ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টার থেকে প্রায় ২০০ পদ কমাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ন্যাটোর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টার থেকে জনবল কমানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপে সামরিক এই জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এই বিষয়ে অবগত তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র চলতি সপ্তাহে তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের রাজধানীকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ন্যাটোর সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রায় ২০০ পদ কমাবে যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ন্যাটোর 'ইন্টেলিজেন্স ফিউশন সেন্টার' এবং ব্রাসেলসে অবস্থিত 'অ্যালাইড স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস কমান্ড' ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া পর্তুগাল-ভিত্তিক সামুদ্রিক অভিযান তদারকি কেন্দ্র 'স্ট্রাইকফোরন্যাটো' এবং আরও কয়েকটি সমজাতীয় কেন্দ্র থেকেও জনবল কমানো হবে।
ঠিক কী কারণে হুট করে এই পদগুলো কমানো হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি সূত্রগুলো। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পদ ও জনবল পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে নেওয়ার যে পূর্বঘোষিত লক্ষ্য রয়েছে, তার সঙ্গেই এই সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট' প্রথম এই সিদ্ধান্তের খবরটি প্রকাশ করে।
ইউরোপে ন্যাটোর কমান্ড সেন্টার থেকে জনবল কমানোর আলোচনার মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এমন একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন, যেখানে ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য 'হুমকি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইউরোপে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তির তুলনায় বর্তমানে কমিয়ে আনা জনবলের সংখ্যা খুবই সামান্য। এই মুহূর্তে ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই অবস্থান করছে জার্মানিতে। তাই এই পদক্ষেপকে এখনই ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
তবে ছোট এই পদক্ষেপও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টা মিত্রদেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে খোদ ন্যাটোর ভেতরেই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এক নজিরবিহীন আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে মঙ্গলবার সকালে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য এক ব্যবহারকারীর একটি পোস্ট শেয়ার করেন। ওই পোস্টে রাশিয়া ও চীনকে কেবল 'অপ্রাসঙ্গিক ভয়' হিসেবে উল্লেখ করে উল্টো ন্যাটোকেই যুক্তরাষ্ট্রের আসল হুমকি হিসেবে দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মী সংখ্যায় এমন রদবদল অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বর্তমানে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, 'ন্যাটো এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষ একে অপরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে, যাতে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অটুট থাকে।'
তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ন্যাটোর কমান্ড সেন্টারগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জনবল কমানোর এই সিদ্ধান্তের সামরিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর 'প্রতীকী' প্রভাব যে বেশ জোরালো, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রয়টার্স জানিয়েছে, যেসব বিভাগ থেকে জনবল কমানো হচ্ছে, সেখানে বর্তমানে প্রায় ৪০০ মার্কিন কর্মী কর্মরত আছেন। অর্থাৎ, এসব কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে।
সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সদস্যদের হুট করে সরিয়ে আনবে না। বরং বর্তমানে দায়িত্বরত কর্মীরা তাদের মেয়াদ শেষ করে চলে গেলে সেই শূন্যপদগুলোতে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে না। ন্যাটোর ৭৭ বছরের ইতিহাসে এটি অন্যতম এক উত্তেজনাপূর্ণ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সময়।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি এমনও বলেছিলেন যে, প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত ব্যয় না করলে ন্যাটো সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে তিনি রাশিয়াকে উৎসাহ দেবেন। তবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্কের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। গত জুনের সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে রাজি হওয়ায় ট্রাম্প তখন তাদের প্রশংসাও করেছিলেন।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে চিত্রটি আবার বদলে গেছে, যা ইউরোপজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত ডিসেম্বরের শুরুতে পেন্টাগন জানিয়েছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে ন্যাটোর গোয়েন্দা তথ্য থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব ইউরোপকেই নিতে হবে।
যদিও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা একে 'অবাস্তব' সময়সীমা বলে মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নথিতেও এখন ইউরোপের বদলে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে বেশি নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ইউরোপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের শুরুতেই ট্রাম্প ডেনমার্কের মালিকানাধীন দ্বীপ 'গ্রিনল্যান্ড' কেনার পুরনো জেদ আবারও সামনে এনেছেন। এতে ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্ররা চরম ক্ষুব্ধ। অনেক কূটনীতিকের মতে, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ভূখণ্ডের ওপর এমন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এই জোটের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারে।
সর্বশেষ গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্ককে সমর্থন করায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বেশ কয়েকটি ন্যাটো দেশের পণ্যের ওপর তিনি অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর শুল্ক আরোপের কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে এখন এক নজিরবিহীন বাণিজ্য ও সামরিক যুদ্ধের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
