জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত মজুদ কার কাছে?
এই সপ্তাহে ৩২টি দেশ যখন তাদের জরুরি মজুদ থেকে অপরিশোধিত তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়তে থাকা তেলের দাম স্থিতিশীল করার লক্ষ্যই ছিল প্রধান। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পদক্ষেপ আড়ালে পড়ে যায়, কারণ ইরান হরমুজ প্রণালিতে হামলা বাড়িয়ে দেয়।
বড় জ্বালানি-ভোক্তা দেশগুলোর জোট আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সদস্যরা বুধবার জরুরি কৌশলগত তেল মজুদ থেকে শত শত মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
কিন্তু এই ঘোষণার পরও তেলের দাম কমেনি। সপ্তাহের শেষদিকে ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের (৮৭.৩০ ইউরো) ঘরে ওঠে। সপ্তাহের শুরুতে সোমবার অল্প সময়ের জন্য এটি ১১৯.৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
আইইএ'র ঘোষণার কাছাকাছি সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালির আশপাশে বা এর ভেতরে হামলা জোরদার করে। প্রজেক্টাইল, ড্রোন ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ—তেলের ট্যাঙ্কার ও কার্গো জাহাজসহ—লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান কার্যত এই সংকীর্ণ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখান দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রপ্তানি করে, যার বেশিরভাগই যায় এশিয়ায়। ফলে প্রায় সব ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে অঞ্চলটির বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ—যেমন সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—নিজেদের অভ্যন্তরীণ মজুদের সক্ষমতা পূর্ণ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছানোয় উৎপাদনও কমিয়েছে। এতে জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কৌশলগত তেল মজুদ কী?
কৌশলগত তেল মজুদ বলতে সরকার নিয়ন্ত্রিত এমন তেলভাণ্ডারকে বোঝায়, যা সরবরাহ ব্যাহত হওয়া বা বাজারে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক যুগের প্রথম বড় কৌশলগত তেল মজুদ গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৭৫ সালে। এর পেছনে ছিল ১৯৭৩ সালের আরব দেশগুলোর তেল নিষেধাজ্ঞা, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল।
সে সময় তেলের দাম চারগুণ বেড়ে যায়, পশ্চিমা বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দেয় এবং হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতিগুলো কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে তা সামনে আসে।
বর্তমানে বহু দেশ—বিশেষ করে আইইএ সদস্যরা—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কৌশলগত তেল মজুদ রাখে।
সামষ্টিকভাবে আইইএ সদস্য দেশগুলোর সরকারি জরুরি মজুদ ১২০ কোটি ব্যারেলের বেশি। এর পাশাপাশি শিল্পখাতে আরও প্রায় ৬০ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষিত আছে।
ধারণা করা হয়, সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুদ রয়েছে চীনের কাছে, এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বেইজিং সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না, তবে জ্বালানি ও শিপিং বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা অনুমান করেছে যে চীনের মোট তেল মজুদ প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল।
এই মজুদ দিয়ে চীনের অর্থনীতি প্রায় তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সচল রাখা সম্ভব বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মজুদে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪১ কোটি ব্যারেল তেল, যার সঙ্গে বেসরকারি খাতে সংরক্ষিত আরও ৪৩ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি ৪০ দিনেরও বেশি জরুরি জ্বালানি সরবরাহের সমান।
আইইএ সদস্যরা কী পরিমাণ তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে?
আইইএ জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলো তাদের জরুরি মজুদ থেকে মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়বে। সে তুলনায়, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর আগের সর্বোচ্চ তেল ছাড় ছিল ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল।
প্যারিসভিত্তিক এই সংস্থাটি বলেছে, প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এই মজুদ বাজারে ছাড়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। দেশটি তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়বে, যা আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে। প্রায় ১২০ দিনের মধ্যে এই সরবরাহ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপান জানিয়েছে, তারা প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়বে—যা দেশটির প্রায় ৪৫ দিনের চাহিদার সমান। এই তেল সরকারি ও বেসরকারি উভয় মজুদ থেকেই নেওয়া হবে।
এছাড়া জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্য-ও এ উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে।
আইইএ সদস্য দেশগুলোর সাধারণত ন্যূনতম ৯০ দিনের নেট তেল আমদানির সমপরিমাণ জরুরি মজুদ রাখার কথা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল।
অন্যদিকে কানাডা, মেক্সিকো ও নরওয়ের মতো নেট তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আলাদা জরুরি মজুদ নেই; সংকটে তারা বাণিজ্যিক মজুদ ব্যবহার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এসপিআর পুরোপুরি অপরিশোধিত তেল নিয়ে গঠিত, যা গালফ কোস্ট-এর ভূগর্ভস্থ লবণ গহ্বরে সংরক্ষিত থাকে।
ইউরোপের কিছু দেশসহ অন্য অনেক দেশ তাদের কৌশলগত মজুদে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, বরং পেট্রোলিয়াম, ডিজেল ও জেট ফুয়েলও সংরক্ষণ করে।
চীন, যে দেশটি আইইএর পূর্ণ সদস্য নয়, একই ধরনের কোনো ঘোষণা দেয়নি। বরং তারা পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ঘোষিত চীনের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কৌশলগত তেল মজুদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মজুদেরর ছাড় কি তেলের দাম কমাতে পারবে?
তেল শিল্পের বিশ্লেষকেরা বলছেন, কৌশলগত মজুদ ব্যবহার করলে বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু সাধারণত এতে তেলের দামে নাটকীয় বা দীর্ঘস্থায়ী পতন দেখা যায় না।
এ ধরনের উদ্যোগ মূলত বাজারকে সংকেত দেয় যে সরকারগুলো প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত—এতে ব্যবসায়ীরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়।
আইইএ জানিয়েছে, এই তেল ছাড়ার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে ক্ষতি হয়েছে, তার মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহের সমান ঘাটতি পূরণ হবে।
বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের বাজারের তুলনায়, এই পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দামের ওপর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রোকারেজ ট্রেড নেশন-এর বিশ্লেষক ডেভিড মরিসন বার্তাসংস্থা এএফপি-কে বলেন, "যদি এতগুলো দেশের সমন্বিত পদক্ষেপের উদ্দেশ্য দাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।"
তার মতে, বাজার সম্ভবত এই পদক্ষেপকে "আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া" হিসেবে দেখেছে, কারণ ইরান কার্যত হরমুজের গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স বলেছে, যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির জলবায়ু ও পণ্য অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন এক গবেষণা নোটে লিখেছেন, "আইইএ এই রিলিজের পরও কিছু মজুদ ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সরবরাহের ক্ষতি আইইএ সদস্যদের সরাসরি হাতে থাকা মোট মজুদের চেয়েও বেশি হতে পারে।"
