সাভারে আলোচিত ৬ খুন: নেপথ্যে ‘ভবঘুরে’ সম্রাট, দাবি পুলিশের
ঢাকার সাভার পৌর এলাকার পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থানে গত পাঁচ মাসে সংগঠিত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া মশিউর রহমান সম্রাট (৪০) নামের এক ব্যক্তিই এই সব কটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়ভাবে 'মানসিক ভারসাম্যহীন' হিসেবে পরিচিত হলেও পুলিশ তাকে 'ভবঘুরে' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে সাভার মডেল থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস. ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তার ও পরিচয়
গ্রেপ্তার মশিউর রহমান সম্রাট সাভারের ব্যাংক কলোনি মহল্লার মৃত সালামের ছেলে। গতকাল রবিবার (১৮ জানুয়ারি) রাতে সাভারের মুক্তির মোড় এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। এর আগে ওইদিন সকালেই সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুইজনের আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আজ তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
৫ মাসে ৬ হত্যাকাণ্ড
পুলিশ জানায়, গত ৫ মাসে সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে ৫টি এবং মডেল মসজিদের পাশ থেকে ১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে একমাত্র আসমা বেগম (৭৫) ছাড়া বাকি ৫ জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়,
১. ২৯ আগস্ট: কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে হাত বাঁধা ও অর্ধগলিত অবস্থায় এক ব্যক্তির (৩০) লাশ উদ্ধার।
২. ১১ অক্টোবর: ওই একই ভবনের বাথরুম থেকে গলাকাটা অবস্থায় এক নারীর (৩০) লাশ উদ্ধার।
৩. ১৯ ডিসেম্বর: ভবনটি থেকে আরও এক ব্যক্তির (৩৫) লাশ উদ্ধার।
৪ ও ৫. ১৮ জানুয়ারি: ভবনটির দ্বিতীয় তলা থেকে আগুনে পোড়া দুইজনের মরদেহ উদ্ধার। এর মধ্যে একজন ১৩ বছরের কিশোরী ও অন্যজন আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী (লিঙ্গ নিশ্চিত হওয়া যায়নি)।
৬. মডেল মসজিদ এলাকা: মসজিদের পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছন থেকে আসমা বেগম নামের এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার। শুরুতে বার্ধক্যজনিত মৃত্যু মনে হলেও ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধ করে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়।
যেভাবে ধরা পড়ল সম্রাট
পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারটিতে বারবার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সম্প্রতি সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে পুলিশ। গত পরশু রাতেও পুলিশের একটি টহল দল সেখানে তল্লাশি চালায়। গতকাল জোড়া খুনের পর সিসিটিভি ফুটেজে সম্রাটের সন্দেহজনক উপস্থিতি দেখা যায়। পরে তাকে আটক করা হলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে গত পাঁচ মাসে ঘটে যাওয়া ছয়টি খুনের কথা স্বীকার করে।
মানসিক অবস্থা ও উদ্দেশ্য
স্থানীয়দের কাছে সম্রাট 'পাগল' বা 'মানসিক ভারসাম্যহীন' হিসেবে পরিচিত। তাকে প্রায়ই সাভার মডেল থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে আনমনে কথা বলতে ও একা হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যেত।
তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম বলেন, 'জিজ্ঞাসাবাদে তার মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ আমরা পাইনি। সে ভবঘুরের মতো চলাফেরা করত, তাই আমরা তাকে ভবঘুরে হিসেবেই দেখছি।'
হত্যাকাণ্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ এখনও নিশ্চিত নয়। আরাফাতুল ইসলাম বলেন, 'তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুব অল্প সময় পাওয়া গেছে। রিমান্ডে পেলে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ বা উদ্দেশ্য জানা সম্ভব হবে।'
উল্লেখ্য, পরিত্যক্ত পৌর ভবনটিতে নিয়মিত মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আড্ডা বসত বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছিলেন। এসব ঘটনার পর ভবনটিতে নজরদারি বৃদ্ধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে পৌরসভা ও পুলিশ।
