওপর আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রেও অলিভারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ৪৪ বছর কেটে গেলেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের অধিকার নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনও রয়েছে। সেই কারণেই ইংরেজ রেফারির ওপর এই নিষেধাজ্ঞা।
একই কারণে ২০২২ সালের ফাইনালেও রেফারিং করার সুযোগ হারিয়েছিলেন আরেক ইংরেজ রেফারি অ্যান্টনি টেলর।
