সাভারে ৬ খুনে অভিযুক্ত সবুজের অপরাধের দীর্ঘ তালিকা: উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য
সাভারে মাত্র ৬ মাসে ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া সবুজ শেখের অপরাধের এক দীর্ঘ ও ভয়ংকর ইতিহাস উঠে আসছে। স্থানীয়দের কাছে 'মানসিক ভারসাম্যহীন' হিসেবে পরিচিত এবং মশিউর রহমান সম্রাট নামে ছদ্মবেশ ধারণ করা এই ব্যক্তির বিষয়ে তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে সাভার মডেল থানায় দুটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের রেকর্ডের পর এবার তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের একটি পুরনো হত্যা মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে।
সাভার মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে সাভারের শাপলা হাউজিং এলাকায় জুবায়ের ওরফে শাওন (৩০) নামে একজনকে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি ছিল এই সবুজ শেখ ওরফে মশিউর রহমান সম্রাট। সেই মামলায় ওই বছরই তৎকালীন সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও তদন্ত কর্মকর্তা শামসুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন। মামলায় সবুজের নাম 'সম্রাট ওরফে টাইগার সম্রাট' হিসেবে উল্লেখ ছিল। ওই ঘটনায় মোট চারজন আসামি ছিল, যার মধ্যে একজন নারীও ছিলেন। তবে সে সময় নিহত জুবায়ের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া গেলেও পুলিশ তদন্ত শেষে সবুজকেই প্রধান ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন আজ বৃহস্পতিবার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সবুজের বিরুদ্ধে দেশের অন্য কোনো জেলায় বা পুলিশ রেকর্ডে আর কোনো অপরাধের ইতিহাস আছে কিনা, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে হেলাল উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'তার বিষয়ে তদন্তে নেমে যেসব তথ্য আমরা পাচ্ছি, তার মধ্যে একটি চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করলেও সে কখনো কোথাও তার বাবার নাম পরিবর্তন করেনি।'
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সবুজ দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান জীবনযাপন করছে। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের মাদক মামলায় সে তার ঠিকানা হিসেবে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকা ব্যবহার করেছে। আবার ২০১৪ সালের হত্যা মামলায় তার ঠিকানা দেওয়া ছিল রাজধানীর আরমানিটোলা এলাকা। মূলত ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতেই সে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করত।
সবুজের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মৌছামান্দ্রা গ্রামেও তার অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সবুজ কখনোই এলাকায় স্থায়ীভাবে থাকতেন না। গ্রামে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গিয়ে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর আবারও ফিরতেন। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন প্রতিবেশীরা। সর্বশেষ এক মাস আগে সে গ্রামে গিয়ে দুদিন থেকে আবার চলে আসেন। যদিও মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ওই থানায় সবুজের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলার রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, তিন ভাই ও চার বোনের পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান সবুজ। তার অপরাধ জগতে প্রবেশের নেপথ্যে কী ছিল বা কারা সঙ্গী ছিল, সেসব বিষয় এখনো অস্পষ্ট। জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছে। তবে তার হত্যার ধরন ছিল নির্দিষ্ট। সে মূলত ভাসমান মানুষদের টার্গেট করত এবং হত্যার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লাশ পুড়িয়ে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করত।
পুলিশ কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন জানান, গ্রেপ্তারের আগে সবুজকে নজরদারি করার সময় দেখা গেছে, সে রাতে বিভিন্ন পথচারী-সেতুতে ঘুরে বেড়াত। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই ভাসমান মানুষদের ফুসলিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে দু-একদিন নিজের কাছে রাখত এবং পরে তাদের হত্যা করত। এমনকি সর্বশেষ জোড়া খুনের ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আরও এক নারীকে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিল সে। পুলিশকে সবুজ জানিয়েছে, দু-একদিন পর ওই নারীকেও সে হত্যা করত।
সবুজের নিজ গ্রাম মুন্সিগঞ্জের হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সোহেল খান বলেন, 'সবুজ এলাকায় খুব একটা থাকে না। মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে দুই-এক দিন থেকে আবার চলে যায়। মাদক সেবন ও চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো না। সর্বশেষ গ্রাম ছেড়ে দেওয়ার আগে একটি অটোরিকশা চুরি করতে গেলে চালকের হাতে ধরা পড়ে যায়। সে সময় সবুজ ওই অটোরিকশা চালককেও মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়।'
তবে সবুজের ছোট ভাই রায়হান দাবি করেছেন সবুজ মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। তিনি বলেন, 'সবুজ একা একা কথা বলতো, তবে পরিবার সবুজের এই আচরণ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। ভাইয়ের সাথে কয়েক বছর যাবত যোগাযোগ নেই।'
সরেজমিনে সবুজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কাপড়ের প্রাচীরে ঘেরা জীর্ণ বাড়িতে একটি চৌচালা টিনের ঘর ও রান্নাঘর ছাড়া কোনো স্থাপনা নেই। সবুজের মা মমতাজ বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, গত এক বছর আগে স্ত্রী পরিচয়ে এক তরুণীকে নিয়ে সবুজ বাড়িতে গিয়েছিল, ওই তরুণীকেও তার কাছে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হয়েছিল।
ছেলের পরিবর্তন সম্পর্কে মমতাজ বেগম বলেন, 'ছোট থেকে তার এমন আচরণ ছিল না। গত কয়েকবছর যাবত তার আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। তখন থেকে পরিবার ধরে নেয় তার মানসিক সমস্যা রয়েছে। এই সময়ে সবুজ একা একা কথা বলা ছাড়াও গালাগালি করতো।' তিনি আরও জানান, নিজের অসুস্থতার কারণে সাভারে সবুজের এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না; ছোট ছেলের কাছ থেকে পরে সব শুনেছেন।
