ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিচ্ছেন যুদ্ধাপরাধের পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গাজা বিষয়ক 'বোর্ড অব পিস' বা শান্তি বোর্ডে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা সত্ত্বেও বুধবার এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছে, ইসরায়েলি নেতা ট্রাম্পের এই উদ্যোগে যোগ দেবেন। গাজায় ইসরায়েলি 'গণহত্যা' বন্ধে হামাসের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে এই 'শান্তি বোর্ড' জনসমক্ষে আনা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বোর্ড গাজার 'শাসন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সম্পর্ক, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ এবং পুঁজি সঞ্চালনের' বিষয়গুলো তদারকি করবে। তবে এই বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ ট্রাম্প নিজেই এর নেতৃত্বে থাকবেন এবং এর সদস্য তালিকা নিয়ন্ত্রণ করবেন।
নেতানিয়াহুর যোগদানের বিষয়টি বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এর আগে তার কার্যালয় এই বোর্ডের নির্বাহী কমিটির গঠন নিয়ে সমালোচনা করেছিল। উল্লেখ্য, ওই কমিটিতে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কও রয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের জন্য আইসিসি কর্তৃক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নেতানিয়াহু একাই নন যাদের এই বোর্ডে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অভিযুক্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও সোমবার এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা এই প্রস্তাবের সব 'খুঁটিনাটি বিষয়' স্পষ্ট করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে পুতিন যোগ দিচ্ছেন কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এছাড়া পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোকেও ট্রাম্প আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এর আগে বলেছিল, এই নির্বাহী কমিটির সাথে ইসরায়েল সরকারের কোনো সমন্বয় নেই এবং এটি তাদের 'নীতির পরিপন্থী'। তবে কেন তাদের আপত্তি ছিল তা স্পষ্ট করা হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই বোর্ডের সমালোচনা করেছেন এবং গাজার ভবিষ্যতের জন্য ইসরায়েলকে একতরফা দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো, ভিয়েতনাম, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান ও আর্জেন্টিনা। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে যে তারা আমন্ত্রণ পেলেও এখনও কোনো উত্তর দেয়নি। এছাড়া এই নির্বাহী বোর্ডে সদস্য হিসেবে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং ট্রাম্পের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।
হোয়াইট হাউস 'গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড' নামে আরেকটি বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছে, যারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির কঠিন দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাইডলাইনে এই শান্তি বোর্ডের সনদে সই করার পরিকল্পনা করেছেন। বুধবার পরবর্তীতে সেখানে তার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই বোর্ডের পরিধি গাজার বাইরে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংকট ও সংঘাত নিরসনেও সম্প্রসারিত করতে চান।
এটি এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে যে, ট্রাম্প সম্ভবত এর মাধ্যমে জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে চাইছেন, যাকে তিনি বারবার 'অকার্যকর' বলে সমালোচনা করেছেন। মঙ্গলবার এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, জাতিসংঘের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া উচিত কারণ এর 'ব্যাপক সম্ভাবনা' রয়েছে। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, শান্তি বোর্ড সম্ভবত দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে, কারণ জাতিসংঘ 'খুব একটা সহায়ক হয়নি' এবং এটি 'কখনও তার সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি'।
এর প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছেন যে, বেইজিং 'দৃঢ়ভাবে জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা এবং জাতিসংঘের সনদের লক্ষ্য ও নীতিকে সমর্থন করে'।
শান্তি বোর্ড মূলত যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনের জন্য ভাবা হলেও প্রতিবেদন অনুযায়ী এর সনদে এর ভূমিকা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। জানা গেছে, এই বোর্ডে একটি স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে ১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। বুধবার আজারবাইজান জানিয়েছে যে তারা যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। তবে সুইডেন স্পষ্ট করেছে যে, এখন পর্যন্ত সনদের যে বয়ান পেশ করা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে তারা এতে অংশগ্রহণ করবে না।
