যুদ্ধাবস্থায় জলপথ রুদ্ধ হলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চীনে লাখ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়লেও ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করে এখনো বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল চীনে পাঠিয়ে যাচ্ছে।
ওয়েবসাইট ট্যাঙ্কারট্র্যাকার.কম-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সামির মাদানি মঙ্গলবার সংবাদ সংস্থা সিএনবিসি-কে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে অন্তত ১ কোটি ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাঠিয়েছে, এবং এর সবকটির গন্তব্য ছিল চীন।
এই সংস্থাটি স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে। এর ফলে এমন জাহাজও শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যেগুলো তাদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে দেয়। তেহরান ঘোষণা দিয়েছিল যে, কেউ যদি এই জলপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করে তবে তাকে আক্রমণ করা হতে পারে—এরপর অনেক জাহাজই তাদের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে 'অদৃশ্য' হয়ে যায়।
শিপিং তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করেছে।
কেপলার-এর ক্রুড বিশ্লেষক নওয়ে খিন সোয়ে বলেন, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা যেহেতু চীন, তাই এই তেলের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত সেদিকেই যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।' তবে তিনি আরও বলেন, জাহাজগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করা এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
চীনের জাতীয় জ্বালানি প্রশাসন সিএনবিসি -র মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরু জলপথ—সাধারণত বিশ্বে পরিবাহিত মোট জ্বালানির প্রায় পঞ্চমাংশ বহন করে। তবে গত মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে, কারণ অধিকাংশ ট্যাংকারই বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে এই পথ এড়িয়ে চলছে।
যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী বা তার আশপাশে থাকা ১০টি জাহাজের ওপর তেহরানের হামলা হয়। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত সাতজন নাবিক নিহত হন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সোমবার সিএনবিসির ড্যান মারফির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, 'হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেসব তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে, তাদের অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে।'
মাদানির মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে ইরান থেকে ছেড়ে যাওয়া ছয়টি ট্যাংকারের মধ্যে তিনটিই ইরানের পতাকাবাহী।
তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজের ব্রায়ান কিলমিডকে বলেন, প্রণালীর কাছে আটকে থাকা জাহাজগুলোর 'সাহস দেখিয়ে' এগিয়ে যাওয়া উচিত।
ট্রাম্প বলেন, 'ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই। আমরা তাদের সব জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছি।'
বিকল্প রপ্তানি পথ?
ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপ তেল টার্মিনাল বহু বছর ধরে দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। এখান থেকেই আগে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হতো এবং এরপর ট্যাংকারগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাত্রা করত।
তবে এখন ইরান ওমান উপসাগরের জাস্ক তেল ও গ্যাস টার্মিনালেও আবার ট্যাংকারে তেল বোঝাই শুরু করেছে। এটি হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণে অবস্থিত এবং এতে তেল রপ্তানির সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে।
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি ইরানি জাহাজ সেখানে ২০ লাখ ব্যারেল তেল বোঝাই করছিল। গত পাঁচ বছরে এটি সেখানে মাত্র পঞ্চমবারের মতো এমন লোডিং।
সোয়ে বলেন, জাস্ক টার্মিনালে নতুন করে কার্যক্রম শুরু হওয়া থেকে বোঝা যায় যে তেহরান হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথ খুঁজছে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ওমান সাগরে অবস্থিত জাস্ক তেল স্থাপনাটি ইরানের একমাত্র রপ্তানি কেন্দ্র, যেখান থেকে তেল পাঠাতে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হয় না। তবে এটি খুব কম ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ।
মাদানির মতে, একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ—যাকে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) বলা হয়—এ তেল তুলতে জাস্কে ১০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
তিনি বলেন, 'এটির প্রচারমূলক মূল্য আছে, কিন্তু বাস্তবে লজিস্টিক সুবিধা খুব বেশি নয়।'
তুলনামূলকভাবে খারগ দ্বীপে একটি ভিএলসিসি-তে তেল তুলতে সাধারণত এক বা দুই দিন লাগে।
চীনের তেল মজুত
ইরান চীনে তেল পাঠানো অব্যাহত রাখলেও প্রতিদিনের চালান প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক কম।
কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ইরান প্রতিদিন ২১ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, যা ২০১৮ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। এই তেলের সবই চীনে গিয়েছিল, কারণ সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বেইজিং বড় আকারে তেল মজুত করছিল।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দুই মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
কেপলার-এর হিসাব বলছে, ১৬ ফেব্রুয়ারির সপ্তাহে ইরানি তেলের লোডিং প্রতিদিন ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছিল, যা আগের গড় সাপ্তাহিক মাত্রা ১৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলের দ্বিগুণেরও বেশি।
বছরের পর বছর ধরে চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির মজুত প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল, যা প্রায় ৩ থেকে ৪ মাসের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
চীনের এই মজুত বৃদ্ধির পেছনে আরও একটি কারণ হলো—এই বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ের দুই বড় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ ভেনেজুয়েলা ও ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করেন।
বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো আটক হন। আর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন।
তেলের বাজারে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সোমবার তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার ছুঁয়েছিল—যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পারস্য উপসাগরের কয়েকটি তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এই দাম বাড়ে।
সম্ভাব্য তেল সংকটের প্রভাব সামাল দিতে বিশ্ব নেতারা তৎপর হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ জি-৭ দেশগুলোর নেতারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল মজুত ছাড়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে যুদ্ধ শিগগির শেষ হতে পারে।
এরপর তেলের দাম কিছুটা কমে আসে। মঙ্গলবার রাত ১০টা ৫০ মিনিট (ইস্টার্ন সময়) পর্যন্ত এপ্রিল ডেলিভারির জন্য মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েল-এর দাম ছিল প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ ডলার প্রতি ব্যারেল, আর মে ডেলিভারির জন্য বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ছিল ৮৮ দশমিক ৯ ডলার প্রতি ব্যারেল।
