এমবাপ্পের হাত ধরে বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে ফ্রান্স
ফরাসি জাতীয় দলের হতাশ হওয়ার সব রকম কারণই ছিল। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দলটি ফক্সবোরোর তীব্র গরমের মধ্যে বারবার মরক্কোর রক্ষণব্যূহ ভাঙার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কোনোভাবেই সফল হতে পারছিল না।
কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করলেন। উসমান ডেম্বেলেকে বেশ নির্লিপ্ত দেখাচ্ছিল। আর পুরো মাঠজুড়ে যেন ছড়িয়ে ছিল মরক্কোর লাল জার্সির এক দুর্ভেদ্য দেয়াল।
তবে ঠিক তখনই ফরাসিরা সেই চিরাচরিত ধৈর্যের পরিচয় দিল, যা বিশ্বকে আর্ট হাউস সিনেমা, দীর্ঘ মধ্যাহ্নভোজ কিংবা মার্সেল প্রুস্তের কালজয়ী সাহিত্যের মতো সৃষ্টি উপহার দিয়েছে। এই অপেক্ষার ফলও তারা পেল হাতেনাতে। কোয়ার্টার ফাইনালের এক ঘণ্টার ম্যাড়মেড়ে লড়াই শেষে ফ্রান্স আবারও প্রমাণ করল যে বিশ্ব ফুটবলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো বিকল্প নেই।
মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে স্টেডিয়ামে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মরক্কোর দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয় ফ্রান্স। ২-০ গোলের এই জয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করল তারা। এবার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি স্পেনের।
এবারের বিশ্বকাপে টিকে থাকা অন্য দলগুলোর কাছে সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো ম্যাচের ওপর ফরাসিদের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। মরক্কোর বিপক্ষে বল দখলে খুব একটা এগিয়ে না থাকলেও, লে ব্লুজদের একবারের জন্যও কোনো বিপদে পড়তে দেখা যায়নি। মরক্কোর মাত্র ৪টি শটের বিপরীতে ফ্রান্স শট নিয়েছে ২১টি। শুধু তা-ই নয়, তিন ম্যাচেরও বেশি সময় অর্থাৎ প্রায় পাঁচ ঘণ্টা তারা কোনো গোলই হজম করেনি।
মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, 'তাদের আক্রমণভাগে অবিশ্বাস্য রকমের প্রতিভাবান সব খেলোয়াড় রয়েছে—আর তারা অনবরত দৌড়ায়। তারা সহজে হতাশ হয় না।'
ফলে প্রতিপক্ষ দলগুলোর নিজেদের বক্সে বসে থাকা এবং কাউন্টার অ্যাটাক (পাল্টা আক্রমণ) থেকে গোল বের করার সুযোগ খোঁজা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অন্যদিকে ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তারা শান্ত থেকে সঠিক সুযোগের অপেক্ষা করতে জানে এবং তারা নিশ্চিত যে সুযোগ আসবেই।
অবশ্য দলে যখন এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা দুয়ের মতো খেলোয়াড় থাকে, তখন ধৈর্য ধরে রাখাটা অনেক সহজ। কারণ এরা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। আর মরক্কোর সঙ্গে প্রথম গোলটি করার ক্ষেত্রে ঠিক এমনটিই করে দেখালেন তারা।
দুয়ে শূন্যে ভেসে আসা একটি বল দারুণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল এমবাপ্পের দিকে বাড়িয়ে দেন। ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ফাঁকা জায়গা বুঝে ফার পোস্টে নিখুঁত এক বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান। এটি ছিল চলতি টুর্নামেন্টে তার অষ্টম গোল, যা তাকে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সাথে যৌথভাবে শীর্ষ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। এর মাধ্যমে এমবাপ্পে তার ক্যারিয়ারের ২০টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ২০টি গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেন।
ম্যাচের ২৮ মিনিটে পেনাল্টি মিস না করলে তার গোলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। বক্সে এমবাপ্পেকে ফাউল করা হলে ফ্রান্স পেনাল্টি পায়। কিন্তু দীর্ঘ ভিডিও রিভিউয়ের (ভিএআর) কারণে তাকে শট নেওয়ার আগে ৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন তিনি শট নিলেন, সেটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু সহজেই তার বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি আটকে দেন।
তবে এমবাপ্পে এখনই সন্তুষ্ট নন। নিজের দলকে ফাইনালে না তোলা পর্যন্ত তিনি শান্ত হচ্ছেন না।
