রোববার থেকে জরুরিভিত্তিতে হামের টিকা দেওয়া হবে, গ্যাভি থেকে ধার নেওয়া হচ্ছে ২.১৯ কোটি ডোজ
আগামী রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরিভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এ কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) থেকে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা ধার হিসেবে নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদেরই কেবল হামের টিকা দেওয়া হতো।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাভির কাছে থেকে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টিকা কেনা হলে গ্যাভির কাছ থেকে নেওয়া টিকা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।"
তিনি বলেন, "আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই টিকা পেলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোররা এখন টিকা নিতে পারবে।"
মন্ত্রী জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবারের মধ্যে সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে যেসব উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেগুলোসহ প্রতিটি উপজেলায় এসব টিকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, "আগামী দুই দিনের মধ্যে আমরা ভ্যাকসিন ও সিরিঞ্জ গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দেব। ইনশাআল্লাহ, রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় এ কর্মসূচির উদ্বোধন শুরু করব। যারা ভ্যাকসিন দেবেন, তারা সবাই স্থানীয় কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন।"
তিনি আরও জানান, এ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য বৃহস্পতিবার থেকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "যেভাবে হাম আমাদের আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়েও দ্রুতগতিতে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে অবশ্যই বলব, এটিকে অনেকটা সফলভাবেই আমরা মোকাবিলা করেছি। বিভিন্ন জায়গায় ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা করেছি। দ্রুতগতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করেছি, যা খুবই প্রয়োজন ছিল। ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করে আমরা সব জায়গায় সেগুলোর ব্যবস্থা করেছি, যাতে প্রয়োজন হলে ভেন্টিলেশন দেওয়া যায়। বাচ্চারা যেন অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়, সে চেষ্টা করেছি।"
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসব্যাপী হামের একটি ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তবে তখন সবাইকে এর আওতায় আনা হয়নি। অসম্পূর্ণ অবস্থায় ওই ক্যাম্পেইন শেষ করা হয়েছিল।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কর্তৃপক্ষ এ কর্মসূচির তদারকি করবে। তারা টিকাদান কর্মসূচির সময়সূচি ও ক্ষুদ্র পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। কোন কোন কেন্দ্রে এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে এবং নিবন্ধন লাগবে কি না, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার আরও বিস্তারিত জানানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দীন হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
ডা. জিয়াউদ্দীন হায়দার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "হামের টিকার পাশাপাশি শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি টিকার সঙ্গে ভিটামিন এ ক্যাপসুলও দিতে। যারা টিকা নিতে আসবে, তারা একই কেন্দ্রে ভিটামিন এ পাবে। যদিও বর্তমানে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।"
তিনি আরও বলেন, "সাধারণত যেভাবে স্কুলভিত্তিক ও নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, এবারও ঠিক সেভাবেই হবে। সিটি করপোরেশন এলাকা, স্কুল এবং অন্যান্য নির্ধারিত কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্যমতে, চলতি বছরে সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ২৯৫ জন। এর মধ্যে পরীক্ষা করে ৪২৪ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন মৃত্যু হয়েছে ৪০ জনের, যার মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে শনাক্ত হয়েছে। এর তুলনায় গত বছর এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৯, আর ২০২৪ সালে ছিল ৬৪।
ডা. জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত ঘাটতি, সময়মতো ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং ধীরগতির টিকা সংগ্রহের কারণেই এ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অদক্ষতা ও প্রস্তুতির অভাবে শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ভ্যাকসিনের সংকট, টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীদের আন্দোলনের কারণে সময়মতো হামের টিকা না পাওয়াই এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)। দাতা সংস্থার সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচি ১৯৯৮ সালে শুরু হয়েছিল। এটি 'সেক্টর প্রোগ্রাম' নামেই বেশি পরিচিত। কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান বা ওপি'র মাধ্যমে।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তন হওয়ার আগে পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামের বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের ৬ মার্চ সেক্টর প্রোগ্রাম চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়। এর ফলে ওপি'র মাধ্যমে টিকা কেনার ব্যবস্থাও বাতিল হয়ে যায়।
পরে টিকা কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা আর কেনা হয়নি। ফলে হামসহ ইপিআইয়ের কয়েকটি টিকার সংকট দেখা দেয় দেশে। ২০২৫ সালে হামের টিকা কাভারেজের বাইরে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু।
এছাড়া চার বছর পরপর হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালে তা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব কারণেই দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে।
