কূটনীতিকদের পরিবার ‘ফিরিয়ে নিচ্ছে’ ভারত; ঢাকাকে ‘শান্ত ও বাস্তবসম্মত’ পদক্ষেপের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ভারত তাদের কূটনীতিকদের জন্য বাংলাদেশকে 'নন-ফ্যামিলি' পোস্টিং হিসেবে ঘোষণা করেছে। পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে ঢাকার উচিত শান্ত ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
সরকারি সূত্রের বরাতে ২০ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ভারত। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে কূটনৈতিক কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না। ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা—বাংলাদেশে থাকা ভারতের এই পাঁচ কূটনৈতিক মিশনই পূর্ণ জনবল নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বাংলাদেশও ভারত থেকে তাদের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে আনবে কি না—টিবিএসের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম কোনো মন্তব্য করেননি।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশের উচিত তাড়াহুড়ো করে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বিরত থাকা। এর বদলে ভারতের এ সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো বোঝার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে ভারত কেন এই পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট উদ্বেগের জায়গাগুলো কী।'
এই কূটনীতিকের মতে, বাংলাদেশ এমন কোনো বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকি লক্ষ করেনি যার জন্য পাল্টা একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ভারত যদি যৌক্তিক কোনো উদ্বেগের কথা জানায়, তবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা যেতে পারে।
'তাদের উদ্বেগ যদি যথার্থ হয় এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু করার থাকে, তবে আলোচনার মাধ্যমেই তা সমাধান করা সম্ভব,' বলেন তিনি।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেন, কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় পরিস্থিতির ভিত্তিতে। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। 'একটি দেশ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই অন্য দেশকেও একই কাজ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কূটনীতি মানে হলো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা এবং সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুধাবন করা।'
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরাও মনে করেন, ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকির কারণ নয়। তাদের মতে, এ পদক্ষেপ ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। একে বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতীতে বাংলাদেশে—বিশেষ করে নির্বাচনের সময়—বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা গেলেও, এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এগুলো দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে না।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম মনজুর কাদের টিবিএসকে বলেন, 'নির্বাচনকেন্দ্রিক এসব ঘটনা সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে না। ভারতের এই সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখা উচিত। বাংলাদেশের উচিত এ নিয়ে শান্ত ও বাস্তবসম্মত অবস্থান বজায় রাখা।'
বাংলাদেশের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এক দেশের সিদ্ধান্তের প্রভাবে অন্য দেশকেও একই কাজ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেয়।'
হিন্দুস্তান টাইমসের উদ্ধৃত ভারতীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, কূটনীতিকদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই বিবেচনায় ছিল এ সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে উগ্রবাদী ও চরমপন্থি গোষ্ঠীর কথিত হুমকির প্রেক্ষাপটে এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে 'পাকিস্তানি গোষ্ঠী'র তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—যদিও ঢাকা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ভারত এর আগেও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। দেশটিতে ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে কেবল তাদের স্বামী বা স্ত্রীরা থাকতে পারেন।
এছাড়া ভারত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে—যা ঢাকা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। গত মাসে চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের বাইরে বিক্ষোভসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবাদের জেরে নয়াদিল্লি ও ঢাকা উভয় স্থানেই কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
তবে এই উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, ভারত বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে দলটি ভালো ফলাফল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং তার ছেলে ও রাজনৈতিক উত্তরসূরি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পর্যবেক্ষকরা এই সাক্ষাৎকে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন কমানোর প্রয়াস হিসেবে দেখছেন।
