এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ সরকারের
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম কয়েক গুণ বেড়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।
নতুন অনুমোদিত এই ভর্তুকির মধ্যে ১৭,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এলএনজি আমদানিতে এবং বাকি ৭,০০০ কোটি টাকা যাবে জ্বালানি আমদানিতে, যা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ক্রয়কৃত ডিজেলের বাড়তি খরচ মেটাতে ব্যয় হবে।
গতকাল এই অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এলএনজি ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকার এই অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'গতকাল (বুধবার) দীর্ঘ আলোচনার পর আজ (বৃহস্পতিবার) নতুন এই ভর্তুকি পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে।'
বুধবার সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আরও ছয়টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এক জরুরি ভার্চুয়াল সভার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পেট্রোবাংলা কর্তৃক জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়া একটি সংশোধিত ভর্তুকি প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে এই সভা ডাকা হয়েছিল।
জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্রের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নতুন এই ভর্তুকি বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে পেট্রোবাংলা তিনটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে নয়টি 'সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ' জমা দিয়েছিল—সম্ভাব্য ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম, স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম এবং এপ্রিল-জুন মাসের জন্য এলএনজি কার্গো পুনর্নির্ধারণ।
এর মধ্যে এপ্রিল-জুন সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড এবং স্পট এলএনজির দামের পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছিল।
বৈঠকে প্রথম পরিস্থিতিটি বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, যেখানে ধরা হয়েছে— ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার হবে এবং প্রতি এমএমবিটিইউ স্পট এলএনজি-এর দাম প্রায় ২০ ডলার হবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত ৩১টি কার্গো আমদানি করতে ২০,০০০ থেকে ২১,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতো।
যদি আমদানির পরিমাণ কমিয়ে ২৫টি কার্গোতে আনা হয়, তবে ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ১৬,০০০ থেকে ১৭,০০০ কোটি টাকা। এমনকি যদি এলএনজি আমদানি আরও কমিয়ে ২২টি কার্গোতে নামানো হয়, তবুও ভর্তুকির চাহিদা ১৪,০০০ থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকবে।
সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে এলএনজি ভর্তুকি বেড়েছে
সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের ফলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেল।
আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি ভর্তুকির জন্য ৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত ১৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ফলে এখন শুধুমাত্র এলএনজি খাতেই মোট ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৩,০০০ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পট মার্কেটে এলএনজির আকাশচুম্বী দাম এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়াই এই ভর্তুকি বাড়ার প্রধান কারণ। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নৌ-পরিবহন সংকটের কারণে বেশ কিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি 'ফোর্স মেজার' বা অনিবার্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এখন ধারণা করছে, এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ আসবে স্পট মার্কেট থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
জ্বালানি সচিব বলেন, 'দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এলএনজির অতিরিক্ত ভর্তুকির বড় অংশই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে।'
বাংলাদেশ সম্প্রতি প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.৫৮ থেকে ২৮ ডলার দরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার অর্ডার দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দামের চেয়ে অনেক বেশি।
এলএনজি কার্গো আমদানি কমতে পারে
অতিরিক্ত ভর্তুকি বরাদ্দ সত্ত্বেও বাজেট সংকটের কারণে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এলএনজি আমদানি কমতে পারে।
বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে এপ্রিল-জুন সময়ে ৩১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। তবে সেই পরিকল্পনা সংশোধন করে এখন ২৫টি কার্গোতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১১টি এবং জুন মাসে ১০টি কার্গো আমদানির কথা ছিল।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩১টি কার্গোর মূল পরিকল্পনা বজায় রাখতে আরও অতিরিক্ত ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতো, যা দেশের বর্তমান আর্থিক চাপের মধ্যে জোগাড় করা কঠিন।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল, যার মধ্যে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীনে ১০৩টি এবং স্পট মার্কেট থেকে ১২টি কার্গো আসার কথা ছিল।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বেশ কিছু সরবরাহকারী সরবরাহ দিতে না পারায় বাংলাদেশ এখন ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
এলএনজি আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আরফানুল হক সতর্ক করেছেন, এটি অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি বলেন, 'আগামী মাসগুলোতে আমাদের চাহিদা এবং সম্ভাব্য গ্যাস সরবরাহের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। আমার আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন এবং শিল্প খাতের উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।'
ডিজেলের দাম ধাক্কা দিয়েছে বিপিসিকে
এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ওপর চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সংস্থাটি গত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে আসছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তেল বিক্রি থেকে ৪,২১৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩,৯৪৩ কোটি টাকার চেয়েও বেশি ছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহের রুটগুলো বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, ফলে এখন কর্পোরেশনের জন্য ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে।
ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে এশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি বাণিজ্যে বহুল ব্যবহৃত সিঙ্গাপুর বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৯ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই দাম বেড়ে প্রায় ১৪৩ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানি সচিব বলেন, 'বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সরকার বিপিসি-কে ভর্তুকি সহায়তা হিসেবে ৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।'
জ্বালানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির বোঝা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ধাক্কার মুখে বাংলাদেশের নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলছে, বিশেষ করে এলএনজি ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নীতি-নির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী মাসগুলোতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
