গাজায় ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’: রুবিও, ব্লেয়ার-কুশনারসহ আরও যারা থাকছেন
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে ২০ দফার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ লক্ষ্যে তিনি গঠন করেছেন 'বোর্ড অব পিস' বা 'শান্তি পর্ষদ'। এই বোর্ডে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে অন্যতম সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাম্প।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, টনি ব্লেয়ার এই বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্যদের একজন হবেন। তার সঙ্গে এই বোর্ডে আরও থাকছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
বোর্ডের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী (সিইও) মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নবগঠিত এই বোর্ডের সদস্যরা গাজার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তদারকি করবেন। তাদের কাজের মধ্যে থাকবে—গাজার প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো, আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, বুলগেরিয়ার কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভ গাজার জন্য 'হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ' হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এর পাশাপাশি গাজার শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে 'গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড' নামে আরেকটি পর্ষদের সদস্যদের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। ব্লেয়ার, কুশনার ও উইটকফ এই বোর্ডেও থাকছেন।
তাদের সঙ্গে এই বোর্ডে আরও যুক্ত হচ্ছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং কাতারের কূটনীতিক আলী আল থাওয়াদি।
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, গাজার নিরাপত্তার জন্য গঠিত 'ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স' বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মার্কিন মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্সকে।
জেফার্স বর্তমানে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হোয়াইট হাউস জানায়, গাজায় নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং এলাকাটি পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণে এই বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে যে হামাসকে তাদের সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। তবে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস বরাবরই বলে আসছে, অস্ত্র জমা দেওয়ার আগে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
গাজার শাসনব্যবস্থা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় গঠিত 'গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড' মূলত 'অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ' এবং 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা' (এনসিএজি)-কে সহায়তা করবে।
হামাসের পরিবর্তে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য এনসিএজি গঠন করা হয়েছে। এর নেতৃত্বে থাকবেন আলী শাথ। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সাবেক উপ-পরিবহনমন্ত্রী। তার বাড়ি গাজার খান ইউনিসে হলেও তিনি বর্তমানে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাস করেন।
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন স্টিভ উইটকফ। এর কয়েক দিন পরই শুক্রবার হোয়াইট হাউস নতুন এই বোর্ডের ঘোষণা দিল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসন বলছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি এখন 'যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট বা কারিগরি শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের' দিকে এগোচ্ছে।
তবে ফিলিস্তিনিরা প্রশ্ন তুলেছেন, বাস্তবে এসবের অর্থ কী? কারণ, গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল তা লঙ্ঘন করে চলেছে। গাজাজুড়ে তারা এখনো প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে শুক্রবার কায়রোতে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির সদস্যরা। ঠিক একই দিন গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১০ বছর বয়সী এক শিশু, ১৬ বছরের এক কিশোর ও এক বয়োজ্যেষ্ঠ নারী নিহত হন।
'বোর্ড অব পিস'-এ টনি ব্লেয়ারের অংশগ্রহণ নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। কয়েক মাস আগে যখন এই পর্ষদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম সামনে আসে, তখনই সমালোচনার ঝড় ওঠে।
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক এই নেতা ২০০০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ'-এর কট্টর সমর্থক ছিলেন। ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আগ্রাসনেও তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
বোর্ডের আরেক নির্বাহী সদস্য এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অতীতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের শাসন নিজেরা করতে সক্ষম নয়।
কুশনারের পরিবারের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
২০২৪ সালে কুশনার গাজার উপকূলীয় এলাকাকে 'অত্যন্ত মূল্যবান' সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েলের উচিত সেখান থেকে 'মানুষজনকে সরিয়ে এলাকাটি পরিষ্কার করে ফেলা'।
তবে এই বোর্ড গঠনের পরপরই শুরু হয়েছে কড়া সমালোচনা। টনি ব্লেয়ারের সাবেক সহযোগী আশিস প্রাশার গাজার ওপর এমন আন্তর্জাতিক ট্রাস্টিশিপ বা অভিভাবকত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, 'ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ একমাত্র ফিলিস্তিনিরাই ঠিক করবেন।'
এক বিবৃতিতে আশিস প্রাশার বলেন, 'মনে হচ্ছে গাজার এই 'শান্তি পর্ষদে' যোগ দেওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হলো—ইসরায়েলের গণহত্যা, বর্ণবাদ ও জাতিগত নিধনযজ্ঞকে সমর্থন করা এবং যারা এর বিরোধিতা করেন, তাদের অপরাধী সাব্যস্ত করা।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, 'ট্রাম্পের এই 'বোর্ড অব পিস' আসলে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। ভেনিজুয়েলা, ইউক্রেন বা অন্য যেকোনো দেশে আমেরিকার শোষণমূলক শাসন কায়েম করার পথ প্রশস্ত করতেই যারা সায় দিয়েছে, তারাই এই বোর্ডের অনুমোদন দিয়েছে।'
