জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চট্টগ্রামের যে অঞ্চল
চট্টগ্রাম শহর থেকে খুব কাছেই সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি পাহাড় ও বনভূমি নিয়ে বিস্তৃত এই এলাকার বড় অংশই অবৈধ দখলের শিকার। বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন এলাকায় অপরাধী চক্র ও ভূমিদস্যুরা অবৈধ বসতি গড়ে তোলায়, এলাকাটি অনেকটাই প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় র্যাব-৭-এর একটি দল। এর মধ্য দিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। হামলায় র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এছাড়া তিনজনকে জিম্মি করে মারধর করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, স্থানীয় একটি বিএনপি অফিসের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে এবং জিম্মিদের অফিসের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে তিন ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। আহত কর্মকর্তাদের বর্তমানে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান নিহত মোতালেব ভূঁইয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার পর সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আইনি ব্যবস্থা ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে এটি করার প্রতিশ্রুতি দেন।
রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক 'রাষ্ট্র'
জঙ্গল সলিমপুরে যা চলছে তা কেবল বিশৃঙ্খলা নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বদলে সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত এক বিকল্প ব্যবস্থা। ইয়াসিন, রোকন মেম্বার এবং রিদওয়ানের মতো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দল সেখানে নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের নিজস্ব আস্তানা ও অস্ত্রের ভাণ্ডারও রয়েছে। তারা আলাদাভাবে কাজ করলেও, তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় রয়েছে, যা সেখানে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে।
এই প্রতিবেদক ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনবার ওই এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালের উচ্ছেদ অভিযানের সময় দুইবার যাওয়া হয়। প্রথমবার যাওয়ার সময় সশস্ত্র প্রহরীরা তাকে থামিয়ে দেয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ভিডিও ধারণ না করার কড়া শর্তে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়।
দেশি-বিদেশি ভারি অস্ত্রে সজ্জিত এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক সলিমপুরের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিটি প্রবেশপথে পাহারায় থাকে সশস্ত্র প্রহরী। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে থাকে নিজস্ব পরিচয়পত্র। আর বহিরাগতদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়; পরিচিত কেউ সঙ্গে না থাকলে সাধারণত কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না।
পুরো পাহাড়জুড়ে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। ফলে এক কিলোমিটার দূর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সেখানে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে।
ভৌগোলিক অবস্থানও তাদের আধিপত্যকে আরও মজবুত করেছে। সীতাকুণ্ড, হাটহাজারীর আমানবাজার রোড এবং চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ, আকবর শাহ ও খুলশী থানা এলাকার সীমানাজুড়ে সলিমপুরের অবস্থান। ফলে প্রশাসনিকভাবে এলাকাটি একটি জটিল অবস্থানে রয়েছে।
পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে অপরাধীরা মাত্র ১০-২০ মিনিটের মধ্যে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, শহর ও উপজেলা পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অভিযানগুলো ধীরগতির ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, ফলে শুরুতেই তা ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়।
রক্ত ও মাটিতে গড়া এক সাম্রাজ্য
এই অরাজকতার শুরু নব্বইয়ের দশকে। তখন আলী আক্কাস পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন এবং নিজের এলাকা রক্ষার জন্য গড়ে তোলেন সশস্ত্র বাহিনী। 'ছিন্নমূল সমবায় সমিতি'-এর নামে সরকারি জমি 'নন-জুডিশিয়াল পেপার'-এ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হতো।
অর্থ ও ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে একপর্যায়ে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আক্কাস নিহত হন। এরপর তার সহযোগী—কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে সলিমপুরের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তোলেন।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এসব দল বর্তমানে তাদের সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজার বলে দাবি করে। তবে ওই এলাকায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস।
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ অর্থনীতির আড়ালে সেখানে চলছে এক জটিল কারবার। খাস জমি বিক্রি, পাহাড় কাটা ও মাটি বাণিজ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ, যানবাহনের টোল ও চাঁদা—সবই চলে সেখানে। এর সঙ্গে রয়েছে অস্ত্র ও মাদকের অবৈধ অর্থপ্রবাহ, যার সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই।
সেখানে চিকিৎসা সেবাও দেওয়া হয় গোপনে, নিজস্ব ব্যবস্থায়। সীতাকুণ্ড থানার সাবেক এক পুলিশ পরিদর্শক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'জঙ্গল সলিমপুর যেন এক ভিন্ন রাষ্ট্র, যেখানে তাদের নিজস্ব আইন চলে। সেখানে বিবাদ নিজেদের মধ্যেই মেটানো হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপ সেখানে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং অনেক অপরাধের খবর পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায়ই না।'
প্রশাসনের ওপর বারবার হামলা
দীর্ঘদিন ধরেই সলিমপুর এলাকাটি প্রশাসনের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
সোমবারের ঘটনার পর সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিমাদ্রি খিসা ২০২৩ সালের এক উচ্ছেদ অভিযানের স্মৃতিচারণ করেন। সে সময় শতাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও এক ডজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত নারীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে হয়েছিল।
২০২২ সালেও উচ্ছেদ অভিযানে যাওয়া দল দুবার হামলার শিকার হয় এবং অনেকে আহত হন। ২০১৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মীরাও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
পাহাড়গুলো সন্ত্রাসীদের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই দুর্গের মতো কাজ করে। পাথর, দেশীয় বিস্ফোরক ও গুলির ব্যবহার যেকোনো অভিযানকে বিপজ্জনক করে তোলে। এর সঙ্গে যোগ হয় গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের সমস্যা, যার ফলে অভিযানের খবর আগেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যায়।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাহ উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী চক্র সব সময় ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় খোঁজে। এখন বিএনপি নির্বাচনে জিতবে বুঝতে পেরে তারা বিএনপির কিছু নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।'
স্থানীয় বিএনপি অফিসের সামনে র্যাবের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, 'সেখানে বিএনপির কোনো কার্যালয় আছে কি না, তা আমার জানা নেই। ইউনিয়ন কমিটি এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।' তিনি হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত এমপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এই প্রতিবেদক তাকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুন টিবিএসকে বলেন, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে জাতীয় পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বিশাল এই পাহাড়ি ও বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি সেখানে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা সেনা ব্যারাক স্থাপন এবং যাতায়াতের জন্য আরও পথ তৈরির পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা জনবলের নয়, বরং সদিচ্ছার। ছোটখাটো অভিযান চালানো আর দুর্গে ঢিল ছোড়া একই কথা। চট্টগ্রাম পুলিশের মুখপাত্র মোহাম্মদ রাসেল জানান, একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনুমোদন পেলেই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নিতে অভিযান চালানো হবে।
ইংরেজী থেকে অনুবাদ: তাসবিবুল গনি নিলয়
