এলাকায় ঢুকতে হলে আসামিদের তালিকা দিতে হবে: র্যাব সদস্য হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়াসিন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যার ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত ইয়াসিন এবার প্রকাশ্যে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
তিনি জানান, তার এলাকায় প্রবেশ করতে হলে প্রশাসনকে আগে থেকে আসামিদের তালিকা সরবরাহ করতে হবে। একইসঙ্গে তার অনুমতি ছাড়া এলাকায় ঢুকে অভিযান চালানোয় র্যাব সদস্যদের বিচারের দাবিও তোলেন তিনি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে নিজের পুরনো কার্যালয়ে আয়োজিত এক কথিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।
এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে র্যাবের একজন উপ-সহকারী পরিচালক বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় এই মামলা করেন। মামলায় জঙ্গল সলিমপুরের আলোচিত সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে ইয়াসিন প্রশাসনের উদ্দেশে বলেন, 'সেদিন র্যাব সদস্যরা কাকে গ্রেপ্তার করতে সেখানে গিয়েছিলেন তা স্পষ্ট ছিল না।' তিনি জানান, তার এলাকায় ভবিষ্যতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে। র্যাব কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় নিজের দায় অস্বীকার করে তিনি উল্টো তার প্রতিপক্ষ রোকন উদ্দিন মেম্বারকে দায়ী করেন এবং দাবি করেন, 'রোকন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করলেই সব সত্য বেরিয়ে আসবে।' একইসঙ্গে চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইয়াসিন বলেন, 'আসলাম চৌধুরীর আশ্রয়-প্রশ্রয়েই রোকন উদ্দিন এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।'
সন্ত্রাসী ইয়াসিন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক মুমিনুর রহমানের সমালোচনা করে জানান, সাবেক ডিসি তাকে উচ্ছেদ করতে চেয়ে নিজেই এখন উধাও হয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি ঠিকই নিজের সাম্রাজ্যে বহাল তবিয়তে আছেন। তার দাবি, জঙ্গল সলিমপুর তার ঘরবাড়ি এবং সেখান থেকে তাকে কেউ উচ্ছেদ করতে পারবে না। প্রশাসনের কোনো অভিযানে সাধারণ নারী-পুরুষকে হয়রানি করা হলে তারা সেটি মেনে নেবেন না বলেও জানিয়ে দেন তিনি।
চট্টগ্রাম শহর সংলগ্ন সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি পাহাড় ও বনভূমি নিয়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরে অপরাধী ও ভূমিদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সেখানে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার শিকার হয় র্যাব-৭-এর একটি দল। হামলায় র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং আরও তিন সদস্যকে জিম্মি করে নির্যাতন করা হয়। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের তিন ঘণ্টার যৌথ অভিযানে জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার পর র্যাব মহাপরিচালক সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এরই মধ্যে ইয়াছিন এমন হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেলেন।
জঙ্গল সলিমপুরের এই ভূখণ্ডটি বর্তমানে রাষ্ট্রের ভেতরে যেন এক অন্য রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ইয়াসিন, রোকন ও রিদওয়ানের মতো সন্ত্রাসীরা সেখানে নিজস্ব শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। পাহাড়জুড়ে বসানো সিসি ক্যামেরা এবং সশস্ত্র প্রহরীদের পাহারার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক কিলোমিটার দূরে থাকতেই তারা খবর পেয়ে যান। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম শহরের সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা অনায়াসেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামক এক ব্যক্তির হাত ধরে এখানে অবৈধ বসতি ও পাহাড় কাটার সাম্রাজ্য শুরু হয়। আক্কাস নিহত হওয়ার পর ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা এলাকাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। বর্তমানে সেখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস থাকলেও পুরো নিয়ন্ত্রণ এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে। খাস জমি বিক্রি, অবৈধ বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ এবং মাটি-বাণিজ্যের মাধ্যমে সেখানে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন চলে, যার কোনোটিই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় নেই। এমনকি সেখানে অপরাধীদের জন্য নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থাও রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে প্রশাসনকে বারবার পিছু হটতে হয়েছে। ২০২৩ সালেও সশস্ত্র নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিহত করেছিল এই সন্ত্রাসী চক্র। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বিএনপি নেতারাও এই সন্ত্রাসী চক্রের সাথে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুন টিবিএসকে বলেন, 'অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে জাতীয় পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।' বিশাল এই পাহাড়ি ও বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি সেখানে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা সেনা ব্যারাক স্থাপন এবং যাতায়াতের জন্য আরও পথ তৈরির পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা জনবলের নয়, বরং সদিচ্ছার। ছোটখাটো অভিযান চালানো আর দুর্গে ঢিল ছোড়া একই কথা। চট্টগ্রাম পুলিশের মুখপাত্র মোহাম্মদ রাসেল জানান, একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনুমোদন পেলেই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নিতে অভিযান চালানো হবে।
