যুবরাজকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য, ‘খামখেয়ালি’ যুদ্ধ পরিচালনা: ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভ বাড়ছে সৌদি আরবের
ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি যুদ্ধনীতিতে ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছে সৌদি আরব। ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তার আরও দাবি, এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে হবে উপসাগরীয় দেশগুলোকেই। পাশাপাশি সৌদি শাসককে নিয়ে অশালীন মন্তব্যও করেছেন তিনি। ট্রাম্পের এই আচরণেই উষ্মা বাড়ছে রিয়াদের।
আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে সম্প্রতি প্রচুর সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের আচরণে তারা 'চরম হতাশ' বলেই মনে করছেন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক চ্যাটাম হাউস-এর অ্যাসোসিয়েট ফেলো ও সৌদি-বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের হাতে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি খোলার দায়িত্ব অন্যান্য দেশের। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই তিনি এই যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যে সৌদির উদ্বেগ আরও বাড়বে।
কুইলিয়ামের বলেন, 'ট্রাম্পের একতরফা পদক্ষেপ এবং সেসবের পরিণতি নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামানোর প্রবণতায় সৌদি চরম হতাশ। আর সব মাত্রা ছাড়িয়েছে এমবিএসকে [সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান] নিয়ে তার মন্তব্য।'
সম্প্রতি এক বক্তৃতায় মুহাম্মদ বিন সালমানকে নিশানা করেন ট্রাম্প। যদিও শুরুতে অন্যান্য উপসাগরীয় নেতাদের পাশাপাশি সৌদি যুবরাজের প্রশংসাই করে তাকে 'অকৃত্রিম বন্ধু', 'বিজেতা' ও 'যোদ্ধা' আখ্যা দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
কিন্তু বিশ মিনিট পরই সুর বদলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, 'তিনি (মুহাম্মদ বিন সালমান) ভাবতেও পারেননি যে তাকে আমার পদলেহন করতে হবে।'
যুবরাজ সালমানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভরা সভাতেই ট্রাম্প বলেন, 'তিনি ভেবেছিলেন, আমেরিকার আগের হেরে যাওয়া প্রেসিডেন্টদের মতোই আমি আরেকজন, আর আমেরিকাও ক্রমেই রসাতলে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তাকে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেই হচ্ছে। তাকে গিয়ে বলবেন, আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাটাই তার পক্ষে মঙ্গলজনক।'
সৌদি আরবের চোখে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আচরণ তার অশালীন ও খামখেয়ালি স্বভাবের নবতম নিদর্শন। ট্রাম্প ও মুহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে আপাত-সখ্য থাকলেও তাকে নিয়ে রিয়াদ যে আদতে বেশ সতর্ক, তা এই ঘটনাতেই স্পষ্ট।
মুহাম্মদ বিন সালমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ার-ইস্টার্ন স্টাডিজ-এর অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও এই সংঘাতের প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কারণেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে।
শুরুতে অবশ্য ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিল রিয়াদ। ইরানে হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে কী কী বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে, তা জানানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু পরে সৌদির মনে হয়, ইসরায়েল যদি আক্রমণ করেই থাকে, তবে আমেরিকাকেও সঙ্গে নেওয়া উচিত। এতে যুদ্ধের পরিণতি তাদের পক্ষে আসার সম্ভাবনা বাড়বে। ইরানে ক্ষমতার পালাবদল বা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব। তবে তারা চেয়েছিল, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার যেন পুরোপুরি ধ্বংস হয়।
অধ্যাপক হেকেল বলেন, 'যুদ্ধ যেদিকে এগোচ্ছে এবং ইরানের যা সামরিক সক্ষমতা, তাতে রিয়াদকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। সৌদিরর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনিতেই বেশ নাজুক। দেশের বিশাল সীমানা পাহারা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। এর উপর যদি পানি পরিশোধন প্রকল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, তবে দেশে প্রস্তর যুগ ফিরে আসবে।'
নিজেদের অবকাঠামোয় হামলার বদলা নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিখুঁত আঘাত হানার সক্ষমতা যে তাদের রয়েছে, তাতেই বিপদের মাত্রা স্পষ্ট। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির জলপথ অবরুদ্ধ করেছে তেহরান। পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল শোধনাগার, বাহরাইন ও কুয়েতের পানি পরিশোধন প্রকল্প, কাতারের প্রধান তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) প্রকল্প ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানিতেও হামলা করেছে তারা।
গত মাসে হরমুজ প্রণালি না খুললে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো 'গুঁড়িয়ে' দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই সময়ে ওয়াশিংটনে এক নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকায় নিযুক্ত বিভিন্ন আরব দেশের রাষ্ট্রদূতেরা। নিজেদের মুঠোফোনের পর্দায় সেই খবর দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন তারা।
ওই রাতেই হোয়াইট হাউস ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে তড়িঘড়ি যোগাযোগ করে একাধিক আরব দেশ। ট্রাম্পের ওই হুমকি যাতে বাস্তবায়িত না হয়, সেজন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করে তারা। উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, 'আমেরিকা যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সত্যি আক্রমণ করে বসে, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কারণ, তখন পাল্টা আঘাত হিসেবে যে পরিমাণ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসবে, তা সামলানোর ক্ষমতা আমাদের কারও নেই।'
যে যুদ্ধ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো বরাবর নিজেদের দূরে রাখতে চেয়েছে, চলতি সপ্তাহে তা নিয়েই ফের আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, এই যুদ্ধের খরচ তুলতে তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর দিকে নজর ঘোরাতে পারেন ট্রাম্প। এই খবরে ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওই দেশগুলোতে।
হেকেল বলেন, '১৯৭০-এর দশকের পুরনো ধারণা আঁকড়ে ধরে ট্রাম্প মনে করেন, আরব দেশগুলির কাছে অঢেল টাকা আছে। তাই তিনি এখন ভয় দেখিয়ে আরব দুনিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন, যাতে যুদ্ধের সমস্ত খরচ তাদের পকেট থেকেই আদায় করা যায়।'
মিয়ামির ওই বক্তৃতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সৌদি আরবের ওপর চাপও সৃষ্টি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন, 'এটাই সঠিক সময়।' যদিও সৌদি যুবরাজ বারবার বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ইসরায়েল সদর্থক পদক্ষেপ নিলে তবেই তিনি এ বিষয়ে বিবেচনা করবেন।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়ালি নাসর বলেন, 'বোঝাই যাচ্ছে, তিনি (ট্রাম্প) ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন এবং সৌদির সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলছেন যা একেবারেই অনুচিত।'
অন্যদিকে যুদ্ধের সূত্রপাতের জন্য নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি সরকারের ওপরেও রিয়াদের ক্ষোভ প্রবলভাবে বেড়েছে।
ইরানকে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করে সৌদি আরব। যদিও সাম্প্রতিককালে তেহরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেছিল তারা। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মতো সৌদিরও প্রথমে মনে হয়েছিল, আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলায় ইরান সরকার দুর্বল হলে আখেরে তাদের লাভই হবে।
কিন্তু এখন রিয়াদের আশঙ্কা, ট্রাম্প হয়তো আচমকা নিজেদের জয়ী ঘোষণা করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়াবেন। আর তার ফলে আহত কিন্তু আরও বেশি কট্টর তেহরান প্রশাসনের মুখোমুখি হতে হবে উপসাগরীয় দেশগুলোকেই।
প্রকাশ্যে অবশ্য ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনেরই ডাক দিয়েছে সৌদি আরব। কারণ এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশটিকে বাণিজ্য ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যুবরাজ সালমানের ট্রিলিয়ন কোটি ডলারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বড়সড় ধাক্কা খাবে।
আমেরিকা ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে রাজি করানোর একটি আঞ্চলিক প্রচেষ্টাও শুরু হয়েছে। এই লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেন সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহান।
জেদ্দা-ভিত্তিক গাল্ফ রিসার্চ সেন্টার-এর চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, এই মুহূর্তে সৌদি আরব 'যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত সংঘাতের অবসানের' ওপর জোর দিচ্ছে। তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে বড়সড় ধাক্কা না দিয়েই যদি ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করে দেন, তবে আগামী দিনে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকার কাজের মধ্যে কোনো স্পষ্ট কৌশলগত নির্দেশনার অভাব নিয়েও যথেষ্ট অস্বস্তি রয়েছে। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে এটি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।'
উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। গত সপ্তাহেই ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এই সংঘাতে জড়িয়েছে তারা। হুথিরা যদি এই যুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশে বাব এল-মান্দেব জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
