মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে পালাতে ধনকুবেরদের ভরসা ব্যক্তিগত জেট, ভাড়া আকাশচুম্বী
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাইরে যেতে ধনকুবেররা ব্যক্তিগত চার্টার বিমান ব্যবহার করছেন। ফলে এর চাহিদা ও ভাড়া দুটোই হঠাৎ বেড়ে গেছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা আকাশছোঁয়া ভাড়া দিয়ে হলেও মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের ফলে, কোভিড–১৯ মহামারির পর উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচলে সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রম গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বেসরকারি জেট কোম্পানি এয়ারএক্সের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা জন ম্যাথিউস সম্প্রতি সিএনএনকে বলেন, 'সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যক্তিগত চার্টার বিমানের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক বিমান সংস্থার পরিষেবা কমে গেছে অথবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।'
সংঘাতের কারণে হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়েছেন। যদিও কিছু বিমান সংস্থা এখন সীমিত সংখ্যক রুট আবার চালু করতে শুরু করেছে, তবু ধনকুবেররা এই বিভ্রান্তি এড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যক্তিগত জেট চার্টার ব্যবহার করছেন।
ম্যাথিউস বলেন, 'অত্যন্ত ধনী পরিবার, বহুজাতিক কোম্পানি তাদের জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের স্থানান্তর এবং ক্রীড়া দল বা ট্যুরিং প্রোডাকশনের মতো বড় দল, যাদের একসঙ্গে ভ্রমণ করতে হয়, তাদের কাছ থেকে আমরা অনুরোধ পাচ্ছি।'
বেসরকারি চার্টার সংস্থা এসএইচওয়াই অ্যাভিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বার্নার্ডাস ভরস্টার সিএনএনকে বলেন, ওমানের মাস্কাট, দুবাই এবং সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে সাধারণত প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি ব্যক্তিগত জেট ফ্লাইট পরিচালিত হয়। কিন্তু গত বুধবার সেই সংখ্যা বেড়ে ৯৮–এ পৌঁছায়।
ভরস্টার বলেন, চাহিদা বৃদ্ধি, সীমিত সংখ্যক উড়োজাহাজ এবং বাড়তি বিমা ব্যয়—সব মিলিয়ে ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিমানগুলো যাত্রী নামিয়ে খালি ফিরে আসে, ফলে যাত্রীদের যাওয়া-আসার উভয় খরচই বহন করতে হয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ১২ জন যাত্রী ও তাদের একটি কুকুর মাস্কাট থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করেছেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ওই যাত্রার জন্য তাদের খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার।
ভরস্টার বলেন, সংঘাত শুরুর আগে একই ফ্লাইটের খরচ ছিল প্রায় ৬০ হাজার ডলার, যা এখন প্রায় ১৪২ শতাংশ বেড়েছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ওমানের মাস্কাট এবং সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে যাত্রা শুরু বেশি পছন্দ ছিল যাত্রীদের। কারণ তখন ওই এলাকাগুলোর আকাশসীমা ও ফ্লাইট করিডর তুলনামূলকভাবে বেশি পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল ছিল। তবে পরে দুবাই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এমন অনেক মানুষ দুবাইতে অবস্থান করছেন। ফলে সেখান থেকেই বেশি মানুষ ব্যক্তিগত জেটে করে যাত্রা শুরু করছেন।
ভরস্টার বলেন, 'এখন ইস্তাম্বুলই সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।' অন্য গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিসের এথেন্স ও ভারতের মুম্বাই।
তবে ব্যক্তিগত চার্টার বিমান মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণের সংকট খুব বেশি কমাতে পারবে না, কারণ এই বিমানের ভাড়া অত্যন্ত বেশি, যা অধিকাংশ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এসব বিমানের সংখ্যা ও যাত্রী ধারণক্ষমতা সীমিত।
ম্যাথিউস বলেন, 'ব্যক্তিগত চার্টার বাণিজ্যিক বিমান নেটওয়ার্কের পরিসরের বিকল্প হতে পারে না। তবে নির্ধারিত ফ্লাইট ব্যাহত হলে দ্রুত যাতায়াত প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের জন্য এটি নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণের সুযোগ দিতে পারে।'
তিনি জানান, গত সপ্তাহে ১০০ আসনবিশিষ্ট একটি বিমানের জন্য এয়ারএক্স প্রায় ১০ লাখ ইউরো (প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজার ডলার) মূল্যের একটি চার্টার চুক্তি নিশ্চিত করেছে।
বার্নার্ডাস ভরস্টার স্বীকার করেছেন যে ব্যক্তিগত চার্টার বিমানের মাধ্যমে খুব বেশি মানুষ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এসব বিমানে যাত্রী ধারণক্ষমতা কম। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকট পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জেটের প্রভাব বা ভূমিকা খুব সীমিত থাকবে।
তিনি বলেন, একটি ব্যক্তিগত জেটে গড়ে প্রায় ১২ জন যাত্রী বহন করা যায়। আর বর্তমানে এই অঞ্চলে এ ধরনের ব্যক্তিগত জেটের সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৫০টির মতো। তাই বিমানের সংখ্যা ও যাত্রী ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় খুব বেশি মানুষ ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করতে পারছেন না।
তিনি আরও জানান, গত এক সপ্তাহে তার কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ফ্লাইটে প্রায় ১২০ জন মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছেন।
বর্তমানে অঞ্চলটি ছাড়ার চেষ্টা করছেন কয়েক হাজার মানুষ। যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল গুরুতর ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার নিজ নিজ নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা দুই ডজনের বেশি চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে এবং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজারো মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এক মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সংখ্যা ও পরিষেবা পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাচ্ছে।'
