হরমুজ প্রণালির ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ভুল হিসাব ট্রাম্প প্রশাসনের, বুঝতে পারেনি ইরানের মনোভাব
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করার সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল একটি বড় ভুল করেছে। তারা ধারণা করতে পারেনি, হামলার জবাবে ইরান সত্যিই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সাহস দেখাবে। এই বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল পরিস্থিতির ভয়াবহতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কর্মকর্তারা বর্তমান অবস্থাকে প্রশাসনের জন্য 'সবথেকে খারাপ পরিস্থিতি' হিসেবে বর্ণনা করছেন।
অভিযান শুরুর আগে জ্বালানি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা কিছু পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করায় আন্তঃসংস্থা বিতর্কগুলো আড়ালে পড়ে যায়। বিশেষ করে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে—সে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না।
বর্তমানে এই সংকটের কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে প্রশাসনের আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। শিপিং খাতের নির্বাহীরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার পার করে দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর 'এসকর্ট' (পাহারা) চেয়েছেন। কিন্তু পেন্টাগন এখন পর্যন্ত তা নাকচ করে দিচ্ছে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি উপকূল থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মুখে এই ধরনের 'এসকর্ট অপারেশন' চালানো এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান বাস্তবতা কূটনৈতিক মহল এবং সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিস্ময় তৈরি করেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনে কাজ করা একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, 'কয়েক দশক ধরে হরমুজ প্রণালি যাতে বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করাই ছিল মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির মূল ভিত্তি। আমি এই পরিস্থিতিতে হতভম্ব।'
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক গোপন ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, হামলার জবাবে ইরান জলপথটি বন্ধ করে দিতে পারে—এমন কোনো প্রস্তুতি তাদের ছিল না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন জলপথ বন্ধ করলে আমেরিকার চেয়ে ইরানেরই বেশি ক্ষতি হবে। এছাড়া, গত গ্রীষ্মে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার পর দেশটির দেওয়া কিছু হুমকি 'ফাঁকা বুলি' হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় কর্মকর্তারা এবারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
তবে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে তাদের পরিকল্পনার পক্ষে সাফাই গেয়েছে। মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, 'একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো প্রশাসন ইরানের যেকোনো পদক্ষেপের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল এবং আছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, জ্বালানি সরবরাহে এই বিঘ্ন সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিশাল সুফল বয়ে আনবে।'
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং আমেরিকার রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদনের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত বড় কোনো ঝুঁকির কথা ভাবেনি। জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বুধবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'জীবনে জিততে হলে দীর্ঘমেয়াদী লাভের জন্য সাময়িকভাবে কিছুটা কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমরা এখন সেই প্রক্রিয়ার মাঝেই আছি। যখন এই সংকটের অবসান হবে, তখন বিশ্ববাসী একটি শান্তিময় পৃথিবী এবং জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে।'
নৌ-পাহারার সম্ভাবনা
বৃহস্পতিবার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম জনসমক্ষে আসা বক্তব্যে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি একটি 'চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার' হিসেবে বন্ধ থাকবে। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার পক্ষে পড়া এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বিকল্প পথ খুব কমই খোলা আছে।
এই আলোচনার বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি খাতের নির্বাহীরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে দ্রুত এই যুদ্ধের সমাপ্তি চেয়েছেন। এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার পরিচালনা করে তারা নিজেদের সম্পদ ও কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিতে নারাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধের তীব্রতা ব্যাপকভাবে না কমা পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।
গত কয়েক দিন ধরে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জ্বালানি শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত ব্রিফিং ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সংঘাতের এই প্রাথমিক পর্যায়ে নৌবাহিনীর পক্ষে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে 'এসকর্ট' দেওয়া নিরাপদ নয়।
সিএনএন-কে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এবং সেই সঙ্গে সমুদ্রের তলে পেতে রাখা মাইন জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন উল্লেখ করেন, আশির দশকে তেলের ট্যাংকারকে নৌ-পাহারা দেওয়ার নজির থাকলেও বর্তমান ড্রোন প্রযুক্তির যুগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ছাড়া, সামরিক কর্মকর্তারা জ্বালানি শিল্পের প্রতিনিধিদের ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো অন্যত্র আক্রমণাত্মক অভিযানে ব্যস্ত থাকায় সেগুলোকে পাহারার কাজে ব্যবহার করার মতো বাড়তি সক্ষমতাও নেই।
জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বৃহস্পতিবার বলেন, নৌবাহিনী এখনই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে পার করতে সক্ষম নয়, তবে মাসের শেষ নাগাদ এই ব্যবস্থা চালু হতে পারে। সিএনবিসি-কে তিনি বলেন, 'এটি খুব শীঘ্রই ঘটবে, কিন্তু এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। আমরা এখনো প্রস্তুত নই। আমাদের সব সামরিক সম্পদ এখন ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা এবং সেগুলোর সরবরাহকারী কারখানা ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত।'
গত ৩ মার্চ ট্রাম্প যখন প্রথমবার নৌ-পাহারার ধারণাটি সামনে এনেছিলেন, তখন তিনি এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন তা স্পষ্ট নয়। ইরান ইতোমধ্যে জাহাজগুলোতে হামলা শুরু করলেও তিনি এই ঝুঁকিগুলোকে ক্রমাগত খাটো করে দেখছেন।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অনেক রিপাবলিকান নেতা যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পকে ঘরোয়া ইস্যুতে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, তখন ট্রাম্প উল্টো সুর ধরেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেলের দাম বাড়লে আমেরিকারই লাভ হতে পারে।
ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। সুতরাং যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন আমরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করি।'
তিনি আরও যোগ করেন যে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনের চেয়ে তার কাছে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প লিখেছেন, 'প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার কাছে ইরানের মতো একটি অশুভ সাম্রাজ্যকে পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া থেকে বিরত রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রকৃতপক্ষে পুরো বিশ্বকে ধ্বংস করতে পারে।'
জ্বালানি সংকট নিরসনে বিকল্প পরিকল্পনা
জ্বালানি সংকট নিরসনে নিয়োজিত ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা তেলের ট্যাংকারগুলোকে দ্রুত নৌ-পাহারার ব্যবস্থা করতে আগ্রহী হলেও, আপাতত তারা ধাপে ধাপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন। এই বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন, সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ।
একই দিনে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তেলের দামের লাগাম টেনে ধরতে তারা প্রায় ১০০ বছরের পুরনো সামুদ্রিক আইন 'জোনস অ্যাক্ট' শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য পরিবহনের জন্য কেবল মার্কিন জাহাজ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সিএনএন-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, 'জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে হোয়াইট হাউস একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জোনস অ্যাক্ট স্থগিত করার কথা ভাবছে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্য এবং কৃষি উপকরণগুলো মার্কিন বন্দরগুলোতে নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পারে।' তবে এই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি জানান।
জ্বালানি তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে যা মূলত প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। এর মধ্যে একটি হলো—গ্রীষ্মের মাসগুলোতে গ্যাসোলিন বা পেট্রল উৎপাদনকারীদের ওপর থাকা বায়ুদূষণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা। (সাধারণত গ্রীষ্মে পেট্রল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ায় বলে এ সময় উৎপাদনে কঠোর নিয়ম মানতে হয়)।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদনকারীদের ওপর থেকে আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক বোঝা কমানো হলে তা তেলের দাম কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি সংকট শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরও এর সুফল পাওয়া যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তেলের আকাশচুম্বী দাম খুব একটা কমানো সম্ভব হবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সেইগল বলেন, 'বিশ্বজুড়ে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য এবং অপরিশোধিত তেলের বাস্তব সরবরাহে যে বিশাল ঘাটতি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার তুলনায় এই উদ্যোগগুলোর প্রভাব হবে অত্যন্ত নগণ্য।'
