দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা
ক্রমবর্ধমান চাহিদা, গ্যাস সংকট, বাড়তে থাকা আমদানিনির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন কাঠামোগত সংকটের মুখে রয়েছে। এই বাস্তবতায় আগামী ২৫ বছরের জন্য নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫ প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং টেকসই সবুজ জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া।
গত ৭ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫ করা হয়। গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসা এবং ভর্তুকির বোঝায় হিমশিম খেতে থাকা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এই পরিকল্পনায় বিপুল বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান টিবিএসকে বলেন, মহাপরিকল্পনাটির খসড়া প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে; তিনি এটি প্রণয়নে সম্মতি দিয়েছেন।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, 'আমরা ইতিমধ্যেই খসড়াটি প্রস্তুত করেছি। এটি এখন জনগণের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা তাদের মতামত জানাতে পারেন।'
তিনি আরও বলেন, 'অংশীজনদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার পর মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত ও অনুমোদন করা হবে, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার কাজ করার জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো হাতের কাছে পায়।'
নতুন এই পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে ২০৫০ সালে প্রাথমিক জ্বালানির আমদানি ৫০ শতাংশের এর নিচে নেমে আসবে। একইসঙ্গে দেশীয় গ্যাসের অংশ বাড়িয়ে অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে একদিকে দেশে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, আরেকদিকে প্রাকৃতিক মজুত কমে আসছে। এর ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও তেলের আমদানিনির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে চারগুণ
পরিকল্পনার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, বর্তমানে যেখানে দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা, সেখানে ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৪০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। পিক ডিমান্ড বাড়তে পারে প্রায় ৫৯ গিগাওয়াটে। তবে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের চাহিদা তখন ৭০ গিগাওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, বর্তমানে তা ২ শতাংশেরও কম। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
নবায়নযোগ্য শক্তিতে গুরুত্ব
২০২৬ সালের মধ্যে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং ২০৩৩ সালের পর বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় ৭৬৫ কেভি জাতীয় ট্রান্সমিশন ব্যাকবোন, স্মার্ট গ্রিড ও স্বয়ংক্রিয় পরিচালনা ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
ভর্তুকি হ্রাস
এই পরিকল্পনার একটি অন্যতম দিক হলো ধীরে ধীরে ঢালাও ভর্তুকি প্রত্যাহার করা। নীতিনির্ধারকরা স্বীকার করেছেন, বর্তমান ভর্তুকিনির্ভর মডেলটি আর্থিকভাবে টেকসই নয়। এজন্য ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট ভর্তুকি প্রদান ও বিদ্যুৎ ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে রোডম্যাপের।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ
মহাপরিকল্পনার খসড়ায় নথিতে জ্বালানি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, চরম আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও চাহিদার অবাস্তব পূর্বাভাসের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে সরকারকে বিপুল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে।
সিস্টেম লস এ খাতের আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। বর্তমানে টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল কারণে ৬.৩৮ শতাংশ সিস্টেম লস হয়। এ খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে বলে জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, দেশীয় কয়লার ব্যবহার তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও এর সদ্ব্যবহার করার সুযোগটি কাজে লাগানো হয়নি।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নতুন কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়ার সফলতা বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশে ১.৩ টি কুপ খনন করলে একটি কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু বিশ্বে গড়ে ১০টি কুপ খনন করলে একটি কূপে গ্যাস পাওয়া যায়। এরপরও এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মাত্র ১০০টি নতুন কূপ খনন করা হয়েছে—অর্থাৎ বিপুল সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো হয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশে সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগও অপর্যাপ্ত। বর্তমানে টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল কারণে ৬.৩৮ শতাংশ সিস্টেম লস হচ্ছে। তাছাড়া অবাস্তবভাবে চাহিদা নির্ধারণ করে বাড়তি সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যে কারণে বিপুল পরিমাণে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে বলে জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই খসড়া পরিকল্পনায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ভবিষ্যতে কেমন হতে পারে, তার প্রক্ষেপণও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪.৪৬ শতাংশ হতে পারে। ভবিষ্যতে এই প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।
বাস্তবায়নের রূপরেখা
এ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। এ বছরই উপকূলে ও গভীর সমুদ্রে কূপ খননের দরপত্র আহ্বান করা হবে। টু-ডি ও থ্রিডি সিসমিক জরিপ করা হবে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে এই সময়ে ৭,৭৫৫ লাখ কিলোমিটার টু-ডি সিসমিক জরিপ ও ৫,৬৭৪ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক জরিপ করা হবে।
চলতি বছরই চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে থ্রিডি সিসমিক জরিপ শুরু করার কথা বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। কৌশলের অংশ হিসেবে এলএনজি আমদানি, ইষ্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপন করা হবে। এছাড়া বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের অ্যাসেসমেন্ট করা হবে। অন্যদিকে গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকিতে শৃঙ্খলা আনা এবং গ্যাসের অপচয় কমানো হবে।
সরকার আশা করছে, ২০৩০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে অফশোর থেকে নতুন গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে। এই সময়ে মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল চালু হবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে এবং দীঘিপাড়া ও জামালগঞ্জ কয়লাখনি উন্নয়ন সম্ভব হবে।
২০৪০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাপকভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার শুরু হবে। এছাড়া এ সময়ে হাইড্রোজেন জ্বালানির ব্যবহারেরও সূচনা হবে।
এ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলে ২০৫০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ৭০ হাজার ৩০ মেগাওয়াট। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলে ২০৫০ সালে ৫৯ হাজার ৩৫১ মেগওয়াট ও নিম্নমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলে ওই সময়ে ৫৪ হাজার ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে।
খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুতের ৪৫ শতাংশ উৎপাদন হয় গ্যাস থেকে। কয়লা থেকে ২১ শতাংশ, জ্বালানি থেকে ১৭ শতাংশ, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ৯ শতাংশ ও বাকি ৮ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়।
২০৫০ সালে এই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের অংশ কমে ২৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে সরকার। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন দাড়াবে ৩৬ শতাংশ। আর ১১ শতাংশে বিদ্যুৎ আসবে বায়ুবিদ্যুৎ থেকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে আসবে ৫ শতাংশে, কয়লা থেকে ১৫ শতাংশে ও জ্বালানি তেল থেকে ১ শতাংশে এবং মাত্র ৩ শতাংশে বিদ্যুৎ আমদানি হবে।
বিনিয়োগ চাহিদা
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলে খসড়া মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।
এরমধ্যে এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপনে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার, স্থলভাগে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১০-১২ বিলিয়ন ডলার। রিফাইনারি ও স্টোরেজ স্থাপনে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার, হাইড্রোজেন ও জিওথার্মাল জ্বালানিতে ২-৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগবে।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, অনুসন্ধান ও পাইপলাইন স্থাপনের কাজে সরকারি বিনিয়োগ লাগবে। রিফাইনারি, এলএনজি টার্মিনাল ও সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপনে অন্য দেশের সরকারের সাথে (জিটুজি) চুক্তি করে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। আর এলপিজি টার্মিনাল স্থাপনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) পন্থায় বিনিয়োগ পাওয়া যেতে পারে।
পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, বিনিয়োগ সক্ষমতা অর্জনের জন্য সরকারকে অবশ্যই ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটতে হবে এবং চাহিদাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে যেতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আরও বেশি লাগবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ খাতে ১০৭.২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগতে পারে।
এই অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৮৫.১৫ বিলিয়ন ডলার, সঞ্চালনে ১১.৪৫ বিলিয়ন ডলার ও বিতরণে ১০.৬৫ বিলিয়ন লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল, জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে, পিপিপি ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) মাধ্যমে আসতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে পরিকল্পনায়।
ট্যারিফ পূর্বাভাস
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বাড়বে। এমনকি চলতি বছরেই গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে এতে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৭ মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টা বিদ্যুতের গড় দাম হবে ১৩.৬৬ টাকা। বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টা বিদ্যুতের গড় দাম ৭.৩৪ টাকা। একইভাবে ২০৫০ সালে প্রতি ঘনফুট গ্যাসের গড় দাম হবে ৬৫ টাকা, যা বর্তমানে রয়েছে ২২.৯৩ টাকা।
পরিবেশ ও জলবায়ু প্রসঙ্গ
২০৫০ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ খাতে বছরে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে পরিকল্পনায়। কার্বন ক্রেডিট থেকে সম্ভাব্য আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদুৎ খাতে বছরে ২৭০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। তবে আইএমএফ ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তূকি শূন্য করার শর্ত দিয়েছে।
বিপুল ভর্তুকি
খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, অতীতে সীমিত গ্যাস অনুসন্ধান, অবাস্তব বিদ্যুৎ চাহিদা পূর্বাভাস এবং দ্রুত তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে আজকের এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি আমদানি ও ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে বাধ্য করছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যাকে অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
গত ১৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।
অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, খসড়া মহাপরিকল্পনায় যথাযথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিফলন নেই। তিনি বলেন, এখানে 'রিসোর্স অপটিমাইজেশনের নাম করে' অভ্যন্তরীণ কয়লাকে ব্যবহারের জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া 'সৌরবিদ্যুতের নাম ব্যবহার করে' অন্যান্য যে জ্বালানি কার্বন নির্গমন করে, সেগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, খসড়া মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামোকে বিপুল বিনিয়োগের জন্য সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। আগের মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩.৯ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু খসড়া মহাপরিকল্পনায় এ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এ ধরনের প্ল্যান বা পলিসি ডকুমেন্ট শুধু অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট নয়। এটা 'একধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক' ডকুমেন্ট। কারণ, অনেক জায়গায় সরকারকে সমঝোতা করতে হয়, ছাড় দিতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর যে লক্ষ্য, সে জায়গা থেকে সরকার সাধারণত পিছপা হন না। কিন্তু এই ডকুমেন্ট (খসড়া মহাপরিকল্পনা) দেখে সিপিডি মনে করছে, এটার পেছনে প্রেশার গ্রুপগুলোর চাপ রয়েছে।
