মাখোঁসহ অন্য ইউরোপীয় নেতাদের ব্যক্তিগত মেসেজের স্ক্রিনশট ফাঁস করলেন ট্রাম্প, কী আছে তাতে
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনের ঠিক আগেই গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁসহ একাধিক ইউরোপীয় নেতাদের সাথে ব্যক্তিগত কিছু খুদে বার্তার স্ক্রিনশট ফাঁস করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে স্ক্রিনশটগুলো প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
কূটনীতি মানেই যেখানে গোপনীয়তা এবং পর্দার আড়ালের আলোচনা, সেখানে এমন সরাসরি বার্তা ফাঁস হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিবিসি এই বার্তাগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ করেছে। এই বার্তার অন্তর্নিহিত অর্থ এবং এর কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, সাথে তা-ও নিচে তুলে ধরা হলো:
(১৮ জানুয়ারি, বিকাল ৩টা ৪৮ মিনিট)
'প্রিয় মিস্টার প্রেসিডেন্ট, প্রিয় ডোনাল্ড—আটলান্টিকের এপার-ওপার যোগাযোগ বজায় রাখা নিয়ে, গ্রিনল্যান্ড, গাজা ও ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং গতকাল আপনার ঘোষিত শুল্ক আরোপের বিষয়ে কথা বলতে চাই।
আপনি এসব বিষয়ে আমাদের অবস্থান জানেন। তবে আমরা বিশ্বাস করি, উত্তেজনা কমাতে আমাদের সবার একসঙ্গে কাজ করা উচিত। চারদিকে অনেক কিছু ঘটছে, যেখানে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।
আমরা আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই—আমরা দুজন একসঙ্গে বা আলাদাভাবে। আপনি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, আমাদের জানাবেন।
শুভেচ্ছা—আলেক্স (ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব) ও ইয়োনাস।'
ট্রাম্পের জবাব (১৮ জানুয়ারি, বিকাল ৪টা ১৫ মিনিট):
'প্রিয় ইয়োনাস: আটটিরও বেশি যুদ্ধ থামানোর পরেও যেহেতু তোমাদের দেশ আমাকে 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই এখন আর শুধু শান্তি নিয়ে ভাবার কোনো বাধ্যবাধকতা আমি অনুভব করি না। যদিও শান্তিই সবসময় আমার কাছে প্রধান্য পাবে, তবে এখন আমি এটিও ভাবতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো ও সঠিক কোনটা।
ডেনমার্ক এই ভূখণ্ডকে (গ্রিনল্যান্ড) রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তাছাড়া তাদের 'মালিকানার অধিকার' আছেই বা কেন? এর কোনো লিখিত দলিল নেই। শত শত বছর আগে স্রেফ একটি নৌকা সেখানে পৌঁছেছিল বলেই কি তারা মালিক? আমাদের নৌকাও তো সেখানে গিয়েছিল। ন্যাটোর প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্য যে কারো চেয়ে আমি এই জোটের জন্য বেশি করেছি। এখন ন্যাটোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু করা।
গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমাদের পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্ব নিরাপদ নয়।
ধন্যবাদ!
প্রেসিডেন্ট ডিজেটি'
ন্যাটোর সাবেক মুখপাত্র ওআনা লুঙ্গেস্কু বিবিসিকে বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনেক দিন ধরেই বদলে যাচ্ছে, আর এটি কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একার কারণে নয়।
তিনি বলেন, 'বিশ্বনেতাদের ব্যক্তিগত বার্তা এভাবে জনসমক্ষে আসাটা বেশ অস্বাভাবিক। কিন্তু এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমক্ষে কূটনীতি পরিচালনার একটি অংশ। একে আপনি 'মেগাফোন ডিপ্লোম্যাসি' বলতে পারেন।'
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক ওয়েলার, যিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তিনিও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, 'সাধারণত উচ্চপর্যায়ের সরকারি আলোচনাগুলো খুব সতর্কভাবে ও পূর্বপরিকল্পিতভাবে লেখা হয়, যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ না থাকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এটি কোনো সমস্যাই নয়, কারণ তিনি প্রচলিত নিয়ম ভাঙতেই পছন্দ করেন।'
তবে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, নরওয়ের মতো ধীরস্থির স্বভাবের দেশগুলোও এখন পাল্টা জবাব দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'বোঝাই যাচ্ছে যে, তারা এখন আগুনের মোকাবিলা আগুন দিয়েই করতে চাইছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার হারিয়ে যাওয়ার প্রতি এটি তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।'
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর পর আজ মঙ্গলবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর পাঠানো ব্যক্তিগত মেসেজ ফাঁস করে দেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ মাখোঁর পাঠানো বার্তার একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেন তিনি।
মাখোঁর পাঠানো বার্তায় যা ছিল (১৯ জানুয়ারি):
'বন্ধু আমার,
সিরিয়া ইস্যুতে আমরা পুরোপুরি একমত। ইরান নিয়ে আমরা দুর্দান্ত কিছু করতে পারি। তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আপনি কী করছেন, তা আমি মোটেও বুঝতে পারছি না। চলুন, বড় কিছু করার চেষ্টা করি:
১. দাভোস সম্মেলনের পর আগামী বৃহস্পতিবার বিকেলে আমি প্যারিসে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর একটি বৈঠকের আয়োজন করতে পারি। সেখানে ইউক্রেন, ডেনমার্ক, সিরিয়া ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
২. আপনার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আগে বৃহস্পতিবার রাতে প্যারিসে আমরা একসঙ্গে ডিনার করতে পারি।
ইতি—ইমানুয়েল।'
ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই বার্তা ফাঁস হওয়াকে মাখোঁর জন্য 'বিব্রতকর' বলে মনে করছেন সাবেক ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া-জোসেফ শিকান। তিনি বিবিসিকে বলেন, 'বার্তার শুরুতেই মাখোঁ এমন কিছু স্বীকার করেছেন যা তিনি জনসমক্ষে বলেননি—তা হলো গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের আচরণ তিনি বুঝতে পারছেন না। এটি তাঁর জন্য ক্ষতিকর, কারণ কেউ এভাবে জনসমক্ষে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চান না।'
শিকান আরও উল্লেখ করেন, যদিও জি-৭ বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া কোনো ভুল নয়, কিন্তু যেভাবে ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস হয়ে গেল, তা মাখোঁর জন্য অস্বস্তিকর। তিনি বলেন, 'মাখোঁ প্রথাগত কূটনীতির চেষ্টা করছেন। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তা কাজ করছে না। মাখোঁ পরিকল্পনা করছেন ব্যক্তিগতভাবে, আর ট্রাম্প সেই ব্যক্তিগত বার্তা সরাসরি ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করে পরিকল্পনাটি ভেস্তে দিচ্ছেন।'
শিকানের মতে, এটি বিশ্ব কূটনীতির এক চরম পতনের চিত্র। তিনি বলেন, 'আগে বিশ্বনেতারা একে অপরের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে ভরসা পেতেন। কিন্তু এখন আপনি জানেন না যে আপনার ব্যক্তিগত আলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেষ হবে কি না।'
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ও ফরাসি প্রেসিডেন্টের পর ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের ব্যক্তিগত বার্তাও ফাঁস করেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি রুটের পাঠানো বার্তার একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করেছেন।
রুটের পাঠানো বার্তায় যা ছিল (২০ জানুয়ারি):
'মিস্টার প্রেসিডেন্ট, প্রিয় ডোনাল্ড—সিরিয়ায় আজ আপনি যা অর্জন করেছেন তা অবিশ্বাস্য। দাভোসে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি সিরিয়া, গাজা এবং ইউক্রেন ইস্যুতে আপনার সফল কর্মকাণ্ডের কথা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরব। আমি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে একটি সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছি।
ইতি—মার্ক।'
ন্যাটোর সাবেক মুখপাত্র ওআনা লুঙ্গেস্কু মনে করেন, এভাবে ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস হওয়া অত্যন্ত 'অস্বাভাবিক'। তিনি বলেন, অনেক বিশ্বনেতা জনসমক্ষে কঠোর অবস্থান দেখালেও আড়ালে বেশ নমনীয়ভাবে কথা বলেন। তবে মার্ক রুট জনসমক্ষে ও আড়ালে একই ধরণের কথা বলছেন।
লুঙ্গেস্কু সতর্ক করে বলেন, ব্যক্তিগত আলাপ যখন আর গোপন থাকে না, তখন তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শনের এই প্রবণতা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের বদলে বাগযুদ্ধকে উসকে দেয়। তিনি মনে করেন, এর ফলে নেতারা হয়তো খুদে বার্তার বদলে আবারও সরাসরি দেখা করা বা ফোনে কথা বলার মতো পুরোনো প্রথাগত কূটনীতিতে ফিরে যাবেন।
চ্যাটাম হাউসের আন্তর্জাতিক আইনের পরিচালক ও সাবেক জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ মার্ক ওয়েলার বলেন, যেকোনো সংকটের সময় তাৎক্ষণিক ও গোপনীয় আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এভাবে সবকিছু প্রকাশ করে দেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা গোপন কূটনৈতিক সংকট নিরসন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
