রাজধানীতে পেট্রোল-অকটেন সংকট: অধিকাংশ পাম্পে ঝুলছে ‘নেই’ সাইনবোর্ড
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। শহরের অধিকাংশ পাম্পেই 'অকটেন ও পেট্রোল নেই' লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। জ্বালানি সংকটে ঢাকার সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
সরেজমিনে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলিস্তানের রমনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটি সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রবেশপথে ঝুলছে 'অকটেন-পেট্রোল নেই' লেখা সাইনবোর্ড। পাম্পের কর্মকর্তা শমসের আলী জানান, আগামী রবিবারের আগে পেট্রোল বা অকটেন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে শুধু সামান্য ডিজেল মজুত থাকায় তা বিক্রির জন্য পাম্পটি সীমিত পরিসরে খোলা রাখা হয়েছে।
আজ শনিবার বেলা ১২টার দিকে মালিবাগের হাজীপাড়া পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। পাম্পের প্রবেশপথ রশি দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও টাঙানো হয়েছে 'তেল নেই' সংবলিত সাইনবোর্ড।
তবুও আশায় কিছু প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল সেখানে ভিড় করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্পের এক কর্মী হ্যান্ড মাইকে অনবরত ঘোষণা দিচ্ছেন— 'পেট্রোল ও অকটেন নেই, দয়া করে ভিড় করবেন না'।
ভুক্তভোগী চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাজধানীর এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরেও জ্বালানি মিলছে না। এতে উল্টো গাড়ি বা মোটরসাইকেলের সঞ্চিত তেলটুকুও অপচয় হচ্ছে। দু-এক জায়গায় তেল পাওয়া গেলেও সেখানে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তেল নিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ঢাকা কলেজের বিপরীতে অবস্থিত মেঘনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই তেল সরবরাহ বন্ধ। যানবাহনের প্রবেশ ঠেকাতে পাম্পের মুখে বাঁশ বেঁধে রাখা হয়েছে। পাম্প অপারেটর নাসির বলেন, 'সকাল থেকেই মানুষ তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বিকেলের দিকে তেল আসার কথা রয়েছে, তখন হয়তো সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।'
সেখানে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেল চালক শামীম আক্ষেপ করে বলেন, 'গতকাল অল্প তেল নিয়েছিলাম, তা আজ শেষ হয়ে যাওয়ায় মাঝরাস্তায় গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তেল না নিয়ে তো আর যাওয়ার উপায় নেই, তাই এক ঘণ্টা ধরে এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি।'
তবে এই হাহাকারের মধ্যেও সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে নীলক্ষেত ফুয়েল পাম্পে। সেখানে কোনো সংকট ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে। চালকদের কোনো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। পাম্পের অপারেটর আব্দুর রাজ্জাক আশ্বস্ত করে বলেন, 'আমাদের এখানে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুত আছে, তাই নিয়মিতভাবেই সব ধরনের যানবাহনে তেল দিচ্ছি।'
এদিকে, দেশে চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ না পাওয়ায় অনেক পেট্রোল পাম্প তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বলে দাবি করেছেন মালিকরা। তাদের অভিযোগ, কিছু পাম্পে সামান্য সরবরাহ থাকলেও অধিকাংশ পাম্পই সংকটে ভুগছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক জানান, পাম্পগুলো চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, 'আগে যে পাম্পটি দৈনিক ২০ হাজার লিটার তেল পেত, এখন তাকে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি সরকারের দেওয়া তথ্যের সমালোচনা করে বলেন, 'সরকার বলছে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং বিভ্রান্তি তৈরি করছে।'
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পাম্পে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানান নাজমুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, ইতিমধ্যে দুটি পাম্পে কর্মীদের ছুরিকাঘাত করা হয়েছে এবং বেশ কিছু জায়গায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে খুলনা ও রাজশাহীর পেট্রোল পাম্প মালিকরা ইতিমধ্যে পরিষেবা বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাদের দাবি, দৈনিক চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে কার্যক্রম চালানো অসম্ভব।
বিদ্যমান এই সংকট নিয়ে সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত মালিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি। নাজমুল হক বলেন, 'আমি গত দুই দিন ধরে বিপিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে কিছু পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছি না।'
