বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারে পালন করা বিলুপ্তপ্রায় ৩২ বোস্তামী কাছিম পুকুরে অবমুক্ত
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক বায়েজিদ বোস্তামী মাজারে প্রকৃতি সংরক্ষণে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সেখানে অতি বিপন্ন প্রজাতির বোস্তামী কাছিমের (নিলসোনিয়া নাইগ্রিকানস) ৩২টি বাচ্চা সফলভাবে বড় করে মাজারের প্রধান পুকুরে অবমুক্ত করা হয়েছে।
গত ১৫ জানুয়ারি এসব কাছিম পুকুরে ছাড়া হয়। বাংলাদেশের অন্যতম বিপন্ন এই প্রজাতি সংরক্ষণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাজার কর্তৃপক্ষ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা এনজিও 'ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স' (সিসিএ)-এর যৌথ উদ্যোগে এই সাফল্য এসেছে। ২০১৯ সাল থেকে তারা এখানে কাছিমের সংখ্যা বাড়াতে কাজ করছে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর সেগুলোকে একটি সংরক্ষিত নার্সারি পুকুরে প্রায় ছয় মাস ধরে যত্নসহকারে বড় করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পদ্ধতিতে বন্য পরিবেশে কাছিমগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
সিসিএ-এর অ্যানিমেল ম্যানেজমেন্ট পরিচালক ফাহিম জামান বলেন, 'বায়েজিদের এই প্রজাতির জন্য এটি একটি বড় মাইলফলক। ২০১৯ সালে আমরা যখন প্রথম পুকুরটি পর্যবেক্ষণ করি, তখন কাছিমের বাচ্চা ছিল বললেই চলে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডিম ফোটানো এবং নার্সারিতে বড় করার ফলে এখন প্রাকৃতিকভাবে এদের সংখ্যা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে।'
শিকারি প্রাণী থেকে ডিম রক্ষা
ডিম পাড়ার মৌসুমে কাছিমের ডিম শিকারি প্রাণী ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়ে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা ডিমের বাসা শনাক্ত করে সেগুলো নিরাপদ বাক্সে স্থানান্তর করেন, ফলে ডিম ফোটার হার বাড়ে। পরে বাচ্চাগুলোকে মূল পুকুরে ছাড়ার আগে কয়েক মাস আলাদা একটি পুকুরে বড় করা হয়।
আগে সরাসরি মূল পুকুরে বাচ্চা ছাড়া হলেও তখন অনেক বাচ্চাই অন্য প্রাণীর শিকারে পরিণত হতো। বর্তমানে মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে একটি বিশেষ পুকুরে বাচ্চাগুলো বড় করা হয়, যাতে তারা মূল পুকুরে টিকে থাকার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এ বিষয়ে ফাহিম জামান বলেন, 'পাঁচ থেকে ছয় মাস নিয়ন্ত্রিত পুকুরে রাখলে বাচ্চাগুলো নিরাপদ আকারে পৌঁছায়। কেবল তখনই তাদের মূল পুকুরে ছাড়া হয়।'
মাজার কর্তৃপক্ষের ভূমিকা
মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান জানান, ২০০৪ সালে দুর্বৃত্তরা বিষ প্রয়োগ করে কাছিম মারার চেষ্টা করার পর থেকেই সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়। তিনি বলেন, 'বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের সহায়তায় আমরা কাছিম রক্ষায় পদক্ষেপ নিই। পরে সিসিএ-এর সঙ্গে যুক্ত হই, যাতে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, মাজারে আসা অনেক ভক্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুকুরে রাক্ষুসে মাছ ছেড়ে দেন, যা ছোট কাছিমদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই নার্সারিতে আলাদাভাবে বাচ্চা বড় করাটা অত্যন্ত জরুরি।
বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা প্রজাতি
বোস্তামী কাছিম আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় 'অতি বিপন্ন' হিসেবে তালিকাভুক্ত। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এই প্রজাতি কেবল বাংলাদেশ, ভারতের কিছু অংশ এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমিতভাবে টিকে আছে। ফলে বায়েজিদ মাজারের পুকুরটি এদের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল। একসময় ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার ও দূষণের কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
সাধারণত বায়েজিদ পুকুরের কাছিমগুলো বন্য পরিবেশের কাছিমের তুলনায় আকারে বড় হয় এবং দৈর্ঘ্যে এক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এই প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে মাজার কর্তৃপক্ষ, সরকারি সংস্থা ও বন্যপ্রাণী সংগঠনগুলোর অব্যাহত সহযোগিতা অপরিহার্য।
ফাহিম জামান বলেন, 'এই পুকুরটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি বিলুপ্তির সঙ্গে লড়াই করা কাছিমের অন্যতম শেষ অভয়ারণ্য।'
