‘বাসায় বললে পাড়া দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব’: রাজধানীর শারমিন একাডেমিতে শিশু নির্যাতন
রাজধানীর শারমিন একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩-৪ বছর বয়সি এক শিশু। নির্যাতনের পর শিশুটিকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, 'বাসায় গিয়ে বললে পাড়া দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব।' এই ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর স্কুলটি বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার জানায়, স্কুল থেকে ফিরেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। মায়ের কাছে সে শিক্ষিকার দেওয়া হুমকির কথা জানায়। বর্তমানে শিশুটি তীব্র মানসিক ট্রমায় ভুগছে। শিশুটির মা বলেন, "ঘুমের মধ্যেও আমার বাচ্চা কেঁদে ওঠে। বারবার বলে, 'মুখ সেলাই করে দিও না। আমি কিছু করিনি। আমি এখানে থাকব না আমম্মু'।" আতঙ্কে শিশুটি এখন বাবা-মায়ের কাছে যেতেও ভয় পাচ্ছে বলে জানান তিনি।
শিশুটির বাবা জানান, স্কুলে শাস্তির নামে তার সন্তানকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরাও শিশুটির তীব্র মানসিক ট্রমার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিসিটিভি ফুটেজে নির্যাতনের চিত্র
গত মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) ফেসবুকে অ্যাডভোকেট সালেহ উদ্দিনের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে এই নির্যাতনের রোমহর্ষক চিত্র উঠে আসে। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গত ১৮ জানুয়ারি দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে গোলাপি শাড়ি পরিহিত এক নারী ওই শিশুকে টেনে অফিস কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে এক ব্যক্তির সামনে শিশুটিকে দফায় দফায় চড় মারা ও ধমক দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি একটি স্ট্যাপলার দেখিয়ে শিশুর মুখ স্ট্যাপল করে দেওয়ার হুমকি দেন। পুরো ভিডিও জুড়ে শিশুটিকে চরম আতঙ্কিত অবস্থায় দেখা যায়।
শাস্তি নাকি নিষ্ঠুরতা? রাজধানীর স্কুলে শিশু নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে উদ্বেগ
মামলা ও বর্তমান অবস্থা
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা শিশু অধিকার আইন, ২০১৩ অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করেছেন। ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) হুসাইন মুহাম্মদ ফারবী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'শিশুটির মা বাদী হয়ে শিশু আইনের ৭০ ধারায় মামলা করেছেন। মামলায় স্কুলের শিক্ষক পবিত্র বড়ুয়া ও তার স্ত্রী শারমিন জামানকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে শারমিন স্কুল কর্তৃপক্ষের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কাউকেই সেখানে পাওয়া যায়নি। একজন নিরাপত্তাকর্মী উপস্থিত থাকলেও তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। মূলত মামলার পর থেকেই স্কুলটি বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ গা ঢাকা দিয়েছে।
অভিভাবক ও অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ
স্কুলের অন্য এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'ওই শিক্ষিকা শৃঙ্খলার নামে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতেন। অভিভাবক ও শিশু উভয়ের সাথেই তার ব্যবহার ছিল অপেশাদার ও খারাপ।'
শিশু অধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান 'পথের স্কুল'-এর সংগঠক ও শিশু অধিকারকর্মী উম্মে সালমা আক্তার ঊর্মি বলেন, 'শিশুরা আমাদের ওপর নির্ভর করে, তাদের ভুলের জন্য শাস্তি দেওয়া অন্যায়। এটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতি করে। যারা এই ধরনের কাজ করে, তাদের দ্রুত কাউন্সিলিং ও আইনের কঠোর প্রয়োগের আওতায় আনা জরুরি।'
শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের এবং এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
