কানাডা কখনোই ইরান যুদ্ধে অংশ নেবে না: পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী কার্নি
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত মঙ্গলবার হাউজ অফ কমন্সের সংসদ সদস্যদের বলেছেন, কানাডা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িত নয় এবং 'কখনও এতে অংশগ্রহণ করবে না'।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে কানাডার অবস্থান সম্পর্কে পার্লামেন্টে জবাব না দেওয়ার কারণে সমালোচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতে তার পূর্বনির্ধারিত সূচি পরিবর্তন করেন।
মঙ্গলবারের অধিবেশনে এই সংঘাত নিয়ে কার্নিকে খুব কম প্রশ্নই করা হয়েছিল। কনজারভেটিভ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে মূলত জননিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বেশি প্রশ্ন তোলেন।
তবে ব্লক কুইবেকোয়া নেতা ইভ-ফ্রাঁসোয়া ব্লাঁশে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন এবং কার্নির সমালোচনা করে বলেন, তিনি 'মার্কো পোলোর মতো সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন।'
ব্লাঁশে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
ফরাসি ভাষায় কার্নি বলেন, 'কানাডার অবস্থান স্পষ্ট। কানাডা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি বন্ধের প্রয়োজনীয়তাকে সমর্থন করে। তবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে না এবং কখনও এতে অংশগ্রহণ করবে না।'
ব্লাঁশে পরে কার্নিকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সাথে দেখা করেছেন কি না এবং ইরান ইস্যুতে তারা কোনো সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন কি না।
কার্নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ জি-৭ নেতাদের একটি তালিকা তুলে ধরেন যাদের সাথে তিনি কথা বলেছেন এবং জানান, তারা ইরানে উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়ে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাবেন।
জবাবে ব্লাঁশে কৌতুক করে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের অংশ বানাতে হলে মহাদেশগুলোর অনেক সরে যাওয়া লাগবে।'
কার্নি বলেন, তিনি গত মঙ্গলবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা 'হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্ব' তুলে ধরেছেন এবং সংঘাতের কারণে জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও আলোচনা করেছেন।
কার্নির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কার্নি গত সোমবার কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও কথা বলেছেন।
অন্যদিকে সোমবার অনুপস্থিত থাকার কারণে কার্নিকে কনজারভেটিভদের পক্ষ থেকে বিদ্রূপের শিকার হতে হয়। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কনজারভেটিভ এমপি ফ্রাঙ্ক ক্যাপুটো এক পর্যায়ে চিৎকার করে বলেন, 'আসার জন্য ধন্যবাদ!'
অন্টারিওর লিবারেল এমপি জন-পল ড্যাঙ্কো এর পাল্টা জবাব দেন। তিনি কনজারভেটিভ নেতা পিয়ের পোইলিভ্রে-কে বলেন, তার নিজের নিরাপত্তা ছাড়পত্র নেওয়া উচিত। কার্নি এবং পোইলিভ্রে যখন কানাডার সিনাগগগুলোতে সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তর্কে লিপ্ত ছিলেন, তখন ড্যাঙ্কো চিৎকার করে পোইলিভ্রে-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আপনার মাগা (এমএজিএ) মনোভাব প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।'
গত সোমবার বেশ কয়েকজন বিরোধী সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছিলেন কারণ তিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে সরকার মনোনীত এক বিতর্কে উপস্থিত ছিলেন না।
কার্নির অনুপস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগুইন্টি সোমবারের বিতর্কে অংশ নেন।
সোমবারের ভ্রমণসূচি অনুযায়ী, কার্নি ওই সময় একটি ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি সোমবারের প্রশ্নোত্তর পর্বেও উপস্থিত ছিলেন না।
সংসদের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো এমপি সংসদে কে উপস্থিত নেই তা নিয়ে সরাসরি বক্তব্য দিতে পারেন না। তবে সোমবারের বিতর্কে অনেকেই উল্লেখ করেন যে কার্নি এখনও তাদের কাছে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কানাডার অবস্থান ব্যাখ্যা করেননি এবং তাদের কোনো প্রশ্নেরও উত্তর দেননি।
কুইবেকের কনজারভেটিভ এমপি জেরার্ড ডেলটেল বলেন, 'কুইবেক ও পুরো কানাডার মানুষ জানতে চাইছে—প্রধানমন্ত্রী কোথায়? এই বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী কোথায়? যে জায়গাটিকে আমরা হাউস অব কমন্স বলি, সেখানে প্রধানমন্ত্রী কোথায়?'
পোইলিভ্রে এক পর্যায়ে কার্নির অনুপস্থিতির কথা বলার চেষ্টা করলে স্পিকার তাকে থামিয়ে দেন।
কার্নির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুদ্ধের বিষয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শুরুতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে বিমান হামলাকে সমর্থন করলেও কয়েক দিন পর কার্নি বলেন, এই সমর্থন ছিল 'দুঃখজনক' কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বৈরিতা শুরুর সময় আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করেনি।
পরে তিনি আরও সমালোচনার মুখে পড়েন, যখন কানাডা যুদ্ধে অংশ নেবে কি না—এই সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। যদিও তিনি বলেন, সেটি ছিল একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য।
ব্লক কুইবেকোয়া হাউজ নেতা ক্রিস্টিন নরম্যান্ডিন বলেন, সোমবারের বিতর্কে কার্নির অনুপস্থিতি তার প্রথম বছর জুড়ে তাদের দলের যে পর্যবেক্ষণ—তারই অংশ। তিনি বলেন, 'সংসদীয় কাজ, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং জবাবদিহির প্রতি অন্তত অনাগ্রহ—এই প্রবণতা আমরা দেখেছি।'
এনডিপি নেতা ডন ডেভিস বলেন, কার্নির বিতর্ক এড়ানোর সিদ্ধান্ত একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
