জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পার্ল হারবার নিয়ে রসিকতা করলেন ট্রাম্প
গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানের হামলার বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করার বিষয়টি এড়িয়ে চলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে টোকিও যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকেই ছিল তাদের মূল মনোযোগ। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল একেবারেই ভিন্ন।
গত বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বরের সেই জাপানি হামলার প্রসঙ্গ টানেন, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টেনে এনেছিল। ইরান-ইসরায়েল হামলার বিষয়ে কেন জাপান এবং অন্যান্য মিত্রদের আগে থেকে জানানো হয়নি—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ওই প্রসঙ্গের অবতারণা করেন।
ট্রাম্প বলেন, "আমরা এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলিনি কারণ আমরা এটিকে একটি 'সারপ্রাইজ' (চমক) হিসেবে রাখতে চেয়েছিলাম। আর সারপ্রাইজ সম্পর্কে জাপানের চেয়ে ভালো আর কে জানে, তাই না? তোমরা কেন আমাকে আগে পার্ল হারবারের কথা বলোনি?"
এ সময় সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। ট্রাম্প আরও যোগ করেন, "আমার মনে হয়, আমাদের চেয়ে তোমরা সারপ্রাইজে অনেক বেশি বিশ্বাস করো।"
ট্রাম্প যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বড় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি কোলে হাত রেখে চুপচাপ বসে ছিলেন এবং কোনো কথা বলেননি। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে তার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে ফেলার অভ্যাসেরই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান পার্ল হারবার হামলাকে জাপানি সমাজ পুনর্গঠন এবং সেখানে একটি শান্তিবাদী সংবিধান চাপিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে জাপানকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সংবিধান জাপানকে যুদ্ধ পরিত্যাগে বাধ্য করে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এর ফলে টোকিও নিরাপত্তার জন্য পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
তবে স্নায়ুযুদ্ধের সময় এশিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর তাগিদে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। তখন তারা পার্ল হারবার হামলাকে জাপানের দিকে আঙুল তোলার পরিবর্তে একটি 'ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি' হিসেবে বর্ণনা শুরু করে এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে টোকিওকে মিত্র হিসেবে পাশে পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
২০১৬ সালে পার্ল হারবার হামলার ৭৫ বছর পূর্তিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে শিনজো আবে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় শোক প্রকাশ করেন এবং ওবামা দুই দেশের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বের প্রশংসা করেন।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এশিয়া পলিসি স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মিরেয়া সলিস বলেন, ট্রাম্পের পূর্বসূরিরা জাপানি নেতাদের উপস্থিতিতে পার্ল হারবার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এড়িয়ে চলতেন কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে পুনর্মিলনের একটি গভীর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
মিরেয়া সলিস ট্রাম্পের মন্তব্যকে "অস্বাভাবিক এবং একটি বড় ধাক্কা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শক্তিশালী বন্ধন এবং অভিন্ন লক্ষ্যগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। যুদ্ধের তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা বিভেদমূলক অতীতকে সামনে আনা নয়।"
