মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জ্বালানি বাঁচাতে পাকিস্তানে সপ্তাহে ৪ দিন অফিস
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির মোকাবিলায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নজিরবিহীন কৃচ্ছতা সাধনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যা পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সিন্ধু প্রদেশ বাদে বাকি তিনটি প্রদেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজস্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটি।
সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সরকারের জরুরি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগামী দিনে আরও বাড়বে। তাই দেশের বিদ্যমান তেলের মজুতকে বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, সব সরকারি দপ্তরে সপ্তাহে চার দিন কাজ হবে—সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।
তবে অতিরিক্ত এই ছুটি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কৃষি ও শিল্পখাত কিংবা হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার মতো জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হবে না।
দেশের সব স্কুল ও কলেজ আগামী দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকবে। তবে উচ্চশিক্ষা কমিশনের অধীন অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে চালিয়ে যাবে।
সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কৃষি ও শিল্পখাত এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' নীতি প্রযোজ্য হবে না।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী দুই মাস সরকারি ও দাপ্তরিক যানবাহনের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হবে। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও গণপরিবহণের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য হবে না।
তিনি আরও জানান, আগামী দুই মাস সরকারি ও দাপ্তরিক যানবাহনের ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাস কোনো ফেডারেল মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী বেতন নেবেন না। যদিও এর আগে সরকার দাবি করেছিল, ফেডারেল মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য বেতন নিচ্ছেন না এবং তারা 'সম্মানসূচক ভিত্তিতে' কাজ করছেন।
এছাড়া সব সংসদ সদস্যের বেতন ২৫ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেন তিনি।
সরকারি কর্মকর্তা যারা গ্রেড ২০ বা তার ঊর্ধ্বে এবং মাসে ৩ লাখ রুপির বেশি বেতন পান, তাদের দুই দিনের বেতন কেটে নেওয়া হবে 'জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য'। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভাগগুলোর ব্যয়ও ২০ শতাংশ কমানো হবে।
সব ফেডারেল ও প্রাদেশিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'এই বিধিনিষেধ প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও গভর্নরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে জাতীয় স্বার্থে জরুরি সফর হলে তা করা হবে।'
অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ এড়াতে সব সরকারি বৈঠক অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে। সরকারি ইফতার-ডিনার ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এছাড়া সব সরকারি অনুষ্ঠান, সম্মেলন ও সেমিনার হোটেলের পরিবর্তে সরকারি স্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে।
'কঠিন' সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, 'যদি পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।'
তিনি বলেন, পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। 'এই বাস্তবতা মাথায় রেখে দেশের অর্থনীতির জন্য সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক তেলের দাম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি স্বীকার করেন, পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটিও ছিল 'কঠিন'।
তিনি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানান, যার ফলে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এবং আজারবাইজানের মতো বন্ধুসুলভ দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলারও নিন্দা জানান।
উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করার পর এই মিতব্যয়ী পদক্ষেপগুলো ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর গঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা কমিটি জ্বালানি মজুত পর্যালোচনা করে এবং জ্বালানি খাতে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনের মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় প্রস্তুতিও যাচাই করা হয়েছে।
কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে একাধিক জাহাজ ও আমদানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পাঞ্জাব
পাঞ্জাব সরকার ১০ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। তবে অনলাইন ক্লাস চালু রাখার সুযোগ থাকবে এবং সরকারি দপ্তরে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' নীতি চালু করা হয়েছে।
তবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ এক্সে এক পোস্টে জানান, 'পেট্রোলিয়াম সংকট' শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রাদেশিক মন্ত্রীদের বিনা মূল্যে পেট্রোল দেওয়া হবে না। সরকারি যানবাহনের জন্য পেট্রোল ও ডিজেল ভাতা ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রোটোকল গাড়ির ব্যবহারেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য তাদের সঙ্গে কেবল একটি অতিরিক্ত গাড়ি থাকবে।
সরকারি দপ্তরে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' চালু করা হয়েছে, যার অধীনে শুধু প্রয়োজনীয় কর্মীরা অফিসে আসবেন।
পোস্টে আরও বলা হয়, 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম নীতির আওতায় কেবল সহায়ক কর্মীদের চলাচল সীমিত করা হচ্ছে, অফিসের কাজ বন্ধ হবে না।'
'মরিয়ম কে দস্তক' উদ্যোগসহ সব ই-বিজনেস সেবা চালু থাকবে।
সরকারি বৈঠকগুলো অনলাইনে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি বহিরাঙ্গন কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে।
২৮ মার্চ শুরু হওয়ার কথা ছিল যে 'হর্স অ্যান্ড ক্যাটল শো ২০২৬', সেটিও স্থগিত করা হয়েছে।
এছাড়া সব জেলায় পরিবহন ভাড়া কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জনগণকে রাতের বেলা কেনাকাটা এড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া
খাইবার পাখতুনখোয়া সরকার দুই মাসের জন্য সরকারি যানবাহনের জ্বালানি ভাতা ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে 'জ্বালানি সংরক্ষণ ও দায়িত্বশীল শাসন উদ্যোগ' অনুমোদন করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর তথ্য ও জনসংযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী শাফি জান জানান, এই সিদ্ধান্ত পুলিশ, উদ্ধারকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
সরকারি বিভাগগুলোতে ৫০ শতাংশ কর্মীর জন্য 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' নীতি চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সব সরকারি বৈঠক ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া প্রতি শুক্রবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং অনলাইন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মন্ত্রিসভা ভিআইপি প্রোটোকল গাড়ি ও হেলিকপ্টারের ব্যবহারও কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকার জ্বালানি পাম্পগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, 'গম কাটার জন্য কৃষকদের ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।' সরকারের লক্ষ্য হলো জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা না দিয়ে অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখা।
বেলুচিস্তান
বেলুচিস্তান সরকারও সাময়িকভাবে প্রদেশজুড়ে সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৯ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
সম্ভাব্য পরিবহন ও চলাচলসংক্রান্ত সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, চলমান ভর্তি কার্যক্রম, স্কুলের ডিজিটাল শুমারি এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষাগুলো চালু থাকবে।
সিন্ধুর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি
অন্যদিকে সিন্ধু প্রদেশে আজ (মঙ্গলবার) মন্ত্রিসভার বৈঠকে একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রী সাঈদ ঘানি ও জাম ইকরামুল্লাহ ধারোজো বলেন, বাজার আগে বন্ধ করা ও জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে আলোচনার আগে প্রদেশজুড়ে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শ করবে সিন্ধু সরকার।
